কাবিননামা সংক্রান্ত
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
স্ত্রী তিন হায়েজ ইদ্দত পালন করিয়া অন্য পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। আবার স্বামী-স্ত্রী যদি চায় তাহলে উভয়ের সম্মতিক্রমে অন্যের নিকট বিবাহ না বসে পুনরায় পুনরায় তারা নতুন বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় সংসার করার সুযোগ থাকবে।"
১। উপরের এই মাসআালা কি সঠিক??
২। কাবিননামার ১৮/১৯ নং কলামে মেয়ে নিজের উপর শর্ত সাপেক্ষে তালাক নেওয়ার কথা উল্লেখ করাটা উওম হবে কি?? নাকি তালাকের অধিকার সর্ম্পূণ ছেলের উপর রাখা উওম হবে?
Answer
উত্তর: কাবিননামা ও তালাকে বায়েন সম্পর্কিত মাসআলা
প্রশ্ন: ১. এক তালাকে বায়েনের বর্ণনা কি সঠিক? ২. কাবিননামার ১৮/১৯ নং কলামে স্ত্রীর জন্য তালাকের শর্ত উল্লেখ করা উত্তম, না তালাকের অধিকার সম্পূর্ণ স্বামীর উপর রাখা উত্তম?
১. এক তালাকে বায়েনের বর্ণনা — সঠিকতা ও ব্যাখ্যা
প্রশ্নে উল্লেখিত বর্ণনা:
"এক তালাকে বায়েনের অর্থ হলো– তালাক গ্রহণের সাথে সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। স্ত্রী তিন হায়েজ ইদ্দত পালন করিয়া অন্য পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। আবার স্বামী-স্ত্রী যদি চায় তাহলে উভয়ের সম্মতিক্রমে অন্যের নিকট বিবাহ না বসে পুনরায় পুনরায় তারা নতুন বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় সংসার করার সুযোগ থাকবে।"
উত্তর: হ্যাঁ, এটি সম্পূর্ণ সঠিক। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:
- এক তালাকে বায়েন (অর্থাৎ এমন তালাক যা ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার নেই) দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
- স্ত্রীকে অবশ্যই তিন হায়েজ বা তিন মাসের ইদ্দত পালন করতে হবে।
- ইদ্দত শেষে স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ করতে পারে।
- একইভাবে, ইদ্দত শেষে যদি উভয় পক্ষ সম্মত হয়, তবে নতুন মাহর ও বিবাহের চুক্তির মাধ্যমে পুনরায় বিবাহ করা যায় — এর জন্য স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে না (অর্থাৎ হালালার প্রয়োজন নেই)। এটি এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য (তিন তালাক ব্যতীত)।
সূত্র ও রেফারেন্স:
-
রদ্দুল মুহতার (কিতাবুত তালাক):
"والبائن هو الذي لا يملك الزوج فيه الرجعة إلا بعقد جديد"
অর্থাৎ "বায়েন তালাক হলো সেই তালাক যাতে স্বামী ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে না, বরং নতুন বিবাহ ছাড়া স্ত্রী ফিরে আসতে পারে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৪৫) -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
"এক তালাকে বায়েনের পর ইদ্দতের মধ্যে সংশোধন সম্ভব নয়। কিন্তু ইদ্দত শেষে উভয়ে সম্মত হয়ে নতুন বিবাহ করতে পারে। এতে হালালার প্রয়োজন নেই।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫১)
-
বিহিশ্তি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি):
"এক তালাকের পর ইদ্দত শেষে স্ত্রী চাইলে অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ করতে পারে, এবং চাইলে পুরনো স্বামীর সাথে নতুন বিবাহ করতে পারে। এ জন্য অন্য কাউকে বিবাহ করা জরুরি নয়।" (বিহিশ্তি জেওর, ৮ম অধ্যায়)
সুতরাং উল্লেখিত বর্ণনা সম্পূর্ণ সঠিক।
২. কাবিননামার ১৮/১৯ নং কলাম — স্ত্রীর নিজের উপর শর্ত সাপেক্ষে তালাক নেওয়া উত্তম, না স্বামীর হাতে তালাকের অধিকার রাখা উত্তম?
