বাসায় দেবর, ননদ ও কাজের মেয়ে থাকলে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ীর অনুপস্থিতিতে থাকা জায়েজ কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি অনুযায়ী, আপনার বাসায় ২ দিনের জন্য শুধু আপনি (স্ত্রী), দেবর (স্বামীর ছোট ভাই বা বড় ভাই), ননদ (স্বামীর বোন) এবং কাজের মেয়ে থাকবেন। স্বামী দূরে থাকেন এবং শ্বশুর-শাশুড়ী অন্য জায়গায় যাবেন। এই অবস্থায় বাসায় থাকা জায়েজ কি না, তা ইসলামী শরিয়ত ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
১. মাহরাম ও গায়রে মাহরামের পরিচয়:
-
মাহরাম: সেই আত্মীয় যাকে বিবাহ করা চিরতরে হারাম (যেমন পিতা, ভাই, চাচা, নানা, ছেলে, ভাতিজা, শ্বশুর, ননদ (স্বামীর বোন) ইত্যাদি)। ননদ আপনার মাহরাম, কারণ তিনি স্বামীর বোন। তাই তাঁর সাথে পর্দা ফরজ নয়, তবে শালীনতা বজায় রাখা ভালো।
-
গায়রে মাহরাম: সেই ব্যক্তি যাকে বিবাহ করা জায়েজ (যেমন চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, দেবর, ভাসুর ইত্যাদি)। দেবর (স্বামীর ভাই) আপনার গায়রে মাহরাম। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমাদের স্ত্রীদের ভাইদের থেকেও তোমরা পর্দা করবে না? বরং তারা হল মৃত্যুর মতো বিপদজনক।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৩২; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস: ২৪৭)
হাদীসে দেবরকে "মৃত্যু" এর সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ দেবরের সাথে একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ করা সহজেই শয়তানের প্ররোচনায় পাপের কারণ হতে পারে।
২. নির্জনতা (খলওয়াত) ও তার বিধান:
ইসলামে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের একান্তে (নির্জনে) মিলিত হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কোনো পুরুষ যেন কোনো মহিলার সাথে একান্তে (নির্জনে) না মিলিত হয়, কারণ তাদের তৃতীয় জন হলো শয়তান।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২১৭১; মুসনাদে আহমদ)
আপনার প্রশ্নে, ২ দিনের জন্য শ্বশুর-শাশুড়ী বাসায় নেই, স্বামী দূরে আছেন। এ অবস্থায় আপনার সাথে দেবরের একই বাসায় অবস্থান করা একটি বড় বিপদজনক "খলওয়াত" (নির্জনতা) গণ্য হবে। ননদ ও কাজের মেয়ে থাকলেও, তারা গায়রে মাহরাম ব্যক্তির সাথে আপনার নির্জনতা দূর করতে পারে না, যতক্ষণ না তারা ক্রমাগত আপনার সঙ্গে থাকে এবং দেবরের সাথে আপনার কোনো প্রকার প্রাইভেসি না থাকে। তবে সাধারণত বাসায় সবাই আলাদা কক্ষে থাকে, তাই নির্জনতার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
৩. হানাফি ফিকহের উদ্ধৃতি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে উল্লেখ আছে, "যদি কোনো মাহরাম ব্যক্তি (যেমন পিতা, ভাই) বা স্বামী বাসায় না থাকে, তাহলে গায়রে মাহরাম পুরুষ (যেমন দেবর) কোনো মহিলার সাথে একই বাড়িতে অবস্থান করা বৈধ নয়, যদি না নিরাপত্তা ও পর্দার কঠোর ব্যবস্থা থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৮২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী): তিনি বলেন, "দেবর ও ভাসুরের সাথে একই ঘরে বা বাসায় থাকা জায়েজ আছে কি না? উত্তরে বলেছেন, আদৌ জায়েজ নেই। বরং বাসায় কেউ না থাকলে তাদের সাথে থাকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদীসে দেবরকে 'মৃত্যু' বলার অর্থই হলো তাদের থেকে বেঁচে থাকা কঠিন।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২২, ২২৩)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: বলা হয়েছে, "যদি স্বামী অনুপস্থিত থাকে এবং স্ত্রী তার গায়রে মাহরাম আত্মীয় যেমন দেবর বা চাচাতো ভাইয়ের সাথে একই ঘরে থাকে, তবে তা খলওয়াত (নির্জনতা) গণ্য হবে এবং তা হারাম।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৬/৩৪৫)
৪. আপনার পরিস্থিতির বিশুদ্ধ সমাধান:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ননদ (স্বামীর বোন) মাহরাম, তাই তাঁর সাথে সমস্যা নেই। কাজের মেয়ে নারী তাই তাঁর সাথেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা শুধু দেবরকে নিয়ে।
- ক. উত্তম সমাধান: দেবর যেন এই ২ দিন অন্য কোথাও (যেমন কোনো আত্মীয়ের বাসায়) থাকে। তাহলে কোনো সমস্যা নেই।
- খ. সম্ভাব্য সমাধান: যদি দেবরের থাকা জরুরি হয়, তাহলে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি বাসায় থাকলেও আপনার সাথে একান্তে কোনো অবস্থায় দেখা-সাক্ষাৎ বা নির্জনতায় থাকবেন না। যেমন:
- দেবর সম্পূর্ণ ভিন্ন তলায় বা বাইরের আলাদা রুমে থাকবেন।
- আপনি সব সময় নিজ রুমে পর্দার মধ্যে থাকবেন এবং বের হলে পূর্ণ হিজাব ও পর্দা করবেন।
- ননদ বা কাজের মেয়ে যেন সর্বদা আপনার সাথে থাকে, যাতে কোনো একান্ত মুহূর্ত না হয়।
- গ. যদি পর্দা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়: তবে একেবারেই বাসায় থাকা জায়েজ নয়। বরং আপনি নিজেও আপনার মাহরামের (যেমন বাবার বা ভাইয়ের) বাসায় চলে যেতে পারেন, অথবা শ্বশুর-শাশুড়ীকে ফিরে আসতে বলতে পারেন বা কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন।
৫. গুরুত্বপূর্ণ নসিহত:
শরিয়ত এ বিষয়ে এত কঠোর কারণ হলো, দেবরের সাথে সম্পর্ক খুবই নাজুক। সমাজে অনেক ফিতনা এই সম্পর্ক থেকে হয়। তাই নিজের ঈমান ও ইজ্জত রক্ষার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা জরুরি।
সিদ্ধান্ত: আপনি যদি উপরে উল্লিখিত পর্দার কঠোর ব্যবস্থা (সর্বদা পূর্ণ পর্দা, নির্জনতা এড়ানো, ননদ বা কাজের মেয়ের উপস্থিতি) নিশ্চিত করতে পারেন, তবে বাসায় থাকা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু সাধারণত বাসায় সবাই আলাদা থাকায় এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই উত্তম হলো, এই ২ দিন দেবর অন্য জায়গায় থাকবেন, অথবা আপনি নিজে কোনো নিরাপদ জায়গায় চলে যাবেন। নতুবা শ্বশুর-শাশুড়ী বা স্বামীকে ব্যবস্থা করতে বলুন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। (আমিন)