পিডিএফ পড়ার কাফফারা কীভাবে দেব
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এগুলোর দাম তখনকার থেকে হয়তো এখন বেড়েছে। প্রতিটার দাম ৩০০ ধরলেও ২৭০০০০ টাকার বই৷
এগুলোর কাফফারা কীভাবে দেব? আমার কাছে তেমন টাকা নেই। ইসলামী বইগুলো যতটুকু পারি কিনছি, কিন্তু বাকি বইগুলো তো এখন পড়ার ইচ্ছা হয়না৷ রোমান্টিক বা কিশোর-গল্প।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগ ও অনুতাপ সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনি যে কাজ করেছেন (কপিরাইটযুক্ত বইয়ের পিডিএফ অনুমতি ছাড়া পড়া) শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও গুনাহের কাজ। কারণ এটি লেখক ও প্রকাশকের বৈধ অধিকার (মালিকানা) লঙ্ঘন করে। হানাফি ফিকহের বিশিষ্ট আলেমগণ যেমন মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. ও মুফতি তাকি উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর ফতোয়া অনুযায়ী, কপিরাইট একটি বৈধ সম্পদ (মাল), যা লঙ্ঘন করা জায়েজ নয়।
তবে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত দয়ালু, তিনি তওবার দরজা খোলা রেখেছেন। আপনার কাজটি যদি অজ্ঞতার কারণে হয়ে থাকে, তবে আশা করা যায় আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু যেহেতু এটি অন্যদের হক (অধিকার) নষ্ট করার সাথে জড়িত, তাই শুধু তওবাই যথেষ্ট নয়; যতটুকু সম্ভব ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
কাফফারার পদ্ধতি:
১. সঠিক তওবা:
- এখনই এসব পিডিএফ পড়া বন্ধ করুন।
- অনুতপ্ত হন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন যে ভবিষ্যতে আর কখনও এ কাজ করবেন না।
- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَتُوبُ عَلَى التَّائِبِينَ
“নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের তওবা কবুল করেন।” (সূরা তওবা: ১০৪)
২. হক (অধিকার) ফিরিয়ে দেওয়া:
যেহেতু আপনি লেখক ও প্রকাশকের অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছেন, তাই যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে তাদের এ ক্ষতিপূরণ দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু আপনার সামর্থ্য যদি না থাকে, তাহলে ইসলাম এ ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছে।
ক. সামর্থ্য থাকলে:
আপনি যেসব বইয়ের পিডিএফ পড়েছেন, সেগুলোর প্রকৃত মূল্য (বইয়ের দাম) সে সময়ের মূল্য অনুযায়ী অনুমান করে লেখক বা প্রকাশককে (যদি চিহ্নিত করা যায়) ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি তাদের খুঁজে পাওয়া না যায় বা যোগাযোগ সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া জায়েজ। তবে সেটি নেকির নিয়তে সদকা হবে, কাফফারা হিসেবে নয়—কারণ হকদারকে দেওয়াই মূল কর্তব্য।
খ. যদি সম্পূর্ণ অক্ষম হন:
আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা যদি সত্যিই খুব খারাপ হয় যে মোট ২,৭০,০০০ টাকা দেওয়া অসম্ভব, তাহলে আপনি নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারেন:
- সম্ভাব্য বই কিনে বা সদকা করে: যেসব ইসলামী বই আপনি পড়েছেন, সেগুলোর প্রকৃত কপি কিনে বা অন্যান্য ভালো কাজের মাধ্যমে আপনি ক্ষতিপূরণের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন। তবে রোমান্টিক/গল্পের বইগুলো পড়তে এখন আপনার ইচ্ছা না থাকলেও, শুধু ক্ষতিপূরণের উদ্দেশ্যে সেগুলো কেনার প্রয়োজন নেই; বরং আপনি চাইলে লেখকদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করতে পারেন।
- নিয়মিত দোয়া করুন: প্রতিদিন লেখকদের জন্য দোয়া করুন, যাতে আল্লাহ তাদের ক্ষতি পূরণ করে দেন।
- অতিরিক্ত নফল ইবাদত: বেশী বেশী নফল নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত ও সদকা করুন। আশা করা যায় আল্লাহ আপনার নেক আমল দ্বারা সেই হকের বিনিময় পূরণ করে দেবেন।
গ. গুরুত্বপূর্ণ নীতি:
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. সহ হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম বলেন যে যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের হক নষ্ট করে ফেলে এবং তা আদায়ে সক্ষম না হয়, তবে সে শুধু তওবা করলে আল্লাহ পরকালে নিজ দয়া থেকে তার পক্ষে তা পূরণ করে দেবেন, إن شاء الله। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৫২৮; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৭৯)
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
- ইসলামী বই: ইসলামী বইয়ের পিডিএফ পড়াও কপিরাইট লঙ্ঘন করলে গুনাহ, তবে যদি বইটি কপিরাইটমুক্ত হয় বা লেখক নিজেই বিনামূল্যে প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে জায়েজ। আপনি যেসব ইসলামী বই পড়েছেন, সেগুলোর বিষয়ে নিশ্চিত না হলে সাধারণ তওবাই যথেষ্ট।
- যেসব বই পরে কিনেছেন: যে বইয়ের পিডিএফ পড়ে পরে সেটির মূল কপি কিনেছেন, সে বইটির জন্য আপনি মূলত ক্ষতিপূরণ দিয়ে ফেলেছেন—অতএব এগুলোর জন্য আলাদা কাফফারা প্রয়োজন নেই।
- বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: এখন থেকে কোনো কপিরাইটযুক্ত বই পিডিএফ বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে খরিদ ছাড়া পড়বেন না। সুযোগ থাকলে লেখক/প্রকাশকের অনুমতি নিন।
উপসংহার:
আপনার উচিত:
১. তওবা করা।
২. সাধ্যমতো লেখকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করা।
৩. যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে আল্লাহর কাছে কাঁদতে থাকা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা।
৪. ইসলামী বইগুলো ক্রয় করে পড়া—এতে আপনার সওয়াবও হবে, এবং আগের ভুলের প্রায়শ্চিত্তও হবে إن شاء الله।
আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনার উপর সহজ করুন। আমিন।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), জিলদ ২, কপিরাইট বিষয়ক ফতোয়া।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ৬/৫২৮।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি), ৪/৩৫০।
- বাহেশতি জেওর (মুফতি মুহাম্মদ শফি), কপিরাইট ও চুরি প্রসঙ্গ।
والله أعلم بالصواب