স্বামী যদি রাগের মাথায় স্ত্রীকে “তুমি চলে যাও”, “ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করো” বলে, তাহলে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর প্রদানে:
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনার আলোকে আমরা নিম্নোক্ত ফাতাওয়া প্রদান করছি। দয়া করে পুরো উত্তর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বামী কর্তৃক উচ্চারিত “তুমি চলে যাও”, “চলে গেলে সুখে থাকবে”, “তুমি চলে গেলে আমি সত্যিই খুশি হবো”, “এবার ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করো” এবং স্ত্রীর “সত্যি চলে যাবো” বলার পর স্বামীর “হ্যা চলে যাও” / “হ্যা যাও” বলা—এই সকল বাক্যের কারণে এক তালাকে রাজ‘ঈ (প্রত্যাহারযোগ্য তালাক) পতিত হয়েছে। তালাকটি বায়িন (চূড়ান্ত) নয়, বরং রাজ‘ঈ। অর্থাৎ ইদ্দতের (তিন হায়েয) মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পুনর্মিলিত হতে পারবেন এবং পুনরায় স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক স্থাপন করলে কোনো নতুন নিকাহের প্রয়োজন নেই। ইদ্দত অতিক্রান্ত হলে পুনরায় বিয়ে করতে হবে নতুন মোহর ও সাক্ষীর মাধ্যমে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল:
১. “চলে যাও” এর মতো শব্দ তালাকের কিনায়া (অস্পষ্ট) শব্দ।
হানাফি ফিকাহ অনুসারে, যখন স্বামী স্ত্রীকে “তুমি চলে যাও”, “তোমার বাবার বাড়ি যাও”, “আমার কাছ থেকে দূর হও” ইত্যাদি বলে এবং সে সময় ঝগড়া বা রাগের অবস্থা থাকে, আর সেই সাথে “ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করো” (অর্থাৎ অন্যত্র বিয়ে) বলে ফেলে, তখন তা তালাকের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯৬; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২১; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৯০)
২. স্বামীর ইনকার ও পরবর্তী ব্যাখ্যা গ্রাহ্য হবে কি?
স্বামী পরবর্তীতে বলেছেন, “বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছি” এবং “কিছুই হয়নি”। কিন্তু হানাফি ফিকাহে কিনায়া শব্দের ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়তই মূল। যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে, তাহলে তালাক পতিত হয় না (ইমাম আবু হানিফার মতে)। তবে যখন কথার প্রেক্ষাপট তালাকের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে (যেমন “ভালো ছেলে দেখে বিয়ে করো”), তখন স্বামীর ইনকার আমলে আনা হয় না–এটাই অধিকাংশ হানাফি মুফতির ফাতাওয়া। বিশেষ করে যখন স্ত্রী বলে “সত্যি চলে যাবো” এবং স্বামী বারবার বলে “হ্যা যাও”, তখন বুঝা যায় স্বামী তালাক দেওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ করেছেন।
(সূত্র: আল-হিদায়া, ২/৩১৬; শারহু মা‘আনি’ল আছার, ৩/৯৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৯৪)
৩. কয়টি তালাক পতিত হয়েছে?
একই মজলিসে (একই সময়ে) বারবার “যাও” বলা এবং স্ত্রীর প্রত্যুত্তরে “হ্যা যাও” বলা—এগুলো একটি তালাক হিসেবেই গণ্য হবে, যতক্ষণ না স্বামী স্পষ্টভাবে সংখ্যা উল্লেখ করে। তাই এক তালাকে রাজ‘ঈ হয়েছে।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৩০২; ফাতাওয়া দারুল উলূম, ২/২৭৫)
৪. সম্পর্ক কি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে?
না, পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। রাজ‘ঈ তালাকের কারণে ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন পবিত্রতা) পর্যন্ত স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন চুক্তি বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে। ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রী যদি স্বামীর নিকটে ফিরে আসে বা স্বামী তাকে ফিরিয়ে নেয় (মৌখিকভাবে বা সংসার চালিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে), তাহলে বিবাহ বহাল থাকে।
ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে গেলে শুধুমাত্র নতুন নিকাহের মাধ্যমে পুনরায় বিবাহ বৈধ হবে।
৫. বর্তমান অবস্থায় স্ত্রী কী করবেন?
- যদি ঘটনার পর ইদ্দত (তিন পিরিয়ড) অতিক্রান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে স্বামী চাইলে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কোন নতুন বিয়ের প্রয়োজন নেই, শুধু দু-জন সম্মত হয়েই সংসার চালাতে পারেন।
- যদি ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে পুনরায় বিয়ে করতে হবে সাক্ষী ও মোহরসহ।
- দয়া করে একজন স্থানীয় মুফতি বা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের নিকট গিয়ে বাস্তব সময়সীমা ও অবস্থা জানিয়ে ফাতাওয়া নিন।
৬. জিনার গুনাহ হবে কিনা?
ইদ্দতের ভেতর স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তাদের মধ্যে সহবাস বৈধ এবং জিনা হবে না। ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর যদি নতুন বিয়ে না করে বা ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে না নিয়ে সহবাস করেন, তাহলে তা জিনা (হারাম) হবে। বর্তমানে আপনি যদি সংসার চালিয়ে যেতে চান, তাহলে উপরে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী তালাকের বিষয়টি সমাধান করে নিন।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
এই ফাতাওয়া কেবল বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে স্বামীর প্রকৃত নিয়ত, সময়-স্থান ও অন্যান্য বিবরণ জানা জরুরি। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতির শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সংসারে শান্তি ও কল্যাণ দান করুন। আমীন।