যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের একাধিক দিন রোজা ভঙ্গ করল,সে কয়টি কাফফারা আদায় করবে?
Siyam-Fasting · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত তিনটি ভিন্ন রমজানের তিনটি কাযা রোজার কাফফারা কীভাবে দিতে হবে, তা নির্ভর করছে সেগুলো কেন কাজা হয়েছে তার ওপর। নিচে সালাফি / আহলেহাদীস ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত জানানো হলো।
১. প্রথমে বুঝতে হবে: কখন কাফফারা ওয়াজিব হয়?
কাফফারা শুধুমাত্র তখনই ওয়াজিব হয় যখন ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের ফরজ রোজা ভঙ্গ করা হয় (খাওয়া-দাওয়া বা যৌনসংসর্গের মাধ্যমে) কোনো বৈধ ওযর ছাড়া।
- যদি আপনি কোনো বৈধ ওযরের কারণে রোজা রাখতে পারেননি (যেমন: অসুস্থতা, সফর, হায়েয-নিফাস), তবে শুধু কাযা (পরে রোজা রাখা) ওয়াজিব; কোনো কাফফারা নেই।
- যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে থাকেন (যেমন: ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা সহবাস করেছেন) তবে সে প্রতিটি রোজার জন্য কাযা + কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব।
আপনার প্রশ্নের মধ্যে ‘কাযা রোজা’ শব্দটি এসেছে, কিন্তু কাফফারা প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তাই স্পষ্ট করুন: আপনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙেছিলেন? নাকি বৈধ ওযরে রোজা ছেড়েছিলেন?
নিচে উভয় অবস্থার উত্তর দেওয়া হলো:
২. যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে থাকেন (প্রতিটি রোজার জন্য পৃথক কাফফারা)
প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা রোজার জন্য একটি করে কাফফারা দিতে হবে। কাফফারার বিধান হলো:
-
পদ্ধতি: একটি রোজার কাফফারা হলো—
(ক) একটি দাস মুক্ত করা। (বর্তমানে সম্ভব নয়)
(খ) একটানা ৬০ দিন রোজা রাখা।
(গ) যদি রোজা রাখতে অক্ষম হন, তাহলে ৬০ জন মিসকিনকে একবেলা পরিতৃপ্ত করে খাওয়ানো (অথবা একজনকে ৬০ দিন খাওয়ানো)। -
তিনটি রোজার জন্য: আপনার যদি তিনটি ভিন্ন রমজানের তিনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা রোজা থাকে, তাহলে প্রতিটি রোজার জন্য আলাদা কাফফারা দিতে হবে। অর্থাৎ:
- প্রথম রোজার কাফফারা: একটানা ৬০ দিন রোজা (অথবা ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো)
- দ্বিতীয় রোজার কাফফারা: আরেকটি একটানা ৬০ দিন রোজা (অথবা আরও ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো)
- তৃতীয় রোজার কাফফারা: আরেকটি একটানা ৬০ দিন রোজা (অথবা আরও ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো)
মোট ১৮০ দিন রোজা রাখতে হবে (প্রতি ৬০ দিন একটানা, এবং এক কাফফারা শেষ করে পরবর্তী কাফফারা শুরু করতে পারেন – তবে সুন্নত হলো যত দ্রুত সম্ভব আদায় করা)।
প্রমাণ:
-
ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রমজানের একদিন রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করল, সে একটি মাস রোজা রাখলেও তা পূরণ হবে না।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫৪)
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ সালাফি উলামা বলেছেন: ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক কাফফারা ওয়াজিব। -
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের একাধিক দিন রোজা ভঙ্গ করল, তার প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা কাফফারা দিতে হবে।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২৫/২৬৫) -
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“যদি কেউ একাধিক দিন রোজা ভঙ্গ করে, তবে প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা কাফফারা ওয়াজিব।”
(শারহুল মুমতি‘, ৬/৪৫০; ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম) -
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
“কাফফারা প্রতিটি ভাঙা রোজার জন্যই নির্ধারিত; একাধিক রোজা এক কাফফারায় আদায় হবে না।”
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান, ৯/১০১)
৩. যদি বৈধ ওযরে রোজা ছেড়ে থাকেন (শুধু কাযা, কোনো কাফফারা নেই)
যদি আপনি অসুস্থতা, সফর, হায়েয-নিফাস ইত্যাদি বৈধ কারণে এ রোজাগুলো ছেড়ে থাকেন, তাহলে শুধু প্রতি রোজার বদলে একটি করে রোজা রাখবেন (কাযা)। কোনো কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
- এক্ষেত্রে প্রতি রোজার জন্য ৬০ দিন রোজা রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু মিসফ রোজা (একটি রোজা) পূরণ করবেন।
প্রমাণ:
- কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ বা সফরে থাকে, সে অন্য দিনে রোজা পূরণ করবে।”
(সূরা বাকারা, ২:১৮৪)
কাযা রোজার নিয়ম:
- কাযা রোজা যেকোনো সময় রাখা যায়, তবে পরবর্তী রমজানের আগে শেষ করা উত্তম।
- একাধিক কাযা রোজা একসাথে বা পৃথক পৃথকভাবে রাখা যায়; কোনো ক্রম বা পরপর রাখার বাধ্যবাধকতা নেই।
৪. কাফফারা দেওয়ার সময় সতর্কতা
- রোজা দিয়ে কাফফারা করলে অবশ্যই ৬০ দিন একটানা রাখতে হবে। মাঝে কোনো ওযর ছাড়া একটি রোজাও ছুটে গেলে আবার নতুন করে ৬০ দিন শুরু করতে হবে।
- খাওয়ানোর পদ্ধতি: ৬০ জন মিসকিনকে একবেলা পেটভরে খাওয়ানো অথবা একজন মিসকিনকে ৬০ দিন খাওয়ানো। খাওয়ানোর পরিবর্তে টাকা দেওয়া (কিছু উলামার মতে) যথেষ্ট নয়, বরং খাদ্য দেওয়াই মূল কর্তব্য। তবে হানাফি ও কিছু সালাফি উলামা টাকা দেওয়াও জায়েজ বলেছেন, কিন্তু সতর্কতা হলো খাদ্য দেয়া।
উপসংহার
- যদি রোজাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা হয়: প্রতিটি রোজার জন্য পৃথক কাফফারা – মোট ৩টি কাফফারা (প্রতিটি ৬০ দিন রোজা বা ৬০ জনকে খাওয়ানো)। ১৮০ দিন রোজা বা ১৮০ জনকে খাওয়ানো ওয়াজিব।
- যদি বৈধ ওযরে ছেড়ে থাকেন: শুধু ৩টি কাযা রোজা রাখবেন, কোনো কাফফারা নেই।
- ‘একটি কাফফারায় সব আদায় হবে’—এ কথাটি ভুল ও ভিত্তিহীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।