দাম্পত্য সমস্যায় স্ত্রীর যৌন অনীহার কারণে হস্তমৈথুন বৈধ কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্ত্রীর যৌন মিলনের ইচ্ছা একেবারেই নাই। শুধুমাত্র আমার আগ্রহে হঠাত আমাদের মধ্যে এ সম্পর্ক হয়। কিন্তু এতে আমার চাহিদা মিটে না। আমি পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ি। আবার তা থেকে বেরিয়ে আসি, বর্তমানে হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত। তালাক, দ্বিতীয় বিয়ে এ মুহূর্তে সম্ভব না কোনভাবে। স্ত্রীকে অনেক বার বুঝানোর পরেও সে ভাবে শুধুমাত্র মিলনের জন্য তার সাথে আমি বিয়ে করেছি। আমস্র হস্তমৈথুন ব্যাতীত অন্য উপায় নেই, অন্যথায় আমার পরকীয়ায় যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এক্ষেত্রে আমার জন্য এটা অনুমোদিত হবে কিনা?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জবাব হলো—স্বাভাবিক অবস্থায় হস্তমৈথুন (মাস্টারবেশন) সম্পূর্ণ হারাম। এটি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত। তবে আপনার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ—আপনি একদিকে পরকীয়ার (জিনার) ভয়ানক গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন, অন্যদিকে স্ত্রীর সহবাসে অনীহার কারণে বৈধ উপায়ে চাহিদা পূরণও সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় ফিকহের কিছু বিশিষ্ট আলেম জরুরতের ভিত্তিতে হস্তমৈথুনের অনুমতি দিয়েছেন, তবে শর্তসাপেক্ষে এবং সাময়িক সমাধান হিসেবে। এক্ষেত্রে হস্তমৈথুন করা পরকীয়া তথা জিনা থেকে উত্তম, তবে এর অর্থ এই নয় যে, এটি সম্পূর্ণ জায়েজ বা গুনাহমুক্ত।
১. হস্তমৈথুনের মূল বিধান
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَىٰ وَرَاءَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْعَادُونَ
"যারা নিজের লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে, তবে নিজেদের স্ত্রী বা মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া—এতে তারা নিন্দিত হবে না। কিন্তু যারা এদের ছাড়া অন্য কিছু কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।" (সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭)
এই আয়াতের নির্দেশনা হলো, যৌন চাহিদা পূরণের একমাত্র বৈধ মাধ্যম স্ত্রী বা বৈধ দাসী। হস্তমৈথুন এর বাইরে হওয়ায় এটি নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে পবিত্র রাখে। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা পালন করে—কারণ রোজা তার জন্য যৌনক্ষুধা দমনের উপায়।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
হাদিসে বিবাহ বা রোজার কথা বলা হয়েছে, হস্তমৈথুনকে বৈধ উপায় বলা হয়নি। তাই হানাফি মাযহাবসহ জমহুর আলেমদের মতে, হস্তমৈথুন হারাম। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতারে লিখেছেন:
الاستمناء باليد حرام عند عامة العلماء
"হাতে হস্তমৈথুন করা সাধারণ আলেমদের মতে হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/১৩৪)
২. জরুরতের কারণে হস্তমৈথুনের বিধান
তবে ফিকহবিদগণ এমন কিছু ক্ষেত্রে হস্তমৈথুনের অনুমতি দিয়েছেন, যেখানে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে এবং অন্য কোনো বৈধ উপায় না থাকে। এর প্রমাণ হিসেবে আলেমগণ কুরআনের এই আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
"আর তোমরা নিজেদেরকে নিজ হাতে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৯)
আবার জরুরতের সময় হারাম জিনিসের ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ
"যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ বস্তু খেতে বাধ্য হয়—যতক্ষণ না সে সীমালঙ্ঘন করে এবং অভ্যাস করে—তার কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারা: ১৭৩)
এই নীতির ভিত্তিতে কিছু হানাফি আলেম মনে করেন—যদি কোনো ব্যক্তির জন্য জিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা এতই প্রবল হয় যে, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, এবং বিবাহও সম্ভব নয়, তবে ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য হস্তমৈথুন করা জায়েজ হতে পারে—কিন্তু তাও আবার এমন শর্তে যে, তা যেন গোপন থাকে, প্রাকৃতিক নিঃসরণের বেশি করা না হয়, এবং এটি কোনো অবস্থায় অভ্যাসে পরিণত না হয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) একটি মত উল্লেখ করেন যে, ফিতনার ভয়ে কেউ হস্তমৈথুন করলে তা নিষিদ্ধ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি নিজে এটিকে শক্তভাবে সমর্থন করেননি, বরং বলেছেন এটি "জিনার চেয়ে হালকা" মাত্র। (রদ্দুল মুহতার, ৬/১৩৫)
