ফরজ গোসলে নাকের নরম অংশে পানি পৌঁছানো জরুরি কি না? ঝাঁঝালো ভাব না এলেও কি গোসল হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। ফরজ গোসলের ক্ষেত্রে নাকে পানি দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি ও সন্দেহ দূর করার উপায় নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন। হানাফি মাজহাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
ফরজ গোসলের ফরজ (অবশ্যকীয় কাজ)
হানাফি মাজহাব অনুসারে ফরজ গোসলের তিনটি ফরজ কাজ রয়েছে:
- কুলি করা (মাদমাদা): অর্থাৎ মুখের ভেতরে ভালোভাবে পানি পৌঁছানো এবং কুলি করা। এটি ফরজ। (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৮)
- নাকে পানি দেওয়া (ইস্তিনশাক): অর্থাৎ নাকের ভেতরে পানি পৌঁছানো।
- সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো: চুলের গোড়া থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত কোনো স্থান শুকনা না রাখা।
নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরজ ও সুন্নত অংশ
নাকের গঠন অনুযায়ী এর ভেতর দুটি অংশ আছে:
- নাকের নরম অংশ (لين الأنف / Lain al-Anf): এটি নাকের সামনের দিকের নরম তরুণাস্থি (Cartilage) পর্যন্ত অংশ। এই অংশ পর্যন্ত পানি পৌঁছানো ফরজ। এর চেয়ে উপরের শক্ত হাড়ের অংশ (নাকের সেতু বা গোড়া) পর্যন্ত পানি পৌঁছানো সুন্নত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪; বাদায়েউস সানায়ে, ১/৩৪; রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৮)
সুতরাং, আপনি যদি শুধু নাকের ডগায় পানি দিয়ে থাকেন এবং নাকের নরম অংশ (প্রায় নাকের ডগার ভেতরের দিকের অংশ) পর্যন্ত পানি না পৌঁছায়, তাহলে আপনার গোসল ফরজ আদায় হবে না। কিন্তু আপনি যদি পানি টেনে নেন (ইস্তিনশাক করেন) যার কারণে নরম অংশের ভেতর পানি পৌঁছে যায়, তাহলে তা যথেষ্ট হবে। ঝাঁঝালো ভাব না আসলেও চলবে।
আপনার সন্দেহ ও 'ঝাঁঝালো ভাব' নিয়ে সমাধান
আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন যে, আপনি বারবার কাজটি করেন কিন্তু ঝাঁঝালো ভাব না হওয়ায় সন্দেহ থেকে যায়।
ইসলামে 'ওয়াসওয়াসা' (সন্দেহপ্রবণতা) বা অতিরিক্ত সন্দেহ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যখন কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা শক্তিশালী হয়, তখন তাকে সন্দেহ করা (যে হয়তো পানি পৌঁছায়নি) শয়তানের কুমন্ত্রণা। (সূরা আন-নাস, ১১৪:৪-৫)
ঝাঁঝালো ভাব আসা জরুরি নয়। ঝাঁঝালো ভাব নির্ভর করে নাকের ভেতরের স্নায়ুর অনুভূতি, পানি শুষে নেওয়ার তীব্রতা এবং পানির তাপমাত্রা ইত্যাদির ওপর। এটি ফরজ আদায়ের শর্ত নয়। ফরজ হচ্ছে শুধু নরম অংশে পানি পৌঁছানো।
আপনি যদি পানি একবার বা দুইবার টেনে নেন এবং মনে করেন পানি ভেতরে পৌঁছেছে, তাহলে আর বারবার করা জরুরি নয়। বারবার করলে ওয়াসওয়াসা বাড়ে।
কিভাবে সহজে ও নিশ্চিতভাবে নাকে পানি দেবেন? (ঝাঁঝালো ভাব ছাড়াই)
আপনার ঝাঁঝালো ভাব না আসার কারণ হতে পারে আপনি খুব বেশি জোরে পানি টানছেন না, অথবা আপনার নাকের ভেতর শুষ্কতাবোধ কম। নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
- পানির পাত্র: গোসলের সময় একটি ছোট মগ বা বোতল ব্যবহার করতে পারেন। অথবা কল থেকে সরাসরি পানি নিতে পারেন।
- পানি নেওয়ার কায়দা: ডান হাতে পানি নিয়ে নাকের সাথে লাগান। এবার স্বাভাবিক গতিতে, খুব জোরে নয়, বরং মৃদু ভাবে পানি ভেতরে টানুন। যেন পানি নাকের নরম অংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
- বাম নাক: একইভাবে বাম হাতে পানি নিয়ে বাম নাকে দিন এবং মৃদু টানুন।
- প্রমাণ: পানি ভেতরে পৌঁছানোর পর আপনি একটি 'ভেজা' অনুভূতি বা 'ঠান্ডা সংবেদন' পাবেন ভেতরের দিকে। এটি নিশ্চিত যে পানি পৌঁছেছে। আপনার যদি মনে হয় ভেতরে পানি পৌঁছায়নি, তাহলে একবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার করার পরও যদি মনে হয় পৌঁছায়নি, কিন্তু নিশ্চিতভাবে পানি নাকে গেছে, তাহলে আর সন্দেহ করবেন না।
- আঙুলের সাহায্য: খুব শুষ্ক নাকের ক্ষেত্রে, কখনো কখনো পানি সহজে ভেতরে যায় না। সেক্ষেত্রে পানি টেনে নেওয়ার পর, ভিজা আঙুল দিয়ে নাকের ভেতরের নরম অংশ (সামনের দিকের অংশ) মুছে নেওয়াও যথেষ্ট হবে। এটিকে 'ইসতিনশার' বলে। এটি সুন্নত। (শরহুল মুয়াত্তা লি মাহমুদ হাসান)
সারসংক্ষেপ:
- ফরজ: নাকের নরম অংশ (সামনের নরম হাড় পর্যন্ত) পানি পৌঁছানো ফরজ।
- ঝাঁঝালো ভাব: এটি জরুরি নয়। পানি পৌঁছানোই মূল উদ্দেশ্য।
- পদ্ধতি: মৃদু ভাবে পানি টেনে নিন, যেন নাকের ভেতরের সামনের অংশ ভিজে যায়। অতিরিক্ত জোর বা বারবার টানার প্রয়োজন নেই।
- সন্দেহ দূরীকরণ: আপনি যখন স্বাভাবিকভাবে নাকে পানি দিচ্ছেন, তখন ধরে নিন পানি পৌঁছেছে। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে "আউযুবিল্লাহ" পড়ে সন্দেহ ত্যাগ করুন। (বাহিশ্তি জেওর, গোসলের মাসয়ালা)
আপনার জন্য সহজ পদ্ধতি হলো: গোসলের সময় একবার ডান নাকে আর একবার বাম নাকে পানি দিয়ে মৃদু টানুন। এরপর যদি মনে হয় পানি ভেতরে পৌঁছায়নি, একবার পুনরাবৃত্তি করুন। এরপর আর সন্দেহ করবেন না। নিশ্চিন্তে গোসল সম্পন্ন করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহজ পদ্ধতি বুঝার ও আমল করার তাওফিক দিন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন শামি): ১/২৪১, ১/১৫৮
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি): ১/৪
- বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানি): ১/৩৪
- বাহিশ্তি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি): গোসলের মাসায়েল
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ১/২৪২