শর্তযুক্ত তালাক, নিয়ত, ওয়াসওয়াসা ও মনের চিন্তার শরয়ি বিধান।
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর (Answer):
আপনার প্রশ্নে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের বিস্তারিত ইসলামি বিধান নিচে দেওয়া হলো। আমরা শুধুমাত্র কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহের (ইবনে তাইমিয়্যা, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে বায, আলবানী, উসাইমীন, সালেহ আল-ফাওযান) গ্রহণযোগ্য মতামত অনুসারে উত্তর দিচ্ছি।
১. শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মু'আল্লাক) ও নিয়তের গুরুত্ব
নিয়ম:
শর্তযুক্ত তালাকের ব্যাপারে সালাফি আলেমদের মত হল— যদি স্বামী শর্ত আরোপ করার সময় তালাকের নিয়ত করে (অর্থাৎ, সত্যিই সে চায় যে শর্ত পূরণ হলে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে), তাহলে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। কিন্তু যদি সে শুধু ভয় দেখানো, শাসন করা, বা স্ত্রীকে কোনো কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য এমন কথা বলে, এবং তার অন্তরে তালাকের কোনো নিয়ত না থাকে, তাহলে তা তালাক নয়, বরং একটি শপথ (ইয়ামীন) গণ্য হবে। শর্ত পূরণ হলে তার উপর শপতের কাফফারা (দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা তিনদিন রোজা) ওয়াজিব হবে, তালাক পতিত হবে না।
প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: «إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ» (নিশ্চয় সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল) [বুখারী, মুসলিম]।
- ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মত: যে তালাক শর্তযুক্ত করে বলা হয় কেবল ভয় দেখানোর জন্য, তাতে তালাক পতিত হয় না, বরং তা ইয়ামীনে পরিণত হয়। [মাজমু’ ফাতাওয়া ৩৩/১০৯, ই’লামুল মুওয়াক্কি’ঈন ৩/৩৩]
- শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: “যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে, শুধু ধমক দেওয়ার জন্য বলে, তাহলে তা তালাক নয়; বরং কাফফারা দিতে হবে।” [মাজমু’ ফাতাওয়া ২২/৪০]
- শায়খ উসাইমীন (রহ.) বলেন: “শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের দিকে খেয়াল করতে হবে। যদি নিয়ত তালাকের হয়, তাহলে তালাক হবে। আর যদি শুধু ভয় দেখানোর হয়, তাহলে তা ইয়ামীন।” [আশ-শারহুল মুমতি’ ১২/৪০০]
আপনার প্রথম ও তৃতীয় ঘটনা:
আপনার স্বামী যখন বলেছেন, “cheating করলে বাকি দুইটা তালাক হয়ে যাবে” এবং পরে স্বীকার করেছেন যে তিনি শর্ত দেননি, শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলেছিলেন, তালাকের কোনো নিয়ত ছিল না, এবং সেদিনই তিনি তা উঠিয়ে নিয়েছেন— তাহলে এটা কোনো শর্তযুক্ত তালাক নয়। আপনার পক্ষ থেকে শর্ত পূরণ (cheating) না হলে কোনো সমস্যা নেই। এমনকি যদি শর্ত পূরণও হতো, তবুও যেহেতু তিনি তালাকের নিয়ত করেননি, তাই তালাক পতিত হতো না; বরং কাফফারা দিতে হতো। আর তিনি সেটা উঠিয়ে নেওয়ায় কাফফারাও ওয়াজিব হয়নি।
“তালাক” শব্দ না বললে:
যদি তিনি “তালাক” শব্দটি মুখে না এনে বলেন “cheating করলে ডিভোর্স হবে”, কিন্তু “ডিভোর্স” শব্দটির অর্থ “তালাক”-ই বোঝায়, তাহলে সেটিও তালাকের শর্ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে নিয়ত না থাকায় একই বিধান প্রযোজ্য।
২. ক্লাসমেটের সাথে ফোন কল ও মনে আসা চিন্তা
মনে আসা অনিচ্ছাকৃত চিন্তা:
আপনি শুধু পরীক্ষা ও সহপাঠীদের বিষয়ে কথা বলেছেন, কোনো রোমান্টিক বা নেতিবাচক কথা বলেননি। আর সেই সময় আপনার মনে কিছু চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) এসেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে। শরিয়তে অনিচ্ছাকৃত মনের কথা (হাদীসুন নাফস) ক্ষমার যোগ্য।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
“নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।” [বুখারী, মুসলিম]
তাই আপনার এই চিন্তার কারণে কোনো গুনাহ, তালাক বা অন্য কোনো সমস্যা হবে না। আপনার স্বামী এ ব্যাপারে জানেন, এবং আপনার পরিবারের সদস্য সাক্ষী দিয়েছেন যে কোনো নেতিবাচক কথা হয়নি— তাই কোনো অভিযোগের সুযোগ নেই।
ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহপ্রবণতা:
যেহেতু আপনি ওসিডি (ওসিডি) ট্রিটমেন্ট চলছেন, এটি একটি রোগ। শরিয়তে এ ধরনের ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহ হলে আপনি শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে করে তাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহ বলেন: وَمَا كَانَ لِلَّهِ مِنْ سُلْطَانٍ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ (সূরা হিজর: ৪২)।
৩. স্বামীর ভয় দেখানো ও শর্ত না দিয়ে কথা বলা
আপনার স্বামী যদি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন যে তিনি কখনো শর্তযুক্ত তালাক দেননি, এবং শুধু রাগের মাথায় ভয় দেখানোর জন্য “সাবধানে থাকো” জাতীয় কথা বলেছেন, আর তালাক শব্দটিও উচ্চারণ করেননি— তাহলে তাতে কোনো তালাক পতিত হয়নি। বরং তা কেবল একটি রাগের প্রকাশ মাত্র।
একইভাবে, “cheating করলে তালাক হয়ে যাবে” বললেও যদি তিনি নিয়ত না করে থাকেন, তাহলে সেটিও তালাক নয়। শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “শর্তযুক্ত তালাক শুধু তখনই কার্যকর হয় যখন স্বামী তালাকের নিয়ত করে; অন্যথায় তা ইয়ামীন।” [আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ৩/২২৭]
উঠিয়ে নেওয়া: তিনি যদি সেদিনই নিজের কথা উঠিয়ে নেন, তবে তা আরও শক্ত প্রমাণ যে তিনি তালাক চাননি। কোনো সমস্যা নেই।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া (সারসংক্ষেপ)
- প্রথম ও তৃতীয় ঘটনা: আপনার স্বামীর উচ্চারিত “micro cheating বা cheating করলে তালাক” ইত্যাদি বাক্য তালাক নয়। যেহেতু তিনি তালাকের নিয়ত করেননি, শুধু ভয় দেখিয়েছেন, এবং শর্ত পূরণ হয়নি। কোনো তালাক পতিত হয়নি।
- দ্বিতীয় ঘটনা: আপনার অনিচ্ছাকৃত মনের চিন্তা বা ক্লাসমেটের সাথে পরীক্ষা সংক্রান্ত সাধারণ কথোপকথনে কোনো সমস্যা নেই।
- ওয়াসওয়াসা: আপনার ওসিডি চিকিৎসা চালিয়ে যান। শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে করে এড়িয়ে চলুন।
পরামর্শ: স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত রাগের সময় তালাকের শব্দ ব্যবহার না করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: তালাক এমন একটি জিনিস যা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য হালাল কাজ (আবু দাউদ)। সুতরাং বিষয়টিকে হালকাভাবে নেবেন না।