বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র ক্রয় বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3269
Questioner: Saruar Zahan
Question Asked: 30 Jul 2026, 07:46 PM
Reviewed & Published: 30 Jul 2026, 08:24 PM
Views: 10
Tokens: 7,664
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আমার একটি ছোট আইটি এজেন্সি কোম্পানি রয়েছে, যা জুলাই ২০২৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে। বর্তমানে আমাদের টিমে ১১০+ সদস্য রয়েছে। আগে আমি চাকরি করতাম এবং নিয়মিত আয়কর প্রদান করতাম। এখন যেহেতু আমার নিজস্ব কোম্পানি হয়েছে, তাই ইন শা আল্লাহ কোম্পানির পক্ষ থেকেও নিয়মিত কর প্রদান করব।

সম্প্রতি আমি একজন ট্যাক্স কনসালট্যান্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যদি আমি বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র ক্রয় করি, তাহলে সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ট্যাক্স রিবেট (Tax Rebate) পাব। এছাড়াও, সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকার প্রতি তিন মাস পরপর একটি নির্ধারিত পরিমাণ মুনাফা/রিটার্ন প্রদান করে।

আমার প্রশ্ন হলো—
১. শুধুমাত্র ট্যাক্স রিবেট পাওয়ার উদ্দেশ্যে সঞ্চয়পত্র ক্রয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল ও বৈধ (জায়েজ) কি না?
২. সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি তিন মাস পরপর যে মুনাফা বা রিটার্ন প্রদান করা হয়, সেটি ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল নাকি সুদ (রিবা)?
৩. কুরআন, সহিহ হাদিস এবং স্বীকৃত ফিকহি মতামতের আলোকে এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী?
৪. যদি মূল উদ্দেশ্য ট্যাক্স রিবেট গ্রহণ করা হয় এবং প্রাপ্ত মুনাফা নিজে ভোগ না করে অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান পরিবর্তিত হয় কি না?

এ বিষয়ে কুরআন, সুন্নাহ আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা জানালে উপকৃত হব।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার:
আপনি বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে ট্যাক্স রিবেট পাওয়ার এবং প্রতি তিন মাস পর পর প্রাপ্ত মুনাফা/রিটার্নের বৈধতা জানতে চেয়েছেন। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কি হালাল না হারাম? শুধু ট্যাক্স রিবেটের উদ্দেশ্যে ক্রয় করলে কি বিধান পরিবর্তিত হয়?

সরাসরি ফতোয়া:

বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র ক্রয় করা এবং তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা হারাম (সুদ/রিবা)। এই মুনাফা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। ট্যাক্স রিবেট পাওয়ার উদ্দেশ্য এই বিধান পরিবর্তন করে না।


বিস্তারিত দলিল ও বিশ্লেষণ:

১. সঞ্চয়পত্রের প্রকৃতি ও সুদের (রিবা) সংজ্ঞা:

সাধারণত বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র একটি ঋণ-ভিত্তিক বন্ড যেখানে সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ধার করে এবং নির্ধারিত হারে (প্রতি তিন মাসে) মুনাফা প্রদান করে। এই মুনাফা পূর্বনির্ধারিত ও গ্যারান্টিযুক্ত, যা স্পষ্টতই সুদ (রিবা)

কুরআন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبَا أَضْعَافًا مُّضَاعَفَةً
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩০)

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)

হাদিস:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষীদ্বয়কে অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৭)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ সকল হানাফি ফকীহ সুদের এই সংজ্ঞায় একমত: ঋণের ওপর কোনো পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত লাভ নেওয়া সুদ (রিবা)


২. সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কেন হারাম?

