বিয়েতে ছেলের জন্য অপেক্ষা করা প্রসঙ্গে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
উস্তাদ এক বোন জানতে চাইছেন উনার বিয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ছেলে দেখা চলছে কিন্ত দ্বীনদার পাওয়া যাচ্ছে না।এখন এক জায়গা থেকে আলাপ আসছে আলহামদুলিল্লাহ ছেলে ও ছেলের পরিবার রাজি মেয়েকে পর্দার সহিত রাখতে।হঠাৎ ছেলের মা খুব অসুস্ত হয়ে পড়েন এখন ছেলে উনার মাকে নিয়ে ১মাস যাবৎ হাসপাতালে আছেন।উনারা খুব চাইছেন আল্লাহ তায়ালা সুস্ততা দান করলেই উনারা ইং শা আল্লাহ এসে বিয়ে করিয়ে নিবেন।
এখন প্রশ্ন হলো মেয়ের বাড়ীর কি করা দরকার অপেক্ষা নাকি অন্য জায়গায় ছেলে দেখা?
মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না অনেক বয়স হয়ে যাচ্ছে।তাই চিন্তায় আছেন পরিবার আত্মীয়স্মজনদের কথা শুনতে হয়।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার বোনের বিয়ের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছে এবং দ্বীনদার পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না, এটি সত্যিই চিন্তার বিষয়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এখন একটি পাত্র এসেছে যে দ্বীনদার এবং পর্দার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তার মা অসুস্থ হওয়ায় বিয়ে আপাতত বন্ধ আছে। এখন আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ উত্তর দেওয়া হলো:
১. অপেক্ষা করা উচিত নাকি অন্য জায়গায় পাত্র দেখা?
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিত্বকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ" "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার চরিত্র ও দ্বীন তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হবে।" (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৪; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস: ১৯৬৭)
এখন এই পাত্র দ্বীনদার এবং পর্দার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে—যা একটি বড় সুযোগ। তার মায়ের অসুস্থতা একটি বৈধ ওজর (অজুহাত)। তাই এই পাত্রের জন্য অপেক্ষা করা উচিত এবং অন্য জায়গায় পাত্র দেখা থেকে বিরত থাকা ভালো। কারণ অন্য পাত্র খোঁজা মানে এই ভালো সুযোগটি হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অপেক্ষার সময়টি যদি অনেক দীর্ঘ হয়ে যায় (যেমন আরও কয়েক মাস বা বছর), তাহলে পরিবার অন্যান্য ভালো জায়গায়ও দেখা চালিয়ে যেতে পারে, তবে বর্তমান পাত্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে।
২. মেয়ের বয়স বাড়ার চিন্তা কীভাবে মোকাবেলা করবেন?
বিয়েতে বয়স বাড়া নিয়ে চিন্তিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ইসলামে বয়সের কারণে তাড়াহুড়ো করে কোনো অযোগ্য পাত্র গ্রহণ করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ" "দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদের ও তোমাদের রিযক দেই।" (সূরা আল-আনআম, ৬:১৫১)
এই আয়াত থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, ভবিষ্যতের চিন্তা করে ইসলামে নাজায়েয কাজ করা উচিত নয়। দ্বীনদার পাত্রের জন্য অপেক্ষা করা উত্তম, কারণ দ্বীনদার স্বামীই স্ত্রীকে দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী করতে পারে। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
"الْأَوْلَى فِي النِّكَاحِ أَنْ يُزَوِّجَ بِنْتَهُ لِدَيِّنٍ وَخُلُقٍ حَسَنٍ" "বিয়েতে উত্তম হলো কন্যার জন্য দ্বীন ও সচ্চরিত্রের অধিকারী পাত্র গ্রহণ করা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৮)
৩. আত্মীয়-স্বজনের চাপ কীভাবে সামলাবেন?
আত্মীয়-স্বজনের কথা শুনতে হয়, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত পিতামাতার বা অভিভাবকের। তাদের উচিত ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ" "যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।" (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ২৫১৬)
পরামর্শ:
- বর্তমান পাত্রের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখুন এবং তার মায়ের আরোগ্যের জন্য দোয়া করুন।
- অপেক্ষার সময়টি ইস্তিখারা (নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত চাওয়া) ও দোয়ার মাধ্যমে কাটান।
- যদি অপেক্ষা অনেক দিন হয়, তবে অন্য ভালো দ্বীনদার পাত্রের খোঁজ চালিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু বর্তমান পাত্রের সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন না।
উপসংহার: এই পাত্রটি দ্বীনদার এবং পর্দার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তাই তার জন্য অপেক্ষা করা উত্তম। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবেন।
উল্লেখযোগ্য হানাফি কিতাবসমূহ:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী), ১/২৬২
- রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৮
- বাহিশ্তি জেওয়ার, বিয়ের অধ্যায়
আল্লাহ তাআলা আপনার বোনের জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন এবং ধৈর্যের প্রতিদান দিন। (আমীন)