প্রচলিত ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার কি জায়েয? এবং উক্ত কার্ড ব্যবহারের ফলে প্রাপ্ত অফার গ্রহণ করা কি জায়েয?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
এখন এই কার্ড থাকলে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের অফার পাওয়া যায়। যেমন, এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে নির্দিষ্ট ব্যাংকের নির্দিষ্ট কার্ড থাকলে নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়। আবার বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে একটি অফার চলছে, যেখানে নির্দিষ্ট কার্ড থাকলে "Buy 1 Get 3 Free" সুবিধা পাওয়া যায়।
এখানে আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কার নয়। কার্ডধারী হওয়ার কারণে অফার পাওয়া গেলেও, এর অর্থ এই নয় যে আমরা যে পরিমাণ ছাড় (Discount) পাচ্ছি, সেই সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্ট বা প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করছে। ব্যাংক ও ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার চুক্তির ধরন, অর্থ প্রদানের পদ্ধতি বা এই অফারের প্রকৃত কাঠামো সম্পর্কে আমাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।
এ ধরনের অফার গ্রহণ করা কি জায়েজ হবে?
উল্লেখ্য, ব্যাংক থেকে যে সুদের টাকা আসে, তা সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত খাতে দিয়ে দেওয়া হয়। সেই টাকা আমরা নিজেদের জন্য গ্রহণ বা ব্যবহার করি না।
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো—একটি প্রচলিত (সুদী) ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যে অফার বা ছাড় পাওয়া যায়, তা গ্রহণ করা জায়েজ কি না?
আমরা সালাফি / আহলে হাদীস ফিকহ অনুসারে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং প্রসিদ্ধ আলিমগণের মতামতের ভিত্তিতে উত্তর দেব।
১. সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেনের বিধান
ইসলামে সুদ (রিবা) স্পষ্টভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং রিবা (সুদ) হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি রিবা খায়, যে খাওয়ায়, যে লেখে, যে সাক্ষী থাকে—সবাই লানতপ্রাপ্ত।” (মুসলিম, ১৫৯৮)
সুদের সাথে জড়িত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করা মূলত হারাম, তবে প্রয়োজন (জরুরত) বা কোনো বৈধ বিকল্প না থাকলে সীমিত পরিমাণে জায়েজ হতে পারে। কিন্তু এখানেও সতর্কতা আবশ্যক। আপনার স্বামী যদি সত্যিই কোনো ইসলামিক ব্যাংকের ব্যবস্থা না পেয়ে প্রয়োজনে ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করেন, তবে তা জরুরতের ভিত্তিতে কিছুটা সহনীয় হতে পারে। তবে ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ ও ব্যবহার একটি পৃথক বিষয়।
২. সুদী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বিধান
সুদী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড সাধারণত সুদের চুক্তির ওপর ভিত্তি করে হয়। কার্ডধারী সময়মতো টাকা পরিশোধ না করলে সুদ ধার্য হয়। এমনকি সময়মতো পরিশোধ করলেও চুক্তিতে সুদের শর্ত থাকে। এ কারণে অনেক বড় আলিম এই কার্ড ব্যবহার করা নিষিদ্ধ বলেছেন।
- শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “ক্রেডিট কার্ড যদি সুদের শর্তযুক্ত হয়, তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ১২/১৬৫)
- শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: “সুদী ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করা জায়েজ নয়, কারণ তা রিবার সাথে জড়িত।”
- শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: “ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করা বৈধ নয়, যদি তাতে সুদের শর্ত থাকে।”
অতএব, প্রথমত: এই কার্ড রাখা ও ব্যবহার করাই জায়েজ নয়। যদি ইতিমধ্যে প্রয়োজনে রাখা হয়ে থাকে, তবে তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।
৩. কার্ডের কারণে প্রাপ্ত অফার / ছাড় গ্রহণের বিধান
এখন প্রশ্ন: এই কার্ড থাকার কারণে আপনি যদি কোনো রেস্টুরেন্ট, হোটেল বা এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে বিনামূল্যে খাবার বা “Buy 1 Get 3 Free”-এর মতো অফার পান, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ হবে কি?
এক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিবেচ্য:
(ক) এই অফারটি ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ ব্যাংক তার গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে তৃতীয় পক্ষের (রেস্টুরেন্ট, হোটেল) সাথে চুক্তি করে। ব্যাংক এই অফারের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানকে অর্থ প্রদান করে, যা আসলে সুদের টাকা থেকে আসে। আপনি যদি তা গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি সুদের অর্থের একটি অংশ ভোগ করছেন। অথচ আপনি নিজে সেই সুদের টাকা দান করে দিলেও, এই অফারটি সুদী কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে।
(খ) এতে সুদী ব্যবস্থার সাথে সহযোগিতা হয়। আল্লাহ বলেন: “পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা আল-মায়েদা, ৫:২)
একটি সুদী ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে তার প্রচারিত অফার গ্রহণ করা সেই ব্যাংক ও তার সুদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার নামান্তর।
(গ) ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি সুদী ব্যাংকের সাথে কোনো প্রকার লেনদেন করে, সে রিবার কাজে সহযোগিতা করে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২৯/৩২)
(ঘ) শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন: “সুদী ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো উপহার বা সুবিধা গ্রহণ করা জায়েজ নয়, কারণ তা হারাম সম্পদ থেকে আসে।”
অতএব, এই ধরনের অফার গ্রহণ করা জায়েজ নয়। এমনকি যদি অফারটি সরাসরি ব্যাংক না দিয়ে তৃতীয় প্রতিষ্ঠান দেয়, তবুও তা ব্যাংকের চুক্তির আওতায় আসে এবং সুদী অর্থ দ্বারা পরিচালিত হয়।
৪. ব্যাংকের সুদের টাকা দান করার বিষয়ে
আপনি লিখেছেন: “ব্যাংক থেকে যে সুদের টাকা আসে, তা সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত খাতে দিয়ে দেওয়া হয়।”
এটি প্রশংসনীয় কাজ। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যাংকের অন্যান্য লেনদেন বা সুবিধা হালাল হয়ে গেছে। সুদের টাকা দান করে দিলে আপনার নিজের অংশ পবিত্র হয়, কিন্তু কার্ডের অফার গ্রহণ করা একটি পৃথক বিষয়, যা সুদী ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
৫. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- সুদী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা উচিত নয়। যদি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঋণপত্র (LC) খোলার প্রয়োজন হয় এবং কোনো ইসলামিক ব্যাংক না থাকে, তাহলে সীমিত আকারে তা জরুরতের ভিত্তিতে সহনীয় হতে পারে, তবে কার্ড ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
- এই কার্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত যেকোনো অফার, ডিসকাউন্ট বা বিনামূল্যের সেবা গ্রহণ করা হারাম।
- আপনার স্বামীর উচিত সুদী ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা এবং সম্পূর্ণ ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আসা।
- যে টাকা সুদ থেকে আসে, তা সদকা করে দেওয়া ঠিক, তবে নিজে তা ভোগ না করাই যথেষ্ট নয়; বরং সুদী লেনদেন নিজেই বন্ধ করতে হবে।
কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফতোয়া:
এই ধরনের অফার গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
আল্লাহ তাওফিক দিন।