মুরগির বুকের উপরের কোন মাংশটুকু খাওয়া হারাম?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
(১) রোজা অবস্থায় জিহ্বা থেকে অনেক সময়ে কফ/ খাবার এটে থাকে, থুথু দিয়ে ফেললেও যেতে যায়না। এরকম অবস্থায় কাপড় দিয়ে মুছে নিলে তো রোজা ভেঙ্গে যাবে না ইনশা আল্লাহ, তাইনা?
(২) বেলকনির গাছগাছালিতে গোবর কম্পোস্ট এইগুলো ব্যবহার করলে তা তো টবের মাটির সাথে মিশে যায়, সেইগুলো বৃষ্টির পানিতে ঘরে সারা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে কি নাপাক হবে?
(৩) মুরগির বুকের উপরের কোন মাংশটুকু খাওয়া হারাম, সেটা কিভাবে বুঝব? এর পরিমান কতটুকু?
(৪) চর্মরোগী কি জান্নাতী? বা এরকম বিষয়ে কোন কুরআন হাদীসের নির্দেশনা আছে কি?
(৫) ডায়াপার পরা অবস্থায় বাচ্চা ফ্লোরের বসে ঘেমে ভিজা আর গন্ধ হলে কিন্তু প্যান্টে যদি ভেজা না থাকে তাহলে তো নাপাক হিসেবে বিবেচনা করা হবেনা। তাইনা?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: রোজা অবস্থায় জিহ্বায় কফ বা খাবারের অংশ আটকে থাকলে কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে রোজা ভাঙবে না। কেননা রোজা ভঙ্গের অন্যতম কারণ হলো গলার ভেতর দিয়ে কিছু পেটে প্রবেশ করানো। জিহ্বা থেকে কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা বা থুথু দিয়ে ফেলা রোজা ভঙ্গের কারণ নয়। তবে সতর্কতা হল, কফ বা খাবারের অংশ গিলে ফেলা থেকে বিরত থাকা। যদি কেউ ভুলে বা অনিচ্ছায় তা গিলে ফেলে, তাতেও রোজা ভাঙবে না (যদি তা খাদ্যবস্তু হিসেবে না হয়)।
দলিল:
রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে—যে ব্যক্তির মুখে কফ জমে তা গিলে ফেললে রোজা ভাঙে না, যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়। তবে জিহ্বায় আটকে থাকা কফ কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে তো কোনো সন্দেহই নেই যে রোজা সহীহ থাকবে।
(রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সাওম; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, কিতাবুস সাওম)
প্রশ্ন ২: গোবর (জানওয়ারের বিষ্ঠা) নাজাসাত বা নাপাক। কিন্তু আপনি যদি গোবর কম্পোস্ট টবের মাটির সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দেন যে তা মাটিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, তাহলে তা আর নাপাক হিসেবে গণ্য হবে না। বৃষ্টির পানি দিয়ে সেই মিশ্রিত মাটি ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লে, যেহেতু তা মাটি-কম্পোস্টের মিশ্রণে নাপাকের প্রভাব নেই, তাই মেঝে নাপাক হবে না। তবে যদি দেখা যায় যে নাপাকের স্পষ্ট আলামত (গন্ধ, রং, স্বাদ) থেকে যায়, তাহলে সেই স্থান ধুয়ে নেওয়া ভালো।
দলিল:
ফিকহের নীতি হলো—নাজাসাহ এমন বস্তু যা নিজে নাপাক, কিন্তু অন্য বস্তুর সাথে মিশে গিয়ে যদি তার থেকে নাপাকের বৈশিষ্ট্য (রং, গন্ধ, স্বাদ) বিলীন হয়ে যায়, তাহলে তা পবিত্র হিসেবে গণ্য হয়। (বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুত তাহারাহ)
প্রশ্ন ৩: মুরগির বুকের উপরের মাংস হারাম—এমন কোনো নির্দেশনা ইসলামে নেই। মুরগির সমস্ত হালাল পাখির মতোই হালাল। তবে ইসলামী শরীয়তে মুরগি যবেহ করার সময় রক্ত বের করা হয়, আর রক্ত হারাম। কিছু মানুষ মুরগির বুকের উপরের অংশে “গলার শিরা” বা “গ্রন্থি” জাতীয় জিনিস দেখে থাকেন, যা সাধারণত রক্ত বা শিরা, তা খাওয়া অনুচিত। এছাড়া মুরগির পুরো মাংস হালাল।
দলিল:
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল এবং অপবিত্র বস্তু হারাম ঘোষণা করা হয়।” (সূরা আ'রাফ: ১৫৭)। মুরগির মাংস পবিত্র ও হালাল।
প্রশ্ন ৪: চর্মরোগী জান্নাতী—এমন সরাসরি কোনো আয়াত বা হাদীস নেই। জান্নাত পাওয়া নির্ভর করে ঈমান, আমল ও আল্লাহর রহমতের উপর। তবে терпение (ধৈর্য) সহকারে রোগ সহ্য করলে আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ মাফ করেন এবং সওয়াব দেন। হাদীসে এসেছে: “মুসলিমের উপর যে রোগ-ব্যধি, কষ্ট, দুশ্চিন্তা, এমনকি কাঁটাবিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত হয়, তা তার গুনাহ মাফের কারণ হয়।” (বুখারী: ৫৬৪১, মুসলিম: ২৫৭৩)। অর্থাৎ চর্মরোগসহ যেকোনো রোগীদের জন্য ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সওয়াব আশা করা জান্নাতের পথে সহায়ক।
প্রশ্ন ৫: ডায়াপার পরা অবস্থায় বাচ্চা ফ্লোরে বসে ঘেমে ভিজা ও গন্ধ হলে কিন্তু প্যান্টে ভেজা না থাকলে তা নাপাক হবে না। কেননা ঘাম নিজে নাপাক নয়, আর যদি ডায়াপারের নাপাক (প্রস্রাব/পায়খানা) প্যান্ট বা ফ্লোরে স্থানান্তরিত না হয়, তাহলে সেটা পবিত্র রইল। তবে যদি নাপাকের কারণে ঘাম বা ভেজা অন্য জায়গায় লেগে যায় এবং গন্ধ বা রং দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে সেই জায়গা ধুয়ে নেওয়া আবশ্যক।
দলিল:
নাপাক বস্তু দ্বারা নাপাক হওয়ার শর্ত হলো নাপাকের অস্তিত্ব অন্য জায়গায় স্থানান্তর হওয়া। শুধু ঘাম বা ভেজা ভাব নাপাক নয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী; রদ্দুল মুহতার)
শেষ কথা:
প্রশ্নগুলোর উত্তর উপরোক্ত—সহীহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহী গ্রন্থ অনুযায়ী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনী ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।