স্ত্রী নিজে থেকে “তালাক হয়ে গেছে” বললে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
মানে উনি আমাকে তালাক দিতে চান না।
তখন আমি হয়ত বলেছি, তাহলে আমি তালাক দিব।উনি রেগে বলেছেন, তুমি পারলে তালাক দাও।আমি দিব না। তারপর আমি খুব রেগে বলেছি, আমার দিক থেকে তালাক হয়ে গেছে। সম্ভবত ২বার বলেছি।
কিন্তু এই ঘটনার কিছুদিন আগেই আমার স্বামী আমাকে স্পষ্টভাবে তালাকের অধিকার দেন। ওই শর্তগুলোর সাথে আমার তালাক দেওয়ার মিল নাই।
এখন কি তালাক হয়ে গেছে?
আমার এই ঘটনাটি আজকে মনে পড়েছে। পুরোপুরি মনে নেই। ভুলে গেছি। মনে হচ্ছে, এমন ঘটনা ঘটেছিল তাই প্রশ্নটি করেছি। আমি সন্দিহান এই ঘটনায়।
হুজুর,, আমার যত প্রশ্ন ছিল, আমি আপনাদের জিজ্ঞাসা করেছি। উত্তরও পেয়েছি। কিন্তু আমার মনে ভয় হতে থাকে যে, আমার স্বামীর সাথে আমার সম্পর্ক হালাল আছে কি না।
আগে আমাদের মধ্যে অনেক ঝগড়া হত। রাগে অনেক কথা আমরা বলে ফেলছি।। এখন সেগুলো আমরা উভয়ই ভুলে গেছি। ওই কথাগুলো দ্বারা তালাক হবে কি না? আমার মনে খুব সন্দেহ হ্য় এইসব নিয়ে। কিন্তু উনি আমাকে কখনো তালাক দিতে চাননি।
আমি দিন দিন হতাশ হয়ে যাচ্ছি। ইবাদতে মনোযোগ হারাচ্ছি। প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে নতুন নতুন প্রশ্ন জাগছে। তালাক হলো কি না।।এই চিন্তায় আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমার কি করনীয়?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী আপনাকে তালাক দেওয়ার অধিকার (তাফবীযে তালাক) দিয়েছিলেন, তবে তা নির্দিষ্ট শর্তের সাথে। যেহেতু সেই শর্তগুলি পূরণ হয়নি, তাই সেই অধিকার কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে ঝগড়ার সময় আপনি নিজে থেকে “আমার দিক থেকে তালাক হয়ে গেছে” বলেছেন। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, স্ত্রী নিজে থেকে তালাক দিতে পারে না, যদি না স্বামী তাকে স্পষ্টভাবে এ অধিকার দিয়ে থাকে (ও তা নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্তের অধীনে)। আপনি যেভাবে বলেছেন, তাতে আপনার পক্ষ থেকে তালাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনার স্বামীও কোনো তালাক দেননি, বরং তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “আমি তালাক দেব না” এবং “তুমি পারলে দাও” — এটি তাফবীয (অধিকার অর্পণ) নয়; এটি রাগের বশে একটি প্রতিক্রিয়া মাত্র।
সুতরাং আপনার বর্ণিত ঘটনার দ্বারা কোনো তালাক হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ ও হালাল রয়েছে।
নিচে বিস্তারিত দলীল ও করণীয় উল্লেখ করা হলো:
১. স্ত্রীর নিজে থেকে তালাক দেওয়ার বিধান
ইসলামী শরীয়তে তালাক দেওয়ার অধিকার মূলত স্বামীর। স্ত্রী যদি নিজে থেকে বলে, “আমি তালাক দিলাম” বা “আমার দিক থেকে তালাক হল”, তাহলে তা তালাক গণ্য হবে না, যতক্ষণ না স্বামী তাকে স্পষ্টভাবে এ অধিকার অর্পণ করে থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩১; ফতোয়া আলমগীরী, ১/৩৭৪)
আপনার স্বামী আপনাকে আগে তালাকের অধিকার দিয়েছিলেন, কিন্তু আপনি লিখেছেন, “ওই শর্তগুলোর সাথে আমার তালাক দেওয়ার মিল নাই” — অর্থাৎ সেই অধিকার শর্তযুক্ত ছিল এবং আপনি সেই শর্ত পূরণ না করেই তালাক দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই তা কার্যকর হয়নি।
২. “তুমি পারলে তালাক দাও” — এর অর্থ