আরও দেখুন: ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫/৯৯; ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৫৩৫।
৩. আপনার করণীয়
আপনার অবস্থা খুবই কঠিন, তাই সমাধানের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল করুন:
(ক) স্ত্রীর যৌন অনীহার কারণ খুঁজুন: স্ত্রীর এমন আচরণের পেছনে শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক কারণ থাকতে পারে। হরমোনজনিত সমস্যা, প্রসবজনিত জটিলতা, অতীতের কোনো আঘাতজনিত অভিজ্ঞতা, দাম্পত্যের প্রাথমিক অভিযোগ ইত্যাদি এর কারণ হতে পারে। এজন্য ডাক্তার বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক সময় সঠিক চিকিৎসায় এটি সমাধান হয়ে যায়।
(খ) সহানুভূতিশীল আচরণ করুন: আপনি স্ত্রীকে নরমভাবে বোঝান যে, এটি শুধু শারীরিক চাহিদার বিষয় নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও সম্পর্কের অন্যতম অনুষঙ্গ। ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু মিলনের জন্য বিয়ে করা হয়নি, তবে এটি স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বৈধ অধিকারও বটে। আপনার প্রতি তার সহমর্মিতা দরকার।
(গ) স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করা স্ত্রীর দায়িত্ব: ইসলামি ফিকহে সুস্থ স্ত্রীর জন্য স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করা ওয়াজিব—যতক্ষণ না তাতে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ফকিহগণ বলেছেন, স্ত্রী যদি কোনো বৈধ ওজর ছাড়া সহবাসে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সে মারাত্মক গুনাহগার হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫১১)। সুতরাং আপনি আপনার স্ত্রীকে জানিয়ে দিন, এতে তার নিজেরও গুনাহ হচ্ছে।
(ঘ) সংকটকালীন পদক্ষেপ: আপনার বর্তমান অবস্থায় যে হস্তমৈথুন করতে হচ্ছে, এটি জায়েজ বা সম্পূর্ণ বৈধ নয়, তবে পরকীয়ার মতো জঘন্য গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য এটি ক্ষমার যোগ্য হতে পারে। তবে এটিকে বৈধ করার কোনো অবকাশ নেই। আপনি চেষ্টা করুন:
১. রোজা রাখার মাধ্যমে কামশক্তি নিয়ন্ত্রণ করুন, বিশেষত সুন্নতের (প্রতি সপ্তাহে সোম-বৃহস্পতিবার) রোজা। ২. ফজরের নামাজের পর তিলাওয়াত ও জিকিরে সময় দিন, যাতে শয়তান থেকে বাঁচতে পারেন। ৩. প্রয়োজনে স্ত্রীকে নিয়ে দ্বীনি পরিবেশে সময় কাটান, একসাথে হালাল রিযিকের পরিকল্পনা করুন। ৪. কিছুদিনের জন্য আলাদা বিছানায় না ঘুমিয়ে অভ্যাস গড়ুন, ঘুমানোর আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন।
(ঙ) তালাক ও দ্বিতীয় বিয়ে: আপনি বলেছেন এটি সম্ভব নয়, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যান। ধৈর্যের সাথে দোয়া করুন—ইনশাআল্লাহ আল্লাহ সহজ পথ বের করবেন। তবে তালাক না দিয়ে চলার চেষ্টা করুন, যতক্ষণ না আর কোনো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়।
চূড়ান্ত ফতোয়া
আপনার অবস্থার আলোকে আমরা বলব—
১. হস্তমৈথুন স্বাভাবিকভাবে হারাম, আপনার জন্যও মূল বিধানে হারাম। ২. কিন্তু যেহেতু আপনি জিনা থেকে বাঁচার জন্য অত্যন্ত সংকটে আছেন, সেহেতু প্রয়োজনের তাগিদে শুধু ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য হস্তমৈথুন করা জিনার চেয়ে উত্তম, তবে এটি গুনাহমুক্ত নয়। ৩. দ্রুত স্ত্রীর সমস্যার সমাধান করুন,প্রয়োজনে তার চিকিৎসা করান এবং নিয়মিত ইসলামি জীবনযাপনের মাধ্যমে কামশক্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। আল্লাহপাক আপনার অসুবিধা দূর করুন, আমিন।
তথ্যসমূহ:
- সূরা মুমিনুন: ৫-৭; সূরা বাকারা: ১৭৩, ২১৯
- সহিহ বুখারি: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম: ১৪০০
- রদ্দুল মুহতার: ৬/১৩৪-১৩৫
- ফাতাওয়া আলমগীরি (হিন্দিয়া): ৫/৯৯
- ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৫৩৫
- মাআরিফুল কুরআন: ৬/১২৪-১২৫