শর্তযুক্ত তালাক সন্দেহ হলে কি পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
হুজুর আমি আমার স্ত্রীর অবর্তমানে আমার স্ত্রীর উপরে কিছু শর্ত যুক্ত তালাক রেখেছিলাম। কিন্তু এখন সেই সব সত্যযুক্ত তালাকের প্রতি আমার সন্দেহ এসেছে যে আমি সেগুলো মুখে উচ্চারণ করে রেখেছিলাম না মনে মনে রেখেছিলাম নিশ্চিত হতে পারছি না বা আদৌ আমি কি কি রকম সত্যযুক্ত তালাক রেখেছিলাম এখন সেগুলো সন্দেহ পরিণত হয়েছে যেমন মুখে উচ্চারণ করেছি কি করিনি সেগুলো সন্দেহ পরিণত হয়েছে তো আমার আসল জানার মধ্যে এটাই আছে যে যেহেতু সেগুলোর প্রতি সন্দেহ এসেছে সেগুলো যদি আমি উচ্চারণ করে সত্য রেখে থাকি কিন্তু এখন নিশ্চিত হতে পারছি না কিন্তু সেগুলো যদি ঘটে থাকে তাহলে সেগুলো কি আমার স্ত্রীর উপরে তালাক পতিত হবে নাকি আমার সন্দেহ হওয়ার কারণে সেগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে দয়া করে উত্তর দেবেন
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি স্পষ্ট। আপনি আপনার স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে কিছু শর্তযুক্ত তালাক রেখেছিলেন, কিন্তু এখন আপনি নিশ্চিত নন যে সেগুলো মুখে উচ্চারণ করেছিলেন নাকি মনে মনে রেখেছিলেন। এমনকি কী কী শর্ত ছিল তাও আপনার মনে নেই। এখন জানতে চান, যদি সত্যিই সেগুলো উচ্চারণ করা থাকে এবং শর্ত পূরণ হয়ে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে কি না? নাকি সন্দেহের কারণে সেগুলো বাতিল গণ্য হবে?
প্রথমত, মূলনীতি জেনে নিন:
ইসলামি ফিকহের সুস্পষ্ট নিয়ম হলো—তালাক শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই পতিত হয়; মনে মনে সংকল্প করলে তালাক পতিত হয় না। এটি হানাফি মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)—সবাই এ বিষয়ে একমত।
(সূত্র: আল-হিদায়াহ, ১/২২৪; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫১-৩৫২)
দ্বিতীয়ত, আপনার ক্ষেত্রে সন্দেহের বিধান:
আপনি নিজেই বলছেন—আপনি নিশ্চিত নন যে মুখে উচ্চারণ করেছিলেন কি না, এবং কী কী শর্ত ছিল তাও মনে নেই। ইসলামি আইনের মূলনীতি হলো:
"اليقين لا يزول بالشك"
“নিশ্চিত বিশ্বাস সন্দেহের দ্বারা দূর হয় না।”
অর্থাৎ, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে আপনি মুখে উচ্চারণ করেছেন এবং সেই শর্ত পূরণ হয়েছে, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তালাক পতিত হওয়ার বিধান দেওয়া জায়েয নেই। তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়; এটি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বহাল থাকবে।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩২; আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ১/৬৭; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৮৫)
তৃতীয়ত, শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে:
আপনি বলেছেন, “শর্তযুক্ত তালাক রেখেছিলাম”। শরীয়তে শর্তযুক্ত তালাক বৈধ। যেমন: “তুমি যদি বাড়ি থেকে বের হও, তবে তোমার উপর তালাক।” এই ধরনের তালাক তখনই পতিত হবে, যখন নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হবে যে (১) শর্তটি মুখে উচ্চারণ করা হয়েছে এবং (২) সেই শর্তটি পূরণ হয়েছে।
যেহেতু আপনি শর্তগুলোই মনে করতে পারছেন না, সেহেতু শর্ত পূরণ হয়েছে কি না তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই। তাই তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
চতুর্থত, সন্দেহের কারণে তালাক পড়বে না:
আপনার শেষ প্রশ্ন—সন্দেহের কারণে তালাক বাতিল হবে কি না? উত্তর হলো: হ্যাঁ, সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হয় না। তবে আমরা বলব এখানে “বাতিল” শব্দটি ব্যবহার না করে বলা ভালো—যেহেতু তালাক প্রমাণিত নয়, সেহেতু তা কার্যকর হয়নি। আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার বিবাহ এখনো বহাল আছে।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ بِهِ"
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে যে খেয়াল আসে তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।”
(সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)
এই হাদীস প্রমাণ করে যে, শুধু মনে মনে তালাকের সংকল্প করলে তালাক পতিত হয় না। আর আপনার ক্ষেত্রে তো উচ্চারণ করেছিলেন কি না—সেটাই সন্দেহের মধ্যে। তাই তালাক পতিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পরামর্শ:
১. আপনার স্ত্রী আপনার প্রতি বৈধ। আপনার মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক এখনো বহাল আছে।
২. ভবিষ্যতে এ ধরনের শর্তযুক্ত তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। তালাকের কথা মুখে উচ্চারণ করার আগে শতবার ভাবুন।
৩. তালাক নিয়ে বারবার সন্দেহ-প্রশ্ন তৈরি করবেন না, কারণ এতে সংসারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
৪. আপনি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারেন, আল্লাহ তা ক্ষমা করুন।
মহান আল্লাহ তাওফিক দিন।
সূত্রসমূহ:
- কুরআন: সূরা তালাক (৬৫:১)
- সহীহ বুখারী: ৫২৬৯
- সহীহ মুসলিম: ১২৭
- আল-হিদায়াহ: ১/২২৪
- রদ্দুল মুহতার: ৩/২৩০-২৩২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৫১-৩৫২
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৮৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/১২৮
- বেহেশতি জেওর: ২/৩৪৫