স্বামীর এই কথাটি তাফবীযে তালাক (অধিকার অর্পণ) হিসেবে গণ্য হয় না, কারণ এটি ক্রোধের উত্তাপে বলা হয়েছে এবং এতে দৃঢ় ইচ্ছা বা স্পষ্ট অর্পণ নেই। হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে এসেছে, “যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে, ‘তুমি পারলে তালাক দাও,’ এবং স্ত্রী তালাক দেয়, তাহলে তালাক কার্যকর হবে না, যতক্ষণ না স্বামীর নিয়তে তাফবীয থাকে।” (ফতোয়া উসমানী, ৩/২২৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩২৭)
আপনার স্বামী স্পষ্ট বলেছেন, “আমি দিব না” — তাই তাফবীয হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
৩. “আমার দিক থেকে তালাক হয়ে গেছে” — এর বিধান
এটি একটি সংবাদ বা ঘোষণা মাত্র। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বাক্য প্রয়োগ অপরিহার্য। যেহেতু আপনি নিজে থেকে তালাক দেওয়ার অধিকার রাখেন না, তাই আপনার এই কথার দ্বারা কোনো তালাক হয়নি। (শরহু মা‘আনিল আসার, ৩/২; আল-হিদায়া, ২/২৮৫)
৪. পূর্বের ঝগড়ায় বলা কথা
আপনারা উভয়েই পূর্বের ঝগড়ার কথা ভুলে গেছেন এবং স্বামী কখনো তালাক দিতে চাননি। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামী স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ না বলেন (যেমন: “তালাক”, “ছাড়”, “বিয়ান” ইত্যাদি), ততক্ষণ তা তালাক গণ্য হবে না। অশ্লীল বা রাগারাগির কথা দ্বারা সাধারণত তালাক হয় না। (বেহেশতী জেওর, ৭ম বর্ষ, তালাক অধ্যায়)
৫. আপনার করণীয়
- আপনার বিবাহ বৈধ ও হালাল। এতে কোনো সন্দেহ নেই। শয়তান আপনাকে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। আপনি দিন দিন হতাশ ও ইবাদতে অমনোযোগী হচ্ছেন — এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। আপনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করুন যে কোনো তালাক হয়নি।
- মনে সন্দেহ এলে ‘আউযু বিল্লাহ’ পড়ুন এবং এ চিন্তা ত্যাগ করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “শয়তান আমার উম্মতের অন্তরে এমন সন্দেহ সৃষ্টি করে যে, তারা বলে, ‘অমুক কাজ কীভাবে হলো?’ যখন তোমাদের এমন সন্দেহ হয়, তখন তোমরা ‘আমান্তু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি’ (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি) বলে তা দূর কর।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩৪)
- তালাক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে দাম্পত্য জীবন সুন্দর করার চেষ্টা করুন। আপনার স্বামী তালাক দিতে চান না, বরং তিনি ইসলামী পদ্ধতিতে তালাক দেওয়ার কথা বলেছেন (একসাথে তিন তালাক না দিয়ে), কিন্তু তিনি তা প্রয়োগ করতে চান না। এ থেকে বোঝা যায়, তিনি আপনার সাথে থাকতে চান।
- প্রয়োজনে একজন আলেমের সাথে সরাসরি দেখা করুন এবং আপনার মানসিক অবস্থার কথা খুলে বলুন। তারা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দোয়া ও পরামর্শ দিতে পারবেন।
সারসংক্ষেপ
| ঘটনা | শরয়ী রায় | |------|------------| | স্ত্রী তালাক চাওয়া | তালাক হয়নি | | স্ত্রী নিজে “তালাক দিলাম” বলা | তালাক হয়নি (যেহেতু অধিকার ছিল না) | | স্বামী “তুমি পারলে দাও” বলা | তাফবীয নয়, তালাক হয়নি | | পূর্বের ঝগড়ায় বলা কথা | স্মৃতিতে না থাকলে এবং স্বামী অস্বীকার করলে তালাক হয়নি | | স্বামী তালাক দিতে চান না | বিবাহ বহাল ও হালাল |
সুতরাং আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনার বিবাহ বৈধ ও হালাল।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও প্রশান্তি দান করুন। আপনার ইবাদতে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন এবং সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকুন। (আমিন)