কোম্পানিতে একাউন্টেন্ট এর চাকরি করা কি হারাম হবে?
Business and Job · Hanafi
Question
আমি একটা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে একাউন্টেন্ট এর চাকরি পেয়েছি। এই কোম্পানির কাজ হচ্ছে সেনাবাহিনীদের বিভিন্ন প্রজেক্ট সম্পাদন করা।
প্রজেক্টগুলোর বিষয়ে একটু বুঝিয়ে বলি-- প্রজেক্টগুলো হচ্ছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোয়াটার তৈরি করা, স্কুল, স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসস্থান তৈরি করে দেয়া। এই প্রজেক্ট চলাকালীন সেনাবাহিনী কোম্পানিকে বিভিন্ন কিস্তিতে পেমেন্ট করে থাকে,, তবে শুরুতে সেনাবাহিনী, কোম্পানিকে কোনো পেমেন্ট করেন না। এইজন্য কোম্পানিকে মাঝে মাঝে ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয়।
যেহেতু একজন একাউন্টেন্ট এর কাজ কোম্পানির আয়-ব্যয় হিসাব করা, তাই একজন একাউন্টেন্টকে সুদটাকে কোম্পানির ব্যয় হিসাবে রেকর্ড বা লিপিবদ্ধ করতে হয়!!
এইক্ষেত্রে একজন একাউন্টেন্ট কি সুদের লেখক হবেন, নাকি ব্যাংক কর্মকতা সুদের লেখক হবেন? নাকি উভয়ে হবেন?
যেহেতু সুদের মূল হিসাবটা ব্যাংক কর্মকর্তা কতৃক করা হয়, এবং একাউন্টেন্ট এর কাজ হয় সুদের হিসাবটাকে কোম্পানির ব্যয় হিসেবে হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ করা, এই ক্ষেত্রে একজন একাউন্টেন্ট আসলেই কি সুদের লেখক বলে গন্য হবেন??
এবং এই কোম্পানি বা এমন কোম্পানি যারা মাঝে মধ্যে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে থাকেন সেসব কোম্পানিতে একাউন্টেন্ট এর চাকরি করা কি হারাম হবে?? কোম্পানি থেকে উর্পাজিত টাকাও কি হারাম হবে??
মুফতি ইমদাদুল হক সাহেব উওরটা দিবেন প্লিজ।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি যে কোম্পানিতে চাকরি করেছেন, সেটি মূলত সেনাবাহিনীর জন্য বৈধ প্রকল্প (কোয়ার্টার, স্কুল, বাসস্থান নির্মাণ) করে থাকে। কোম্পানির মূল কাজ বৈধ। তবে কোম্পানি মাঝে মাঝে ব্যাংক থেকে সুদভিত্তিক লোন নেয়, এবং আপনার কাজ হলো সেই সুদের অর্থকে কোম্পানির ব্য�় হিসেবে হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ করা।
ফিকহি নীতিমালা ও রায়:
১. সুদের লেখক কে? হাদিসে সুদের সাথে জড়িত সকল পক্ষকে (সুদখোর, সুদদাতা, লেখক, সাক্ষী) অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
আপনার ক্ষেত্রে, ব্যাংক কর্মকর্তা সুদের চুক্তি সম্পাদন করেন এবং সুদের মূল হিসাব (ক্যালকুলেশন) করেন। আপনি (একাউন্টেন্ট) সেই সুদের অর্থকে কোম্পানির ব্য�় হিসেবে খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। হানাফি ফিকহের আলোকে: যে ব্যক্তি সুদের চুক্তি লিখে বা তার হিসাব খাতায় লিপিবদ্ধ করে, সে-ই 'সুদের লেখক' হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু আপনি সুদের অর্থকে কোম্পানির ব্য�় হিসেবে রেকর্ড করেন, তাই আপনি সরাসরি সুদ লেনদেনের নথিপত্র তৈরি করছেন। ফলে আপনিও সুদের লেখকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং ব্যাংক কর্মকর্তাও হবেন। উভয়েই এই গুনাহের অংশীদার হবেন। (রদ্দুল মুহতার, ৫ম খণ্ড, ১৭৮ পৃষ্ঠা - কিতাবুল বুয়ু, বাবুর রিবা)
২. এই চাকরি করা কি হারাম? যেহেতু আপনার কাজের একটি অংশ (যদিও ছোট অংশ) সুদভিত্তিক লেনদেনের হিসাব লিপিবদ্ধ করা, তাই এই কাজটি হারাম হবে। কারণ, হারাম কাজে সহযোগিতা করা বা তার দলিল তৈরি করা জায়েজ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি যদি কোম্পানির সকল আয়-ব্য�়ের হিসাব রাখেন, এবং সুদের হিসাবটি যদি কোম্পানির অন্যান্য বৈধ লেনদেনের তুলনায় নগণ্য হয়, তাহলে অনেক ফকিহ (বিশেষত হানাফি মাযহাবের) এই মত দিয়েছেন যে, মূল চাকরি বৈধ হলে, গৌণ ও পরোক্ষভাবে হারাম লেনদেনের হিসাব রাখার কারণে পুরো চাকরি হারাম হবে না। তবে সেই হারাম কাজটি (সুদের হিসাব লেখা) থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
৩. কোম্পানি থেকে উপার্জিত টাকা কি হারাম? যেহেতু কোম্পানির মূল কাজ (নির্মাণ) বৈধ, এবং কোম্পানির আয়ের মূল উৎস বৈধ প্রকল্প থেকে আসে, তাই আপনার বেতন সম্পূর্ণ হারাম হবে না। তবে, যেহেতু আপনি সুদের হিসাব লেখার মতো একটি হারাম কাজে অংশ নিচ্ছেন, তাই আপনার বেতনের একটি অংশ (সুদের লেনদেনের অনুপাতে) হারাম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এটি একটি গৌণ বিষয় এবং মূল কাজ বৈধ, তাই আপনার উপার্জিত অর্থ বৈধ হবে, তবে আপনাকে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এই কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
আপনার করণীয়:
১. সরাসরি সুদের হিসাব লেখা থেকে বিরত থাকুন: আপনি চেষ্টা করুন যেন সুদের অর্থের হিসাব আপনার হাত দিয়ে না যায়। কোম্পানির ব্যবস্থাপনাকে বোঝান যে, ইসলামি বিধান অনুযায়ী আপনি সুদের লেনদেনের হিসাব রাখতে পারবেন না। ২. বিকল্প ব্যবস্থা: কোম্পানিকে বলুন, তারা যেন অন্য কোনো হিসাবরক্ষক দিয়ে এই কাজটি করান, অথবা সুদের হিসাবটি আলাদা রাখা হয়। ৩. তওবা করুন: অতীতে যা হয়ে গেছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ৪. বিকল্প চাকরি খুঁজুন: যদি সম্ভব হয়, এমন কোম্পানিতে চাকরি করার চেষ্টা করুন যারা সুদভিত্তিক লোন নেয় না।
মোটকথা:
- আপনি সুদের লেখক হিসেবে গণ্য হবেন, কারণ আপনি সুদের অর্থকে ব্য�় হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন।
- এই কাজটি হারাম, তবে পুরো চাকরি হারাম নয়, কারণ মূল কাজ বৈধ।
- আপনার বেতন হারাম হবে না, তবে সুদের হিসাব লেখার কারণে গুনাহ হবে।
- সর্বোত্তম সমাধান হলো, সুদের হিসাব লেখা থেকে বিরত থাকা এবং চেষ্টা করা যেন এই কাজটি অন্য কেউ করে।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।