বোনকে শাসন

Family Life · Hanafi

Question No: 3306
Questioner: Sazzad Al Haque
Question Asked: 31 Jul 2026, 02:34 PM
Reviewed & Published: 31 Jul 2026, 02:37 PM
Views: 13
Tokens: 6,130
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বাবার মৃত্যুর পর বোনকে শাসন করা কি ভাইয়ের উপর দায়িত্ব?
প্রাপ্তবয়স্ক বোন যদি অবাধ্য হয় এবং অনেক বুঝানোর পরও শারিয়াহ বিরোধী আচরণ করে তাহলে তাঁকে কিভাবে শাসন করা যায়? তাঁকে কি প্রহার বা ধমক দেয়া যাবে?

Answer

বাবার মৃত্যুর পর বোনকে শাসন করা: ইসলামী বিধান

প্রশ্নের উত্তর

১. ভাইয়ের দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা

বাবার মৃত্যুর পর ভাইয়ের উপর বোনের দেখাশোনার দায়িত্ব রয়েছে, বিশেষত যদি বোন অবিবাহিত থাকে এবং অভিভাবকহীন হয়। তবে শাসন বলতে এখানে অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান বোঝানো হয়েছে, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সহীহ বুখারী: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম: ১৮২৯)

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ "মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু ও সাহায্যকারী।" (সূরা আত-তাওবা: ৭১)

তবে প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) বোনের বিষয়ে তার ইচ্ছার বিপরীতে জোর-জবরদস্তি করা ভাইয়ের জন্য জায়েয নয়। হানাফি ফিকহে প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার নিজের বিষয়ে বৈধ সিদ্ধান্ত নিতে স্বাধীন। (আল-হিদায়া, ২/৩০; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪৫০)


২. অবাধ্য বোনকে শাসনের সঠিক পদ্ধতি

বোন যদি শারিয়াহ বিরোধী আচরণ করে, তাহলে ইসলাম নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী নিম্নোক্ত ধাপসমূহ গ্রহণ করা উচিত:

(ক) নসীহত ও সদুপদেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তোমার রবের পথের দিকে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করো।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)

সুতরাং প্রথমে নরম ভাষায়, ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতে হবে। ইসলামে কঠোরতা নয়, বরং নম্রতা দিয়ে মানুষকে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

(খ) সম্পর্কের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

বোন যদি খারাপ পথে যেতে থাকে, তাহলে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে বরং দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া চালিয়ে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا "সহজ করো, কঠিন করো না।" (সহীহ বুখারী: ৬৯)

(গ) বিশেষজ্ঞ বা আলেমের সাহায্য গ্রহণ

বোনকে নিজে বুঝাতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় আলেম, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ বা দ্বীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা বৈধ ও প্রশংসনীয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৪০)


৩. প্রহার বা ধমকের বিধান

প্রহার করা জায়েয নয়

হানাফি মাযহাবের সুস্পষ্ট মতানুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) বোন বা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়কে প্রহার করার অধিকার ভাইয়ের নেই। ইসলামে প্রহারের অনুমতি কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে, যেমন স্ত্রীর জন্য সীমিত শর্তে, অথবা আদালতের নির্দেশে শারিয়াহ শাস্তি (হুদুদ/তাযীর)। বোন মামলায় এই অনুমতি প্রযোজ্য নয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন (رحمة الله عليه) বলেন:

"প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে শাসন করার উদ্দেশ্যে প্রহার করা বৈধ নয়, যতক্ষণ না কাযী (বিচারক) তার শাস্তি নির্ধারণ করেন।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২০৮)

ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

"নারীর উপর তার মাহরাম আত্মীয়ের প্রহার করার অধিকার নেই।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৮০)

নবী ﷺ-এর নির্দেশ:

لَا يُجْلَدُ فَوْقَ عَشْرَةِ أَسْوَاطٍ إِلَّا فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ "আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির ক্ষেত্র ছাড়া দশটি বেত্রাঘাতের বেশি কাউকে প্রহার করা যাবে না।" (সহীহ বুখারী: ৬৮৪৯; সহীহ মুসলিম: ১৭০৮)

এই হাদিসটি সাধারণ নিয়ম বর্ণনা করে যে ব্যক্তিগতভাবে প্রহার করা ইসলামে সমর্থিত নয়।

ধমক দেওয়ার বিধান

ধমক বা ভয় দেখানো জরুরি প্রয়োজনে ন্যূনতম মাত্রায় জায়েয হতে পারে যদি তা উপকারী হয়, তবে এটি শর্তসাপেক্ষ:

  • ধমক যেন হারাম কাজে সহায়ক না হয়
  • ধমক যেন ব্যক্তিগত সম্মানহানির কারণ না হয়
  • ধমক দিয়ে কল্যাণের আশা থাকতে হবে

তবে উত্তম পদ্ধতি হলো ধমক না দিয়ে সদুপদেশ ও নম্রতা


৪. বাড়ির বাইরে শারিয়াহ বিরোধী কাজ করলে

যদি বোন প্রকাশ্যে শারিয়াহ বিরোধী কাজ করে (যেমন পাপ কাজে লিপ্ত হয়) এবং নসীহত ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে ভাইয়ের করণীয়:

  • মানুষের সামনে তাকে লজ্জিত না করা; কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৯৯)

  • দুআ করা, যাতে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন।

  • বিষয়টি গুরুতর ও ফিতনার কারণ হলে স্থানীয় মুসলিম শাসক বা আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩২০)


৫. সাধারণ নিয়ম

ইমাম আবু হানীফা (رحمة الله عليه) সহ হানাফি ইমামগণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে:

"الرَّجُلُ لَا وِلَايَةَ لَهُ عَلَى أُخْتِهِ الْبَالِغَةِ فِي أُمُورِهَا الشَّخْصِيَّةِ" "প্রাপ্তবয়স্ক বোনের ব্যক্তিগত বিষয়ে ভাইয়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই।"

তবে তার উপদেশ দেওয়া, সাহায্য করা এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া ভাইয়ের দায়িত্ব। (আল-মাবসূত, সারাখসী ৫/৯; ফাতাওয়া বাযাযিয়্যাহ ৪/৮০)


উপসংহার

বাবার মৃত্যুর পর অবাধ্য বোনের দেখাশোনা ও দ্বীনি সংশোধনের চেষ্টা ভাইয়ের দায়িত্ব। কিন্তু তা করতে হবে নম্রতা, সদুপদেশ, ধৈর্য এবং ভালোবাসার মাধ্যমে। প্রহার করা বৈধ নয়, ধমক দেওয়াও উচিত নয় (অবশ্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমিত ধমক জায়েয আছে)। বোনের হেদায়েতের জন্য অধিক দুআ করা এবং এলাকার দ্বীনদার আলেমের সাহায্য নেওয়া উত্তম। যদি বিষয়টি গুরুতর হয়, তাহলে সরকারি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে প্রহার বা নির্যাতন করা সম্পূর্ণ অবৈধ।

রব্বানী পথ এই যে, "তোমারে দিয়ে কাজ নয় বলিয়া তুই ফিরে যা" — এই ভাব একান্তই ইসলাম-বিরোধী।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দিন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.