স্ত্রীর নিজস্ব হালাল সঞ্চয় খরচ করার পর স্বামী যদি সুদমিশ্রিত টাকা ফেরত দেয়, তা কি স্ত্রীর জন্য হালাল?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নে উল্লিখিত পরিস্থিতিতে স্ত্রী তার নিজস্ব হালাল সঞ্চয় থেকে স্বামীর চিকিৎসার জন্য খরচ করেছেন। পরবর্তীতে স্বামী তাকে সেই টাকা ফেরত দিয়েছেন, যা তার ব্যাংক থেকে উত্তোলিত সুদ মিশ্রিত টাকা। এখন এই ফেরত দেওয়া টাকা স্ত্রীর জন্য হালাল হবে কি না এবং তা সংসারে খরচ করা যাবে কি না, সে বিষয়ে হানাফি মাজহাবের বিধান নিম্নরূপ—
উত্তর: স্বামীর ফেরত দেওয়া টাকা স্ত্রীর জন্য হালাল
স্বামীর ফেরত দেওয়া টাকা স্ত্রীর জন্য হালাল বিবেচিত হবে। কারণ এটি স্ত্রীর প্রাপ্য ঋণ (কর্জ) পরিশোধ হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের জন্য দেনাদার (স্বামী) যে কোনো বৈধ বা অবৈধ উৎস থেকে টাকা দিলেও তা গ্রহীতার (স্ত্রীর) জন্য হালাল হয়, যদি না সে জানে যে এটি নির্দিষ্টভাবে হারাম লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত। তবে এখানে স্বামী নিজেই তার ব্যাংক থেকে উত্তোলিত সুদমিশ্রিত টাকা দিচ্ছেন, যা স্ত্রী জানে যে সুদ মিশ্রিত। কিন্তু স্ত্রীর জন্য এটি গ্রহণ করা জায়েজ, কারণ এটি তার প্রাপ্য হক (ঋণ) আদায়।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি
হানাফি ফিকহে একটি মূলনীতি হলো:
إذا دفع الحرام إلى غيره بعنوان القضاء أو الأجرة جاز للآخذ "যদি কেউ হারাম মাল অন্যকে কর্জ পরিশোধ বা মজুরি হিসেবে দেয়, তবে গ্রহীতার জন্য তা গ্রহণ করা জায়েজ।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৩৫)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি সুদ বা অন্য হারাম উপার্জন করে, তবে তার ঋণ পরিশোধ বা পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর জন্য তা হালাল হয়, কারণ গ্রহীতা তার প্রাপ্য হক আদায় করছে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)
প্রাসঙ্গিক দিকনির্দেশনা
১. স্ত্রীর করণীয়: স্ত্রী এই টাকা নিতে পারেন এবং তা নিজের প্রয়োজনে বা সংসারে খরচ করতে পারেন। এটি তার জন্য হালাল। তবে উত্তম হলো, তিনি স্বামীকে বুঝাবেন যে সুদ হারাম এবং তিনি যেন ভবিষ্যতে সুদমুক্ত জীবনযাপন করেন।
২. স্বামীর করণীয়: স্বামী ব্যাংক থেকে সুদ গ্রহণ করে হারাম কাজ করেছেন। তার ওপর ওয়াজিব হলো:
- তওবা করা এবং ভবিষ্যতে সুদ থেকে বিরত থাকা।
- ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সুদের টাকা যতটুকু চিহ্নিত করতে পারেন, তা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব-মিসকিনকে সাদকা করে দেওয়া। তবে স্ত্রীকে দেওয়া টাকার মধ্যে সুদের অংশ থাকলে সেটিও বিবেচনায় আনতে হবে; কিন্তু স্ত্রী যেহেতু ঋণ পরিশোধ পেয়েছেন, তাই তার দায়িত্ব নেই।
সংসারে খরচ করা যাবে?
হ্যাঁ, এই টাকা সংসারে খরচ করা যাবে। কারণ এটি স্ত্রীর বৈধ সম্পত্তি। তিনি চাইলে নিজের জন্য ব্যয় করতে পারেন, সংসারে দিতে পারেন বা স্বামীর অনুমতি নিয়ে যেকোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন।
সতর্কতা
যদি স্ত্রী নিশ্চিত হন যে স্বামীর দেওয়া টাকা পুরোটাই সুদ থেকে আসা (অর্থাৎ তার কোনো হালাল আয় নেই), তাহলে এ টাকা নেওয়া মাকরূহ হতে পারে। তবে সাধারণত ব্যাংক থেকে উত্তোলিত টাকা সম্পূর্ণ সুদ হয় না; বরং তা সুদ ও মূলধনের মিশ্রণ। তাই ফিকহের দৃষ্টিতে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তা গ্রহণ জায়েজ।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ থেকে দলিল
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৬/৩৮৫ (কিতাবুল বুয়ূ’, বাবুর রিবা)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী): ২/৩৩৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): ৫/২২৪
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা থানভী): অংশ ৮, সুদ ও লেনদেন অধ্যায়
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিদায়া): ৪/১৫০ (বাবুর রিবা)
উপসংহার
স্বামীর ফেরত দেওয়া টাকা স্ত্রীর জন্য হালাল। তিনি তা গ্রহণ করে সংসারে খরচ করতে পারেন। তবে স্বামীকে সুদ থেকে তওবা করতে হবে এবং সুদের অংশ গরিব মিসকিনদের মাঝে ছওয়াবের নিয়ত ছাড়া সাদকা করে দিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন।