শশুড়বাড়িতে বউকে জোর করে কাজ করানো ও রান্না না পারায় শ্বশুরবাড়ির চাপ: স্বামীর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

Family Life · Hanafi

Question No: 3026
Questioner: Tasfia Santona
Question Asked: 23 Jul 2026, 12:13 PM
Reviewed & Published: 23 Jul 2026, 12:28 PM
Views: 10
Tokens: 5,423
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

শশুড়বাড়িতে ছেলের বউকে দিয়ে জোরপুর্বক সব কাজ রান্না করিয়ে নিতে চায় কিন্তু মেয়ে রান্না পারেনা এজন্য ছেলের পরিবার চায় মেয়ে তার বাপের বাড়িতে থাকবে যতদিন না ছেলে আলাদা পরিবেশ দিতে পারছে এবং একজন স্বামীর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব কি কি পরিবার খাবার এবং অন্যান্য বিষয়ে জুলুম পর্যায়ে গেলে?

Answer

প্রশ্ন: শশুরবাড়িতে ছেলের বউকে দিয়ে জোরপূর্বক সব কাজ করানো, রান্না না পারায় বাপের বাড়িতে থাকার চাপ, এবং স্বামীর দায়িত্ব ও জুলুমের সীমা

উত্তর:

প্রশ্নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে পরিষ্কারভাবে উত্তর দেওয়া হলো।


১. স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব (স্বামী স্ত্রীর জন্য কী কী করার অধিকারী)

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারিত। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব হলো:

  • স্বামীর বৈধ আদেশ মান্য করা।
  • পরিবারের মর্যাদা ও সম্পদ রক্ষা করা।
  • স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া।

তবে স্ত্রীকে জোরপূর্বক শ্বশুরবাড়ির জন্য রান্নাবান্না বা ঘরের কাজ করতে বাধ্য করা জায়েজ নয়। স্ত্রী তার সাধ্যমতো স্বামীর জন্য কাজ করবে, কিন্তু তা বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেওরদের জন্য তার কোনো কাজ করা ফরজ নয়।

(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৮; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫১৮)


২. স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব (স্বামী কী কী প্রদান করবে)

স্বামীর ওপর স্ত্রীর নিম্নোক্ত অধিকার ফরজ:

ক) খাদ্য ও পোশাক (নাফাকা):

স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে পর্যাপ্ত খাবার, পোশাক ও থাকার ব্যবস্থা দিতে বাধ্য।

  • কুরআন: “আর তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তাদের খোরপোষ ও পোশাকের ব্যবস্থা করবে ন্যায়সঙ্গতভাবে।” (সূরা বাকারা, ২:২৩৩)
  • হাদিস: “তোমাদের স্ত্রীদের তাদের খাদ্য ও পোশাক দাও যথাযথভাবে।” (সহিহ মুসলিম, ১২১৮)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: “স্বামীর ওপর স্ত্রীর নাফাকা ফরজ, যদিও স্ত্রী ধনী হয়।” (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৪২)

খ) থাকার ব্যবস্থা (আলাদা পরিবেশ):

স্ত্রী যদি চায় যে স্বামী তাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আলাদা একটি বাসস্থান দেবে, তবে তা স্বামীর জন্য ওয়াজিব। বিশেষ করে যদি শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর ওপর জুলুম হয় অথবা সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়।

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: “স্ত্রী যদি শাশুড়ির সাথে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করে, তবে স্বামীর জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৭০)
  • বাহিশতি জেওর: “স্বামী যদি স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে চায়, আর স্ত্রী সেখানে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়, তবে তার জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।” (বাহিশতি জেওর, খণ্ড ৭, বিবাহ অধ্যায়)

গ) চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ:

স্বামী স্ত্রীর চিকিৎসা, সাজসজ্জা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করবে, তবে তা ন্যায্য সীমার মধ্যে।

(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪১-৫৪৩)


৩. স্ত্রী রান্না না পারলে করণীয়

প্রশ্নে বলা হয়েছে, ‘মেয়ে রান্না পারেনা’। এর মানে এই নয় যে সে দোষী বা তার ওপর জোর করে কাজ চাপানো বৈধ। বরং:

  • স্ত্রী যদি রান্না না জানে, তাকে ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে শেখানো উচিত।
  • জোর করে কাজ করানো হারাম। যদি শ্বশুরবাড়ি এটি করে, তা জুলুম।
  • স্বামীর জন্য জায়েজ নয় যে সে স্ত্রীকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে শুধু রান্না না পারার কারণে। বরং তাকে আলাদা ব্যবস্থা দেওয়া বা শেখানো তার কর্তব্য।

(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৭৫)


৪. জুলুম (অত্যাচার) পর্যায়ে কী কী গেলে সেটা জুলুম হবে?

নিম্নোক্ত কাজগুলো জুলুমের পর্যায়ে পড়ে:

  • শারীরিক নির্যাতন: মারধর, কাজের জন্য চাপ প্রয়োগ।
  • মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা: খাবার না দেওয়া, পোশাক না দেওয়া, চিকিৎসা না করানো।
  • মানসিক নির্যাতন: তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান, মানসিক চাপ দেওয়া।
  • ভরণপোষণ না দেওয়া: স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে খরচ না দেয়, তবে তা জুলুম।
  • স্বেচ্ছাচারী আচরণ: স্ত্রীর মতামত না নেওয়া, তার ইচ্ছার বিপরীতে কাজ চাপানো।

কুরআন ও হাদিসে জুলুম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ:

  • “নিশ্চয়ই জুলুমকারীদের জন্য কঠিন শাস্তি।” (সূরা ইব্রাহীম, ১৪:৪২)
  • “তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উত্তম যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম।” (তিরমিজি, ৩৮৯৫)

(ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৪৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬০)


৫. পুরো পরিস্থিতির ইসলামি সমাধান

প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী পরামর্শ:

  1. স্বামীর কর্তব্য:

    • স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ির জুলুম থেকে রক্ষা করুন।
    • যত দ্রুত সম্ভব আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করুন। যদি তাৎক্ষণিক সম্ভব না হয়, তবে অন্তত নিশ্চিত করুন যে স্ত্রী নিরাপদ ও সম্মানিত পরিবেশে থাকবে।
    • স্ত্রীকে তার বাপের বাড়িতে থাকতে বললে তার খরচ (নাফাকা) চালিয়ে যেতে হবে। স্ত্রী চাইলে সে বাপের বাড়ি থেকেও নাফাকা দাবি করতে পারে।
  2. স্ত্রীর অধিকার:

    • যদি স্বামী নাফাকা না দেয়, তাহলে স্ত্রী তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে অথবা তালাক চাইতে পারে।
    • যদি জুলুম সহ্যের বাইরে যায়, তাহলে স্ত্রী ইসলামি সালিশ (আরবিট্রেশন) বা বিচারকের কাছে যেতে পারে।

(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৭; আল-হিদায়া, ২/২৯০)


সারসংক্ষেপ

  • শ্বশুরবাড়ির কাজ করানো জোরপূর্বক জায়েজ নয়।
  • স্বামীর ওপর স্ত্রীর খাদ্য, পোশাক ও আলাদা থাকার ব্যবস্থা ফরজ।
  • স্ত্রী রান্না না জানলে তাকে শেখানো বা সাহায্য করা উচিত, জোর করা নয়।
  • স্ত্রীকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে স্বামী তার নাফাকা দিতে বাধ্য।
  • উপরোক্ত সব বিষয়ে জুলুম সাব্যস্ত হলে স্ত্রী আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে ন্যায় ও ইনসাফের পথে পরিচালিত করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.