দ্বীনদার ছেলে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না করণীয় কি হতে পারে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আপনার দ্বীনদারি ও বিবেকবোধের জন্য আপনাকে অনেক সালাম ও দুআ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও হিকমত দান করুন। আপনার প্রশ্নটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গঠিত। নিচে আমি হানাফি ফিকহ ও কুরআন-হাদিসের আলোকে প্রতিটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেব।
১. বিবাহে মেয়ের সম্মতি ও পিতামাতার ভূমিকা
ইসলামে নারীর বিবাহ সম্পূর্ণ তার নিজস্ব ইচ্ছা ও সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। পিতামাতা বা অভিভাবক জোর করে বিবাহ দিতে পারেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
“বিধবা নারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না, আর কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪১৯)
সুতরাং আপনি যেসব ছেলেকে বেদ্বীন মনে করে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা আপনার ইসলামি অধিকার। আপনার পরিবার যদি আপনাকে জোর করে কোনো বেদ্বীনের সাথে বিয়ে দিতে চায়, তবে তা ইসলামসম্মত হবে না। আপনার কর্তব্য হলো দৃঢ়ভাবে বলা যে আপনি এর সাথে একমত নন।
২. ফটো (ছবি) দেওয়া ও দেখা
বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্রপক্ষের জন্য পাত্রীর চেহারা ও হাতের ছবি দেখা জায়েয আছে, তবে তা গোপনে বা কোনো গর্হিত উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে:
يَجُوزُ النَّظَرُ إلَى وَجْهِهَا وَكَفَّيْهَا لِقَصْدِ النِّكَاحِ
“বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রীর চেহারা ও হাতের দিকে তাকানো জায়েয।”
(রদ্দুল মুহতার, ৫/২৩৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮১)
কিন্তু এই অনুমতি সত্ত্বেও আপনি যদি মনে করেন যে আপনার ফটো দেওয়ার মাধ্যমে কোনো অনৈতিক ব্যবহার হবে বা আপনার মর্জি ছাড়া জোর করে ফটো দেওয়া হচ্ছে, তবে আপনি সেটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। ফটো দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং পর্দার মধ্যে থেকে সরাসরি দেখা বা বর্ণনার মাধ্যমে কাজ চালানো যেতে পারে। আপনার পরিবার যদি জোর করে আপনার ফটো দেয়, তাহলে আপনি এর পক্ষে নন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিন। আপনি নিজে কোনো ফটো সরবরাহ না করলে আপনার ওপর গুনাহ হবে না।
৩. বাবা-মায়ের দায়িত্ব ও আপন করণীয়
আপনার পরিবার চাচ্ছে একটি দীনদার ছেলে, কিন্তু তারা সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। তারা বলছে “যেমন খুঁজে দেবে নিতে হবে, নাহলে নিজে খুঁজে নাও।” এটি ন্যায়সংগত নয়। আপনার জন্য করণীয়:
ক. ধৈর্য ও ইস্তিখারা:
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। বেশি বেশি দুআ করুন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী ইস্তিখারা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য ভালো ব্যবস্থা করবেন।
খ. নিজে খোঁজা:
আপনি নিজে দ্বীনদার যুবক খুঁজতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে পর্দা ও শারঈ পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। আপনি আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলিমগণ, পরিচিত মাশায়েখ, বা ইসলামি বিবাহ সংস্থার সাহায্য নিতে পারেন। আপনার এলাকায় দীনদার ছেলের সংখ্যা কম থাকলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বা অনলাইনে ইসলামি বিবাহ প্ল্যাটফর্ম (যেমন: সুন্নাহ ম্যারেজ, ইসলামিক ম্যারেজ ওয়েবসাইট) ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। তবে সতর্ক থাকুন, যেন কোনো প্রকার বে-পর্দা বা হারাম পদ্ধতি না হয়।
গ. পরিবারের সাথে আলোচনা:
শান্তভাবে পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে দ্বীনদারি কেবল নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পর্দা, হালাল রিযিক, আখলাক ইত্যাদিও এর অংশ। তাদের বোঝান যে আপনি আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য ভালো জীবনসঙ্গী চান। প্রয়োজনে কোনো স্থানীয় আলিম বা মুরব্বিকে মধ্যস্থতা করতে বলতে পারেন।
ঘ. জোরাজুরি মোকাবিলা:
যদি পরিবার আপনাকে ঘরছাড়া করার হুমকি দেয়, তবে আপনি ভয় পাবেন না। প্রয়োজনে আপনি স্থানীয় কোনো আলিম, ইসলামি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের আশ্রয় নিতে পারেন। তবে চেষ্টা করবেন পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে। আপনার ছাত্রী হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নিতে পারেন।
৪. দ্বীনদার ছেলে না পাওয়ার বাস্তবতা
আপনি লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে পূর্ণ দ্বীনদার ছেলে পাওয়া কঠিন। এটি সত্যি। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনি কিছু নমনীয়তা দেখাতে পারেন:
- “দ্বীনদার” বলতে শুধু মাদ্রাসাপড়ুয়া বা পূর্ণ দাড়িওয়ালা বুঝাবেন না। বরং এমন ছেলে যে নামাজ পড়ে, হারাম থেকে বাঁচে, ইসলামি বিধান মানতে ইচ্ছুক, এবং আপনার দ্বীনি অনুভূতিকে সম্মান করে – তাকে দীনদার বলা যায়।
- কিছু ছেলে হয়তো ধীরে ধীরে দ্বীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। তাই আপনি যদি একজন সাধারণ মুসলিম কিন্তু সংশোধনযোগ্য ব্যক্তি পান, তবে তার সাথে বিবাহের আগে বা পরে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে অবশ্যই শর্ত হচ্ছে বর্তমানে সে বিদ‘আতি বা প্রকাশ্য পাপী না হয়।
- আপনি ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। অসম্ভব নয়, আল্লাহর কাছে সব সম্ভব।
৫. চূড়ান্ত পরামর্শ
১. আপনার দ্বীনের ওপর অটল থাকুন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো আপস করবেন না। কিন্তু আচরণে কোমলতা ও হিকমত বজায় রাখুন।
২. বিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত পেরেশান না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। তিনি বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)
৩. পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না; বরং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন, কিন্তু স্পষ্ট জানিয়ে দিন যে আপনার বিয়েতে আপনার মতামতই চূড়ান্ত।
৪. ইলম ও আমলের পথে অগ্রসর থাকুন। আপনার আলিম ব্যাচের পড়াশোনা চালিয়ে যান। সম্ভব হলে বিবাহের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. মহিলা আলিমা হিসেবে আপনি এলাকার জন্য একটি সম্পদ। আপনার দ্বীনি অবস্থানের কারণে আপনাকে নিয়ে পরিবারও গর্বিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
সংক্ষেপে জবাব:
- আপনার বিয়েতে আপনার সম্মতি আবশ্যক। বেদ্বীন ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করা আপনার অধিকার।
- ফটো দেওয়া জায়েয হলেও জোর করে নেওয়া বা দেওয়া ঠিক নয়; আপনি না দিলে গুনাহ আপনার না।
- নিজে একটি শারঈ মাধ্যম (আলিম, বিবাহ সংস্থা) দিয়ে পাত্র খুঁজতে পারেন।
- পরিবারের সাথে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে স্থানীয় আলিমের শরণাপন্ন হোন।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, ইস্তিখারা করুন, এবং ধৈর্য ধারণ করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী সহজ করে দিন এবং আপনার দ্বীনি আমল ও ইলমে বরকত দিন। আমীন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