৮ম দিনে সাদা স্রাব দেখার কিছুক্ষণ পর হালকা বাদামী স্রাব চলে আসলে করণীয় কি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
উস্তায, আমার হায়েজ প্রতি মাসে ৫/৬ দিনেই ঠিক হয়ে যায়।হায়েজের আজ ৮ম দিন চলমান সাদা স্রাব দেখতে পাচ্ছি এর কিছুক্ষণ পরেই আবার হালকা বাদামী স্রাব দেখা যাচ্ছে। এখন কিভাবে বুঝবো যে পবিত্র হয়েছি কিনা? এভাবে যদি ১০ দিন অতিক্রম হয়ে যায় তাহলে কি বিগত মাসের অভ্যাস ধরে বাকি দিনগুলোর স্বলাত কাযা করে নিব?এর আগে কখনো এমন হয়নি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমেই জেনে নিতে হবে—হায়েজের পবিত্রতার শরয়ী বিধান কী এবং ১০ দিনের বেশি চললে কী করণীয়। আশা করি নিচের বিস্তারিত উত্তর আপনার সমস্যা দূর করবে।
১. পবিত্র হওয়ার চিহ্ন কী?
মাসিক চক্রের সময় রক্ত ও অন্যান্য স্রাব (বাদামী, হলুদ, পাটালে, গাঢ় লাল) হায়েজের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র হওয়ার প্রকৃত আলামত হলো—সম্পূর্ণভাবে স্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভেতরে শুষ্কতা চলে আসা। সাধারণত সাদা স্রাব দেখা দেওয়া পবিত্রতার আলামত হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু তা তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন সেই সাদা স্রাব একটানা চলতে থাকে এবং তার পরে আর কোনো রক্ত বা বাদামী স্রাব না আসে।
আপনি লিখেছেন, ৮ম দিনে সাদা স্রাব দেখছেন, আবার কিছুক্ষণ পরেই হালকা বাদামী স্রাব চলে আসছে। সুতরাং এ অবস্থায় আপনি এখনো পবিত্র হননি। কারণ বাদামী স্রাবও হায়েজেরই অংশ (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৬; রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৬)। আপনি যদি ১০ দিনের মধ্যে এমন দেখেন—যেমন একটানা সাদা স্রাব বা সম্পূর্ণ শুকনো ভাব—তাহলেই আপনি পবিত্র গণ্য হবেন।
২. ১০ দিন অর্থাৎ হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেলে করণীয়
ইসলামি শরিয়তে হায়েজের সর্বোচ্চ সময়কাল ১০ দিন ১০ রাত। এর বেশি রক্ত-স্রাব চললে সেটি আর হায়েজ থাকে না, বরং ইস্তিহাযা (অস্বাভাবিক স্রাব) গণ্য হয়। আপনার নিয়মিত অভ্যাস (আদ্দাত) প্রতি মাসে ৫/৬ দিন। এখন যদি এ মাসে রক্ত ১০ দিন পেরিয়ে যায় এবং এর মধ্যে পবিত্রতার চিহ্ন না পাওয়া যায়, তাহলে নিয়ম হলো:
- আপনার অভ্যাস অনুযায়ী শুধু ৫/৬ দিনই হায়েজ ধরা হবে।
- এরপর থেকে ১০ দিন পর্যন্ত যত দিন রক্ত/স্রাব ছিল, সেগুলো ইস্তিহাযা।
- ইস্তিহাযার দিনগুলোতে নামাজ পড়া ফরজ ছিল; তাই আপনাকে ওই দিনগুলোর নামাজ কাযা করতে হবে।
উদাহরণ:
ধরুন, আপনার অভ্যাস ৫ দিন। এ মাসে ১০ দিন পর্যন্তই রক্ত/স্রাব চলল এবং পরে বন্ধ হলো। তাহলে—
- হায়েজ = ৫ দিন (অভ্যাস অনুযায়ী)
- ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম দিন পর্যন্ত ৫ দিনের নামাজ কাযা করতে হবে।
- আর যদি অভ্যাস ৬ দিন হয়, তাহলে ৭ম থেকে ১০ম দিন পর্যন্ত ৪ দিনের নামাজ কাযা।
১১তম দিন থেকে আপনি পবিত্র অবস্থায় নামাজ শুরু করবেন এবং গোসল করে নেবেন।
দ্রষ্টব্য: হায়েজের সময় স্থায়ী পবিত্রতা না পেলে ১০ দিনের মধ্যে সাদা স্রাব দেখা দিলেও সেটি পবিত্রতা হিসেবে ধরা হবে না, কেননা পরে আবার বাদামী স্রাব এসেছে। তাই ১০ দিন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং এর মধ্যে কোনো দিন একটানা সুখ/সাদা স্রাব দেখলে সেদিনই গোসল করে নামাজ শুরু করা, আর না দেখলে ১০ দিন পূর্ণ হলে উপরের নিয়মে কাযা করা—এটিই নির্ভরযোগ্য বিধান।
৩. শুধু সাদা স্রাব দেখলে কি পবিত্র মনে হবে?
যদি আপনি কোনো এক সময় (১০ দিনের মধ্যে) একটানা সাদা স্রাব দেখেন এবং পরে আর কোনো বাদামী বা রক্তযুক্ত স্রাব না আসে, তাহলে সেই মুহূর্ত থেকে আপনি পবিত্র হয়ে যাবেন। তখন গোসল করে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত শুরু করতে হবে। কিন্তু মাঝে সাদা স্রাব দেখার পর আবার বাদামী/রক্ত এলে পবিত্রতা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৪. দলিল ও নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
- সূরা আল-বাকারা, ২:২২২ — "তারা তোমাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, তা কষ্টদায়ক। তাই তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে দূরে থাকো এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না।"
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৯৭ — আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন হায়েজ শুরু হয়, নামাজ ছেড়ে দাও। আর যখন হায়েজ শেষ হয়ে যায়, তখন গোসল করে নামাজ পড়ো।"
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/২৮৩ — "রক্তের রং বাদামী, হলুদ, পাটালে বা মাটি মিশ্রিত যাই হোক, সর্বাবস্থায় হায়েজের বিধান প্রযোজ্য; একমাত্র তখনই পবিত্রতা সাব্যস্ত হবে যখন রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং শুষ্কতা দেখা দেবে।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭ — "যদি স্বাভাবিক অভ্যাসের বেশি রক্ত দেখে কিন্তু ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ না হয়, তবে ১০ দিন পূর্ণ হলে তা ইস্তিহাযায় পরিণত হবে এবং গোসল করে নামাজ কাযা করতে হবে; হায়েজের মেয়াদ অভ্যাস অনুযায়ীই গণনা করা হবে।"
- বাদাইউস সানায়ি (ইমাম কাসানী), ১/৪২ — "ইস্তিহাযার দিনগুলো নামাজ ও রোজার ক্ষেত্রে পবিত্র নারীর মতো; সুতরাং ওই দিনগুলোর নামাজ পড়া ফরজ এবং ছুটে গেলে কাযা করা ওয়াজিব।"
৫. সংক্ষিপ্ত উত্তর (আপনার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান)
আপনি এখন ৮ম দিনে আছেন, এবং সাদা স্রাবের পর আবার বাদামী স্রাব আসছে। তাই এই মুহূর্তে আপনি পবিত্র নন। ১০ দিন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এর মধ্যে যদি কোনো সময় একটানা সাদা স্রাব বা শুষ্কতা দেখা দেয় এবং আর রক্ত/বাদামী না আসে, তাহলে সেদিনই গোসল করে নামাজ শুরু করে দেবেন। আর যদি ১০ দিন পার হয়ে যায়, তাহলে ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর গোসল করবেন এবং আপনার অভ্যাস ৫/৬ দিন ধরে হায়েজ গণনা করে, অভ্যাসের পর থেকে ১০ দিন পর্যন্ত যত দিন ছিল, সেগুলোর নামাজ কাযা করবেন। ১১তম দিন থেকে নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করবেন।
মনে রাখবেন: এ মাসে প্রথমবার এমন হওয়ায় কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, এটি অনেক নারীর ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে পরের মাসগুলোতে যদি এমন নিয়মিত ঘটে, তাহলে আপনার অভ্যাস নতুন করে ধরা হবে।
আল্লাহ তায়ালা আপনার অবস্থা সহজ করুন এবং ইবাদতে মনোযোগ দিন।