হায়েয অবস্থায় জ্বীন আক্রান্ত মাকে স্পর্শ করা ও ফু দেওয়ার বিধান।
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
আমার মায়ের শরীরে বিয়ের পর থেকেই জ্বীন আছে যা প্রায় ৩০ বছর ধরে,জ্বীনকে তাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনোভাবেই যায় নি,অনেক হুজুর কবিরাজ দেখিয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয় নি,,।
আমার আম্মুর শরীরে যখন জীন প্রবেশ করে তখন কি হায়েয অবস্থায় স্পর্শ করা যাবে?আর হায়েয অবস্থায় কোন সুরা বা দুয়া গুলো পড়ে ফু দিতে পারব
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. মায়ের শরীরে জ্বীনের উপদ্রব থাকলে হায়েয অবস্থায় তাকে স্পর্শ করা জায়েজ। কারণ এটা চিকিৎসা বা সেবার প্রয়োজন। পবিত্র-অপবিত্র থাকার কারণে মা-মেয়ের মধ্যে স্পর্শ নিষিদ্ধ নয়। তবে কুরআন স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা হায়েয অবস্থায় নিষিদ্ধ।
২. হায়েয অবস্থায় সূরা বা দোয়া পড়ে ফু দেওয়ার ব্যাপারে:
- কুরআনের আয়াত (যেমন: আয়াতুল কুরসি, সূরা ফাতিহা, ইখলাস, ফালাক, নাস ইত্যাদি) সরাসরি মুখে উচ্চারণ করে ফু দেওয়া অপবিত্র অবস্থায় জায়েজ নয়, কারণ হায়েয অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ (যদিও দোয়া বা জিকিরের নিয়তে পড়া যায়, কিন্তু সতর্কতা হিসেবে এড়ানো উচিত)।
- বিকল্প: আপনি দোয়া বা জিকির (যেমন: "বিসমিল্লাহ", "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", "আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম", দরুদ শরীফ ইত্যাদি) পড়ে ফু দিতে পারেন। অথবা কুরআনের আয়াত মনে মনে পড়ে ফু দেওয়া যায় (শুধু ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া)।
- সহজ পদ্ধতি: হায়েয শেষে পবিত্র হয়ে সরাসরি কুরআন পড়ে ফু দেওয়া উত্তম। কিন্তু জরুরি অবস্থায় দোয়া ও জিকির পড়ে ফু দেওয়া জায়েজ।
বিস্তারিত দলিল:
(ক) হায়েয অবস্থায় স্পর্শ করা:
হায়েয অবস্থায় মা-মেয়ের মধ্যে স্পর্শ করা জায়েজ। কারণ অপবিত্রতা স্পর্শের সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং ইবাদতের (নামাজ, রোজা, কুরআন স্পর্শ) সাথে সম্পর্কিত। রদ্দুল মুহতার (১/২৯৩) এ উল্লেখ আছে যে, হায়েয অবস্থায় স্ত্রীকে স্পর্শ করা জায়েজ, তবে যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। মা-মেয়ের মধ্যে তো কোনো নিষেধ নেই।
(খ) হায়েয অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও ফুক দেওয়া:
হানাফি মতে: হায়েয অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধ) (ফাতাওয়া শামী: ১/২৯২)। তবে দোয়া ও জিকির (যেমন: আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, দরুদ, ইস্তিগফার ইত্যাদি) পড়া জায়েজ।
কুরআনের আয়াত পড়ে ফু দেওয়ার ক্ষেত্রে:
- যদি আয়াত পড়ে ফু দেওয়া হয়, তাহলে তা কুরআন তিলাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। তাই হায়েয অবস্থায় তা জায়েজ নয় (ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৩৪)।
- তবে দোয়া বা জিকির পড়ে ফু দেওয়া জায়েজ। যেমন:
- "أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ"
- "بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ"
- দরুদ শরীফ, ইস্তিগফার ইত্যাদি।
বিশেষ পরামর্শ:
- জ্বীনের উপদ্রব থেকে নিরাময়ের জন্য রুকইয়া (কুরআন ও দোয়া দ্বারা চিকিৎসা) করা সুন্নত। তবে রুকইয়ার জন্য পবিত্র অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম।
- আপনার মায়ের জন্য নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ফাতিহা, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পানিতে পড়ে ফু দিয়ে পান করান (হায়েয শেষে)।
- হায়েয অবস্থায় জরুরি হলে নিচের দোয়াগুলো পড়ে ফু দিতে পারেন:
- "بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ"
- "لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ"
- "اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا"
মারেফুল কুরআনে জ্বীন সম্পর্কে:
জ্বীনের অস্তিত্ব কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত (সূরা জ্বীন, সূরা কাহফ)। তবে জ্বীন তাড়ানোর জন্য কবিরাজের কাছে যাওয়া হারাম। শুধু কুরআন ও সুন্নাহ সম্মত রুকইয়া ব্যবহার করতে হবে। (মারেফুল কুরআন: ৭/৭৩২)
সার কথা:
- হায়েয অবস্থায় মাকে স্পর্শ করা জায়েজ।
- কুরআনের আয়াত পড়ে ফু দেওয়া হায়েয অবস্থায় জায়েজ নয়; বরং দোয়া-জিকির পড়ে ফু দিন।
- সবচেয়ে সুন্দর হলো: পবিত্র অবস্থায় কুরআনের আয়াত পড়ে ফু দেওয়া এবং মায়ের জন্য দোয়া করা।
আল্লাহ আপনার মাকে জ্বীনের উপদ্রব থেকে নিরাপদ রাখুন। আমীন।