হস্তমৈথুন সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন
Halal and Haram · Hanafi
Question
আসলে আমি জানতে চাচ্ছিলাম এই এই হস্তমৈথুন কারি কি ধরনের। যে কিনা প্রতিনিয়ত করছে নাকি মাঝেমধ্যে করছে। যেমন কেউ হস্তমৈথুন করে না কিন্তু শয়তানের ধোকায় বছরে দু একবার করে ফেলে সেও কি এর আওতায় পড়বে।
Answer
উত্তর
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি সহীহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সাত প্রকার লোক আছে যাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন (রহমতের) দৃষ্টি দেবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না... তাদের মধ্যে একজন হলো হস্তমৈথুনকারী (মানিকুহু বা যে নিজ হাত দ্বারা বীর্যপাত ঘটায়)।”
(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৪৪২৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস: ৩৭৪১)
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হানাফী ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ বলেন:
হস্তমৈথুনকারী কারা?
- যে ব্যক্তি নিয়মিত ও অভ্যাসগতভাবে হস্তমৈথুন করে এবং তাওবা না করে, সে এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।
- যে ব্যক্তি মাঝে মাঝে (যেমন বছরে এক-দুইবার) শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে হস্তমৈথুন করে ফেলে, কিন্তু পরে অনুতপ্ত হয় এবং তাওবা করে, সে এই হাদীসের ভয়াবহ শাস্তির আওতায় পড়বে না, তবে তার কাজ অতি নিকৃষ্ট গুনাহ।
ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারীতে বলেন:
"এই হাদীসে যে সকল পাপীর কথা বলা হয়েছে, তারা এমন লোক যারা এগুলোকে হালাল জ্ঞান করে অথবা এগুলোতে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তাওবা করে না। যে ব্যক্তি মাঝে মাঝে এই পাপ করে ফেলে, কিন্তু তাওবা করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে এই ভয়াবহতার আওতায় পড়বে না।"
(ফাতহুল বারী, ১১/৩২৪)
হানাফী কিতাবের বক্তব্য:
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ লেখা আছে:
"হস্তমৈথুন হারাম, তবে যদি কেউ মাঝে মাঝে শুধু জ্বালা-যন্ত্রণা দূর করার জন্য করে, তাহলে তা মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) এবং গুনাহ। কিন্তু এই হাদীসের ভয়াবহ শাস্তি তাদের জন্য, যারা এটাকে অভ্যাস ও পেশা বানিয়ে নেয় এবং তাওবা করে না।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭১, কিতাবুন নিকাহ)
২. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) তে বলা হয়েছে:
"যে ব্যক্তি নিয়মিত হস্তমৈথুন করে, সে ফাসিক (পাপী) হিসেবে গণ্য হবে এবং তাকে তাওবা করতে হবে। কিন্তু মাঝে মাঝে করলে তা কম গুরুতর হলেও হারাম।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫)
৩. বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) তে লেখা:
"হস্তমৈথুন করা কবীরা গুনাহ, বিশেষ করে যদি অভ্যাস হয়। তবে যদি কেউ অনিচ্ছায় বা শয়তানের ধোঁকায় বছরে এক-দুইবার করে ফেলে, তবে তার উচিত দ্রুত তাওবা করা এবং আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহ তায়ালা দয়ালু, তিনি তাওবা কবুল করেন।"
(বাহিশতী জেওর, ৮/১১, বিবাহ অধ্যায়)
আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা:
-
হস্তমৈথুন নাজায়েজ ও হারাম – কুরআন ও হাদীসের আলোকে এটি স্পষ্ট। আল্লাহ বলেন:
“আর যারা তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, তাদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসী ছাড়া... অতএব যে ব্যক্তি এদের ছাড়া অন্য কিছু কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘন করে।”
(সূরা মু’মিনূন ২৩:৫-৭)ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে হস্তমৈথুন সম্পূর্ণ হারাম (ফতহুল কাদীর, ৩/২৯৯)।
-
যে ব্যক্তি মাঝে মাঝে করে ফেলে, সে যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয় এবং তাওবা করে, তাহলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
হাদীসে এসেছে:“যে ব্যক্তি কোনো গুনাহ করে, তারপর তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৫৮)
উপসংহার:
- নিয়মিত ও অভ্যাসগত হস্তমৈথুনকারী – এই হাদীসের ভয়াবহ শাস্তির আওতায় পড়বে, যতক্ষণ না তাওবা করে।
- যে ব্যক্তি বছরে এক-দুইবার শয়তানের ধোঁকায় পড়ে করে ফেলে – তিনি সরাসরি এই হাদীসের ঐ বিশেষ শাস্তির আওতায় পড়বেন না, তবে তার জন্য ওই কাজ ছেড়ে দেওয়া, লজ্জিত হওয়া এবং দৃঢ়ভাবে তাওবা করা জরুরি। কারণ এটি হারাম কাজ।
- সব অবস্থায় তাওবা করা ওয়াজিব – যে কোনো গুনাহের পরই তাওবা করতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে ছেড়ে দিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হিফাজত করুন এবং এই জঘন্য কাজ থেকে বাঁচার তাওফিক দিন। আমীন।
রেফারেন্স:
- সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৪৪২৬
- মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস: ৩৭৪১
- ফাতহুল বারী, ১১/৩২৪
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭১
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫
- বাহিশতী জেওর, ৮/১১
- তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, সূরা মু’মিনূন ২৩:৫-৭