  • সরকারের সঙ্গে এখানে একটি কর্জ (ঋণ) চুক্তি হচ্ছে।
  • এই ঋণের ওপর নির্ধারিত হারে মুনাফা দেওয়ার শর্ত রয়েছে, যা কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট রিবা
  • ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

    كل قرض جر نفعاً فهو ربا
    "প্রত্যেক এমন ঋণ যা লাভ টানে, তা সুদ।" (রাদ্দুল মুহতার: ৫/১৬৭)

এমনকি যদি সরকারের উদ্দেশ্য কল্যাণকর হয়, তবুও চুক্তির ধরন সুদভিত্তিক হওয়ায় তা হারাম।


৩. ট্যাক্স রিবেটের উদ্দেশ্যে সঞ্চয়পত্র ক্রয়:

ট্যাক্স রিবেট একটি সরকারি কর সুবিধা যা বৈধ উপায়ে অর্জন করলে জায়েজ। কিন্তু যদি তা অর্জনের মাধ্যমই হারাম হয় (সুদভিত্তিক সঞ্চয়পত্র), তাহলে সেই উপায় গ্রহণ করা জায়েজ নয়।

  • হানাফি ফিকহের নীতি:

    الوسيلة إلى الحرام حرام
    "হারামের দিকে নিয়ে যায় এমন মাধ্যমও হারাম।" (উসুলুশ শাশী: ৩৫)

অতএব, শুধুমাত্র ট্যাক্স রিবেট পাওয়ার জন্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করাও হারাম। কেননা আপনি একটি সুদী লেনদেনে অংশ নিচ্ছেন।


৪. মুনাফা নিজে না খেয়ে অন্যভাবে ব্যয় করলে কি বিধান পরিবর্তিত হয়?

না, বিধান পরিবর্তিত হয় না। কারণ হারাম হচ্ছে লেনদেনের প্রকৃতি (সুদভিত্তিক চুক্তি), শুধু মুনাফা ভোগ করা নয়। আপনি যদি মুনাফা গ্রহণ করেন এবং তা দান করে দেন, তবুও আপনি সুদী চুক্তিতে অংশগ্রহণের গুনাহ থেকে মুক্ত হবেন না।

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:
    সুদের অর্থ গ্রহণকারী যদি তা বিলিয়ে দেয়, তবুও সে সুদখোরের গুনাহে লিপ্ত হবে। (আল-মাবসুত, সারাখসী: ১৪/৩৬)

তবে যদি ইতিমধ্যে আপনার কাছে সঞ্চয়পত্র থেকে মুনাফা এসে থাকে, তাহলে তা নিজে ব্যবহার না করে গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে এবং তওবা করতে হবে। আগামীতে আর এ ধরনের বিনিয়োগ না করার সংকল্প করতে হবে।


৫. বৈধ বিকল্প:

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ইসলামি বন্ড (সুকুক) চালু আছে কি না তা জানা প্রয়োজন। কিন্তু যতদূর জানা যায়, সাধারণ সঞ্চয়পত্র সুদভিত্তিক। তাই কোনো ইসলামি শরিয়াহ সম্মত বিনিয়োগ যেমন—

  • সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ
  • কোনো ইসলামি ব্যাংকের শরিয়াহ-সম্মত মেয়াদি আমানত
  • বা নিজ কোম্পানির সম্পদ বৃদ্ধি

এগুলোতে বিনিয়োগ করে ট্যাক্স রিবেটের সুবিধা নেওয়া জায়েজ হবে (যদি আইনগতভাবে সম্ভব হয়)।

প্রস্তাবিত সমাধান:

আপনি আপনার আইটি কোম্পানির ব্যালেন্স শিট থেকে হালাল উপায়ে কর ব্যবস্থাপনা করুন। যেমন—

  • নিজ কোম্পানির সম্পদ ক্রয় (যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার লাইসেন্স)
  • বৈধ বিনিয়োগে সম্পদ বাড়ানো
  • প্রয়োজনে একজন ইসলামি ফিকহি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র:

  • কুরআন: সূরা বাকারা ২৭৫-২৭৯, সূরা আলে ইমরান ১৩০
  • সহীহ মুসলিম: ১৫৯৭
  • রাদ্দুল মুহতার: ৫/১৬৭
  • ফতোয়া উসমানী: ৩/৪৮২
  • ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/২৭৫
  • বেহিশতি জেওর: ৩/৫৪ (সুদ অধ্যায়)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.