গুনাহের কাফফারার জন্য কুরআন খতম বা রোজা রাখা কি যাবে?
Siyam-Fasting · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
প্রশ্ন: গুনাহের কাফফারার নিয়াতে একবার কুরআন খতম দিলে বা সিয়াম রাখলে তা কি জায়েজ হবে?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
গুনাহের কাফফারা ইসলামি শরিয়তে একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা। এটি মূলত এমন কিছু নির্দিষ্ট গুনাহের জন্যই প্রযোজ্য, যার জন্য কুরআন ও সুন্নাহতে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
- শপথ ভঙ্গের কাফফারা (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
- যিহার এর কাফফারা (সূরা আল-মুজাদালাহ: ৩-৪)
- রমজানে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গের কাফফারা (হাদিসে বর্ণিত: ২ মাস ধারাবাহিক রোজা বা ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো)
- ভুলবশত হত্যার কাফফারা (সূরা আন-নিসা: ৯২)
এই নির্দিষ্ট কাফফারাগুলোর কোনো বিকল্প নেই। কুরআন খতম বা নফল রোজা রেখে এগুলোর কাফফারা আদায় হবে না।
কুরআন খতম বা নফল রোজা দিয়ে সাধারণ গুনাহের কাফফারা?
শরিয়তে সাধারণ গুনাহ মাফের জন্য কুরআন তেলাওয়াত ও নফল রোজার মতো নেক কাজের বিশেষ গুরুত্ব আছে। তবে একে 'কাফফারা' বলে গণ্য করা হবে না, বরং তা নেক আমল হিসেবে গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
"নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে দূর করে দেয়।" (সূরা হুদ: ১১৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ
"পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমুআ থেকে পরবর্তী জুমুআ এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান—এগুলো মধ্যবর্তী সময়ের (ছোট) গুনাহ মোচন করে, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।" (সহিহ মুসলিম: ২৩৩)
এখানে مُكَفِّرَاتٌ (মুকাফফিরাত) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে নির্দিষ্ট ইবাদত ছোট গুনাহ মোচনের কারণ হয়। কিন্তু এটি শরিয়ত নির্ধারিত কাফফারা নয়, বরং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ।
কুরআন খতম দেয়া কি কাফফারা হিসেবে গণ্য হবে?
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত বা অন্য কোনো নেক কাজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাফফারা (যেমন: শপথ ভঙ্গ, রমজানের রোজা ভঙ্গ ইত্যাদি) আদায় করতে চায়, তা জায়েজ নয়। কেননা কাফফারা হলো এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে পরিবর্তন বা বিকল্প আনার অনুমতি নেই।"
(মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৫/২৮২)
শায়খ ইবনু বায (রহ.) বলেন:
"কাফফারা শুধুমাত্র সেই কাজ দ্বারা আদায় হবে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নির্ধারণ করেছেন। যেমন: শপথ ভঙ্গ করলে দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা তিন দিন রোজা। কুরআন খতম দেয়া বা মৃত ব্যক্তির নামে কুরআন পাঠ করা এর মধ্যে শামিল নয়।"
(মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ২৩/৮৭)
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"কুরআন তেলাওয়াত একটি মহৎ ইবাদত। কিন্তু এটাকে ‘গুনাহের কাফফারা’ বলাটা ভুল। বরং এটি নেক আমল, যা দ্বারা আল্লাহ ছোট গুনাহ মাফ করতে পারেন। আর নির্দিষ্ট কাফফারা আদায়ের জন্য শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতি মানতেই হবে।"
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ২/৪৯)
নফল রোজা দিয়ে কি কাফফারা আদায় হবে?
নির্দিষ্ট কাফফারা (যেমন: রমজানের রোজা ভঙ্গের জন্য ২ মাস রোজা) ছাড়া অন্য কোনো নফল রোজা দিয়ে কাফফারা আদায় হবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
"যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।" (সহিহ বুখারি: ৩৮, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
এখানে গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তাকে 'কাফফারা' নাম দেয়া হয়নি। বরং এটি সেই নির্দিষ্ট রমজানের রোজার ফজিলত। সাধারণ নফল রোজা থেকেও গুনাহ মাফ আশা করা যায়, তবে তা নির্দিষ্ট কাফফারার স্থলাভিষিক্ত নয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- নির্দিষ্ট কাফফারা (যেমন শপথ ভঙ্গ, রমজানের রোজা ভঙ্গ, যিহার, হত্যা ইত্যাদি) শুধুমাত্র শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতেই আদায় করতে হবে। কুরআন খতম দেয়া বা নফল রোজা রেখে কাফফারা আদায় হবে না।
- সাধারণ গুনাহ (বিশেষ করে ছোট গুনাহ) মাফের জন্য কুরআন তেলাওয়াত এবং নফল রোজা নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু একে 'কাফফারা' বলে অভিহিত করা ঠিক নয়। বরং বলা উচিত, ‘এসব আমলের মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মাফ করে দেন।’
- কুরআন খতম কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা হিসেবে সুন্নতে প্রমাণিত নয়। তবে নেকির উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়েজ ও মুস্তাহাব।
উপসংহার
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: গুনাহের কাফফারার নিয়তে শুধু কুরআন খতম দেয়া বা নফল রোজা রাখা জায়েজ নয় যদি আপনি নির্দিষ্ট কোনো শরয়ি কাফফারা (যেমন: কসম ভঙ্গ, রমজানের রোজা ভঙ্গ ইত্যাদি) আদায় করতে চান। তবে সাধারণ গুনাহ মাফের জন্য নিয়ত করে কুরআন তেলাওয়াত ও নফল রোজা রাখা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা জায়েজ ও উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