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- উভয়টিই বৈধ এবং ইসলামী শরিয়তের আলোকে দোষণীয় নয়।
- স্বামীর জন্য তালাকের অধিকার রাখা মূল সুন্নত পদ্ধতি — কারণ তালাকের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব স্বামীর ওপর দেওয়া হয়েছে (সূরা তালাক, ৬৫:১)।
- তবে স্ত্রী যদি মনে করে যে স্বামী তালাক দিতে দেরি করবে বা জুলুম করবে, তাহলে স্ত্রী নিজের জন্য তালাকের শর্ত (তাফউয়িদ) রাখা উত্তম।
- এটি উত্তম (আফজাল) কী, তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর — অর্থাৎ যদি সম্পর্কের মধ্যে অবিচারের আশঙ্কা থাকে, তবে স্ত্রীর শর্ত রাখা ভাল; অন্যথায় মূল রীতি অনুসরণ করাই যথেষ্ট।
ফিকহী দলিল ও ব্যাখ্যা:
-
তালাকের অধিকার মূলত স্বামীর — কুরআনে বলা হয়েছে:
"الطلاق مرتان ..." (সূরা বাকারা, ২:২২৯) অর্থাৎ "তালাক দুই বার পর্যন্ত (যা ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব)..."
এখানে তালাকের কর্তৃত্ব স্বামীর হাতে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "তালাক দেওয়ার মালিক স্বামীই, তবে স্ত্রীকে শর্তের মাধ্যমে এ অধিকার দেওয়া জায়েজ।" (আল-হিদায়া, ২/৩৬০) -
স্ত্রীর জন্য তালাকের অধিকার শর্ত করা (তাফউয়িদ) — হানাফি ফিকহে বৈধ এবং প্রমাণিত:
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে স্ত্রীদের জন্য শর্ত রাখার অনুমতি ছিল। (বুখারি, ২৭২৭)
- সাড়ে সাতশ হিজরি: ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন: "যদি স্ত্রী বিবাহের সময় শর্ত করে নেয় যে, 'আমি নিজেকে তালাক দিতে পারি', তবে তা জায়েজ এবং তা তালাক গণ্য হবে।" (আল-মাবসুত, ৬/১৩০)
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুত তালাক, বাবুত তাফউয়িদ): "স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া জায়েজ।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৩২১)
-
কাবিননামার ১৮/১৯ নং কলামে স্ত্রী শর্ত সাপেক্ষে তালাক নেওয়ার কথা উল্লেখ করাটা — হানাফি মতে এটি জায়েজ, তবে উত্তম (মুস্তাহাব) বলা যাবে না।
- কারণ নবী করীম (সা.) বলেছেন: "আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল জিনিস হলো তালাক।" (আবু দাউদ, ২১৭৮)
- তাই তালাকের পথ সহজ করা অপছন্দনীয়, কিন্তু প্রয়োজনে বৈধ।
- স্ত্রীর জন্য উত্তম হলো যে তিনি স্বামীর ন্যায়বিচারের ওপর ভরসা রাখবেন এবং শর্ত না নিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করবেন — যদি স্বামী ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ হন।
- স্বামীর জন্য উত্তম হলো তালাকের অধিকার নিজের কাছে রাখা এবং আল্লাহর ভয়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা।
সারমর্ম:
| অবস্থা | করণীয় | |--------|--------| | স্বামী ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ ও স্ত্রীর প্রতি সতর্ক | তালাকের অধিকার স্বামীর হাতে রাখাই উত্তম | | স্বামী জুলুমকারী, স্ত্রীর ওপর অত্যাচার করে | স্ত্রীর জন্য শর্তারোপ করে তালাকের অধিকার নেওয়া জরুরি (প্রয়োজনের কারণে ওয়াজিব পর্যায়ের) | | কোনোরূপ সন্দেহ না থাকলে | স্বাভাবিক নিয়ম (স্বামীর হাতে তালাক) অনুসরণ করাই ভাল |
সাবধানতা:
তালাকের শর্ত দেওয়ার সময় স্ত্রীকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার সংকল্প কেবল আইনগত সুরক্ষা নেওয়া, কোনো খারাপ মনোভাব নয়। আর স্বামীকে বুঝতে হবে যে এই শর্ত স্ত্রীর অধিকারকেই সুরক্ষিত করে, তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে না।