মিশনারি এনজিওতে চাকরি করে এমন কাউকে বিয়ে করা যাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
উত্তর:
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক বন্ধন। বিয়ের জন্য পাত্র/পাত্রী নির্বাচনে দ্বীনদারি ও হালাল উপার্জনকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি খৃিষ্টান মিশনারি এনজিওতে চাকরি করছেন, তাই এ বিষয়ে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা দরকার।
১. খৃিষ্টান মিশনারি এনজিওতে চাকরির হুকুম
-
মিশনারি এনজিওগুলি সাধারণত ধর্মপ্রসার (Evangelism) ও খৃিষ্টান ধর্মের প্রচারকে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়ে কাজ করে। যদি কোনো ব্যক্তি এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন যেখানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইসলামী আকীদার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে সহায়তা হয় (যেমন: গির্জা পরিচালনা, খৃিষ্টান ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান, ধর্মান্তরের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ), তাহলে তা হারাম এবং গুনাহের কাজ। কারণ মহান আল্লাহ বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদাহ: ২) -
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফী ফকীহগণের মতে, যে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা যেখানে হারাম কাজ বা কুফরী কর্মকাণ্ডের সহায়তা করা হয়, তা জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৭)
-
তবে যদি ব্যক্তিটির কাজ সম্পূর্ণরূপে প্রশাসনিক, অ্যাকাউন্টিং, পরিচ্ছন্নতা বা এমন কোনো নিরপেক্ষ কাজ হয় যা ধর্মপ্রচারের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না, এবং তিনি নিজে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করেন, তাহলে কিছু শর্তে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু মিশনারি এনজিও হওয়ার কারণে সন্দেহ ও হারামের সম্ভাবনা প্রবল। তাই সাধারণত এ ধরনের চাকরি থেকে বিরত থাকাই উত্তম। (আহসানুল ফাতাওয়া, ৮/২৪৪)
২. এই ব্যক্তিকে বিয়ে করার হুকুম
-
বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের চারিত্রিক ও ধর্মীয় অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসে এসেছে:
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
"তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও।" (তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪) -
উপার্জনের পবিত্রতা দ্বীনদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি ব্যক্তিটির চাকরি হারাম বা সন্দেহজনক হয়, তাহলে তার আয় হারাম বা মাকরুহ হবে। এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করা উচিত নয়, কারণ তা সংসারে বরকত নষ্ট করবে এবং ভবিষ্যতে সন্তান-সন্ততির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৫৬)
-
তবে যদি ব্যক্তি নিজে এই চাকরিকে গুনাহ মনে করে এবং শীঘ্রই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা রাখে, তাহলে তাকে বিয়ে করা জায়েজ। কিন্তু যদি সে চাকরিকেই জায়েজ মনে করে এবং কাজের মাধ্যমে মিশনারি কার্যক্রমে সহায়তা করে, তাহলে তাকে বিয়ে করা অত্যন্ত নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৭৫)
৩. হানাফী ফিকহের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৯২): "যে ব্যক্তি এমন জায়গায় কাজ করে যেখানে কুফরী বা শিরকী কাজ হয়, তার উপার্জন হারাম।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪২৭): "মিশনারি প্রতিষ্ঠানে বা গির্জায় কাজ করা নাজায়েজ, যদি সেটা ধর্মপ্রচারে সহায়তা হয়।"
- আহসানুল ফাতাওয়া (৮/২৪৪): "এনজিওতে কাজ করার বৈধতা নির্ভর করে তার কাজের প্রকৃতি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের ওপর।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৫৬): "হারাম উপার্জনকারী ব্যক্তিকে বিয়ে করা মাকরুহে তাহরিমি।"
শেষ সিদ্ধান্ত
- সাধারণত খৃিষ্টান মিশনারি এনজিওতে চাকরি করা জায়েজ নয়, আর সেই চাকরি করা ব্যক্তিকে বিয়েও জায়েজ নয় যদি সে চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি না হয়।
- তবে যদি ব্যক্তি চাকরি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত থাকে, অথবা তার কাজ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও ধর্মীয় প্রচারের সাথে সম্পর্কহীন হয়, তাহলে বিয়ে করা জায়েজ হলেও পূর্ণ দ্বীনদারির দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে বিয়ে করা এড়িয়ে চলাই উত্তম।
- মোটকথা: বিয়ের আগে পাত্রের উপার্জনের উৎস ও দ্বীনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা জরুরি। যার উপার্জন সন্দেহযুক্ত, তাকে বিয়ে না করাই শ্রেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন।
ওয়াল্লাহু তা‘আলা আ‘লাম।