একাধিক ক্রেতার সাথে মৌখিক প্রতিশ্রুতি ও দাম বাড়ার পর করণীয় কী?
Business and Job · Hanafi
Question
এরপরে ১ সপ্তাহ পরেও সে ওই মাল গুলো নেয়নি (অর্থাৎ ১১ টি বিক্রিত, এবং পরের গুলো)। এরমধ্যে মালের দাম ও বেড়ে গেছে। এরই মাঝে অন্য আরেকজন মাল কিনার ইচ্ছা পোষণ করে, যেহেতু আমি আগের লোক কে কথা দিয়েছিলাম তাই তাকে একপ্রকার না করে দেই। সে বেশি দামেই কিনতে চায়।
আমি এই ১ সপ্তাহ ছিলাম না, তাই ভেবেছি সব মাল ই বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু আজকে গিয়ে দেখি যে সেই ১১ টা সহ আরো মাল আগের ক্রেতা এখনো নেয় নি। আমি তাকে জানাই যে দাম বেশি পরবে এবং একটা রেট বলি, সে তাতে রাজি হয়। আমি তাকে বলি আচ্ছা আমি জানাচ্ছি। এরপর সেই ২য় জনের কাছে আরো বেশি দামে বললে সে ও রাজি হয়, এবং তার সাথে চুক্তি করি এবং কথা দেই।
এটা শুনে আগের কাস্টমার ও বেশি দামে নিতে চায় এবং একটু মন খারাপ করে। যদিও সে আগে এই দামে রাজি হয় নি।
পুরো বিষয়টি তে আমি অনেক confused, এখানে কি জায়েজ ভাবে সব হলো? আমার করনীয় কি কুরআন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী?
Answer
উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম ক্রেতার সাথে আপনার কোনো পূর্ণাঙ্গ বিক্রয় চুক্তি (বাই') হয়নি। আপনি তাকে শুধু মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, পরবর্তীতে যে নতুন মাল আসবে সেটিও সে নিতে পারবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিতে নির্দিষ্ট দাম, পরিমাণ এবং সময় নির্ধারিত ছিল না। ইসলামি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, এরূপ অনির্দিষ্ট শর্তে কোনো ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হয় না; এটি কেবল একটি ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) হিসেবে গণ্য হবে।
ওয়াদা পূরণ করা উত্তম ও নৈতিক কর্তব্য, তবে শরিয়তে তা বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) নয়। তবে যদি প্রতিশ্রুতির কারণে অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে।
আপনার কাজটি কী জায়েজ হয়েছে?
- দ্বিতীয় ক্রেতার সাথে আপনি বৈধভাবে চুক্তি করেছেন, কারণ তখন পর্যন্ত প্রথম ক্রেতার সাথে কোনো নির্দিষ্ট বিক্রয় সম্পন্ন হয়নি।
- ইসলামে ন্যায্য দামে মাল বিক্রি করা এবং অধিক লাভের উদ্দেশ্যে অন্যের সাথে চুক্তি করা জায়েজ।
- তবে আপনার জন্য আদর্শ ছিলঃ প্রথম ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে বলা উচিত ছিল, “আপনি যদি এই দামে না নেন, তাহলে আমি অন্যকে দিতে বাধ্য হব।” কিন্তু আপনি তাকে না করে দেওয়ার পর মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে করণীয়:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূরণ কর।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১)
তবে এখানে অঙ্গীকার বলতে বৈধ চুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু প্রথম ক্রেতার সাথে বৈধ চুক্তি হয়নি, তাই এই আয়াত সরাসরি আপনার ওপর প্রযোজ্য নয়।
২. হাদিসে এসেছে:
“মুসলিমগণ তাদের শর্তসমূহের ওপর রয়েছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৪)
কিন্তু এখানে শর্তটি অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট থাকায় তা চুক্তি হিসেবে গণ্য হয়নি।
৩. হাদিসে আরও এসেছে:
“তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার ভাইয়ের বিক্রির ওপর বিক্রি না করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪০)
যেহেতু প্রথম ক্রেতার সাথে বিক্রয় সম্পন্নই হয়নি, তাই দ্বিতীয়ের সাথে চুক্তি করা হারাম বা নিষিদ্ধ হয়নি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
- প্রথম ক্রেতা এখন বেশি দামে নিতে রাজি হচ্ছে, কিন্তু সে দ্বিতীয় ক্রেতার সাথে চুক্তির পরে রাজি হয়েছে। তাই পূর্বের কোনো বৈধ চুক্তি না থাকায় দ্বিতীয় ক্রেতার সাথে আপনার চুক্তি বৈধ রয়েছে।
- তবে উত্তম হলো, যদি সম্ভব হয়, দ্বিতীয় ক্রেতার সাথে সমঝোতা করে চুক্তি বাতিল করা এবং প্রথম ক্রেতাকে মাল দেওয়া। যদি দ্বিতীয় ক্রেতা রাজি না হয়, তাহলে প্রথম ক্রেতাকে ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলুন যে, তার সাথে বৈধ চুক্তি হয়নি বলে অন্যকে মাল দিতে হয়েছে। প্রয়োজনে তাকে সামান্য ছাড় দিন অথবা ভবিষ্যতে মাল দেবেন বলে আশ্বস্ত করুন।
সারকথা:
আপনার কাজটি জায়েজ হয়েছে, তবে আদর্শ আচরণ ছিল আগে প্রথম ক্রেতার সাথে পরিষ্কারভাবে কথা বলা। এখন আপনি দ্বিতীয় ক্রেতার সাথে চুক্তি রক্ষা করুন এবং প্রথম ক্রেতার সাথে সুন্দর ব্যবহার করুন। আল্লাহ তাআলা ব্যবসায় সততা ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর তোমরা পরিমাপে ও ওজনে পূর্ণ দাও; ন্যায়সঙ্গতভাবে।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৫২)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫৩
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৮৬
- আল-হিদায়া, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৮৮
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯৪
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪০