গোপন বিয়ে ও তালাকের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ব্যক্তির জন্য পরামর্শ কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বিয়ের পর প্রায়৬–৭ মাস তারা নিজ নিজ পরিবারের সাথেই আলাদা থাকে। পরে মেয়ের পরিবার বিষয়টি জেনে যায় এবং মেয়েটি বিভিন্ন চাপে পরে ছেলের সাথে যোগাযোগ অফ করে দেয়।এবং ভার্সিটি আসা অফ করে দেয়।তখন ছেলে টা মানসিক ভাবে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে এরই মধ্যে ছেলেটির বাবা মারা যায়। এবং ঠিক সেই মূহুর্তে হয়তো তার বাবার মৃত্যুর ১-২ দিন পর ই ছেলেকে কাজী কল করে যে আপনার স্ত্রী ডিভোর্স দিতে আসছে আপনাকে। ছেলে তখনো তার বাবার শোক শেষ করতে পারে নি।মেয়েটির সাথে কথা বলতে চাইলেও সেই সুযোগ হয় না,মেয়ে নিজেও চায় নি তখন কথা বলতে।নানাদিক এ চাপ ,বাবার মৃত্য,তার স্ত্রীর অবহেলা এসব থেকে শেষ পর্যন্ত ছেলেটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তালাকের কাগজে সাইন করে। বর্তমানে তালাকের পর ছেলেটি মানসিকভাবে খুব কষ্টে আছে।
সে নতুন করে বিয়ে- বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সে এখনও ভার্সিটির ছাত্র। ছেলের পরিবার তার এই বিয়ে ও তালাকের বিষয়টি জানে না। এখন ছেলের ফ্যামিলি থেকে বিয়ের জন্য বলা হয় ,এবং যেহেতু তাদের বিয়েটা নিয়ে কিছু কথা দুই ফ্যামিলির মধ্যে কথা হয়েছিল তাই ছেলের আম্মা এই মেয়ের ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করেছিল।এখন সব মিলিয়ে ছেলে আমাকে এসব জানিয়েছে এবং এই বিষয়ে ইসলামি শরিয়ত এর নির্দেশ কি..... তা জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আমার প্রশ্নগুলো হলো
,১, যদি ওই বিয়েটা শরিয়ত অনুযায়ী সহিহ হয়ে থাকে, তাহলে এখন তার করণীয় কী?
২, মানসিকভাবে এই ঘটনা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য ইসলামের দৃষ্টিতে কী পরামর্শ আছে?
৩, ভবিষ্যতে সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইলে, আগের বিয়ে ও তালাকের বিষয়টি কি সম্ভাব্য পাত্রী বা তার পরিবারকে জানানো শরয়ীভাবে আবশ্যক, নাকি পরিস্থিতিভেদে না জানালেও হবে?
৪, এই ঘটনার কারণে তার ওপর শরিয়াহগত কোনো দায়িত্ব বা করণীয় আছে কি? জাযাকাল্লাহু খাইরান।
যেহেতু তার বিয়ে আগে হইছে, সে তার মনকে আরেকটা বিয়ের জন্য প্রস্তুত করতে পারতেছে না..এটাই তার সবথেকে বড় সমস্যা,সে শুধু বলে সে আর বিয়েই করবে না...
শরিয়ত অনুযায়ী তাকে কিছু পরামর্শ দিলে উপকার হয়।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণে আপনার বন্ধুর ঘটনা অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি প্রশ্নের শরয়ী দিকনির্দেশনা হানাফী মাযহাব অনুযায়ী পেশ করছি।
১. যদি ওই বিয়ে শরিয়ত অনুযায়ী সহীহ হয়ে থাকে, এখন তার করণীয় কী?
হানাফী মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মনের নারী যদি নিজে ইচ্ছুক হয়ে দুজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে বিয়ে করে, তবে তা সহীহ হয়, এমনকি অভিভাবকের অনুমতি না থাকলেও। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২৫)
আপনার বন্ধুর বিয়েতে একজন কাজী ও সাক্ষী উপস্থিত ছিল। যদি সাক্ষী দুজন বা একজন পুরুষ ও দুজন নারী হয়ে থাকে এবং বর-কনে উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্মতি দানকারী হয়, তবে বিয়েটি সহীহ হয়েছে বলে গণ্য হবে।
এখন বিয়ের পর তালাক হয়ে গেছে। তালাকটি কীভাবে হয়েছে? প্রশ্ন থেকে বোঝা যায়, স্ত্রী উদ্যোগী হয়ে (সম্ভবত খুলা বা তালাকের জন্য) কাজীর মাধ্যমে তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করিয়েছে। বন্ধুটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাপে পড়ে স্বাক্ষর করেছে।
- হানাফী মতে, জোরপূর্বক তালাক (ইকরাহ) শুধু তখনই কার্যকর হয় না, যখন প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির ভয় থাকে। এখানে সে রকম জোরপূর্বক অবস্থা ছিল না, বরং তিনি নিজ ইচ্ছায় স্বাক্ষর করেছেন। তাই তালাকটি কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২২৯; আল-হিদায়া, ২/৪৩)
বর্তমান করণীয়:
- তালাকের পর ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) পালন করা স্ত্রীর কর্তব্য ছিল। বন্ধুর জন্য কোনো ইদ্দত নেই, তিনি এখন বিবাহ করার জন্য স্বাধীন।
- তবে মানসিক ও পারিবারিকভাবে এই বিচ্ছেদের প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। বিশেষ করে গোপনে বিয়ে করার কারণে যে গুনাহ হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
- পরিবারের অজান্তে বিয়ে করা শরিয়তে উৎসাহিত নয়। কারণ এটি পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে এবং ফিতনার সৃষ্টি করে। তাই ভবিষ্যতে পরিবারের সম্মতি ও উপস্থিতিতে বিয়ে করার সংকল্প করতে হবে।
২. মানসিকভাবে এই ঘটনা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য ইসলামের দৃষ্টিতে কী পরামর্শ আছে?
মানসিক কষ্ট ও হতাশা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম নিম্নলিখিত পথ নির্দেশ করে:
ক. ধৈর্য ও সালাত:
আল্লাহ বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾ (البقرة: ১৫৩)
“হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ ও নফল সালাত পড়া এবং দোয়া করা অত্যন্ত কার্যকর।
খ. দোয়া ও জিকির:
নিম্নের দোয়াগুলো নিয়মিত পড়তে পারেন:
- “اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ”
- “حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ” (সূরা তওবা: ১২৯)
গ. সময় কাজে লাগানো:
পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে একটি স্থিতিশীল পেশা অর্জনের চেষ্টা করুন। ব্যস্ততা ও লক্ষ্য মানসিক কষ্ট দূর করতে সহায়ক।
ঘ. পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক:
পরিবার এখনও ঘটনা জানে না। ধীরে ধীরে সঠিক সময়ে বিষয়টি পরিবারকে জানানো এবং তাদের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভ করা মানসিক শক্তির জন্য জরুরি। তবে বর্তমান মানসিক অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে না জানানোই ভালো, যতক্ষণ না তিনি নিজে সামাল দিতে সক্ষম হন।
ঙ. পেশাদার কাউন্সেলিং:
প্রয়োজনে ইসলামী আলেম বা মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নেওয়া জায়েজ।
৩. ভবিষ্যতে অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইলে, আগের বিয়ে ও তালাকের বিষয়টি কি সম্ভাব্য পাত্রী বা তার পরিবারকে জানানো শরয়ীভাবে আবশ্যক?
হানাফী মতে, আগের বিয়ে ও তালাকের বিষয়টি গোপন রাখা মৌলিকভাবে আবশ্যক নয়, যদি না কেউ সরাসরি জিজ্ঞাসা করে। কারণ এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অংশ। তবে ইসলামে প্রতারণা ও মিথ্যা বলা হারাম।
- যদি পাত্রী বা তার অভিভাবক সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন যে, “আপনার কি আগে কোনো বিয়ে হয়েছে বা তালাক হয়েছে?”, তাহলে সত্য বলা জরুরি। মিথ্যা বলা হারাম এবং পরবর্তীতে বিয়ে বাতিলের কারণ হতে পারে।
- যদি কেউ না জিজ্ঞাসা করে, তবে গোপন রাখা জায়েজ। কিন্তু এতে ভবিষ্যতে ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিজ্ঞতার সাথে আগেই জানানো উত্তম। বিশেষ করে যেহেতু বন্ধুটি ছোট শহর বা গ্রামের পরিবেশে থাকলে, গোপন রাখা কঠিন। তাই ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৭৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/১২২)
উত্তম পদ্ধতি: পাত্রীপক্ষের সাথে পরামর্শের সময় সম্পূর্ণ সততার সাথে বিষয়টি খোলাখুলি বলা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তি না হয়। এটি দ্বীনদারী ও নৈতিকতার দাবি।
৪. এই ঘটনার কারণে তার ওপর শরয়ী কোনো দায়িত্ব বা করণীয় আছে কি?
ক. তওবা ও ইস্তিগফার:
গোপনে বিয়ে ও পরিবারের অনুমতি না নেওয়ার কারণে তিনি অহেতুক ফিতনা সৃষ্টির গুনাহ করেছেন। সেই গুনাহের জন্য তওবা করা ওয়াজিব। তওবা হলো:
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া,
- অনুতপ্ত হওয়া,
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
খ. যদি কোনো অধিকার লঙ্ঘিত হয়ে থাকে:
- বিয়েতে কোনো মোহর ধার্য করা হয়েছিল কিনা? যদি মোহর বাকি থাকে, তবে তা পরিশোধ করা আবশ্যক। যেহেতু তালাক হয়েছে, তাই স্ত্রীকে মোহর সম্পূর্ণ বা বকেয়া অংশ দিতে হবে (যদি না আগেই দেওয়া হয়)।
- তালাকের পর স্ত্রী ইদ্দত শেষ করেছেন। তার ওপর স্ত্রী খরচের কোনো দায়িত্ব নেই।
গ. বর্তমানে কোনো কাফফারা বা জরিমানা নেই যদি সবকিছু শরিয়ত মোতাবেক হয়ে থাকে। তবে যেহেতু তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করেছেন, তিনি মনে করতে পারেন যে এটি জোরপূর্বক হয়েছে। হানাফী মতে, যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে সত্যিই তাকে বাধ্য করা হয়েছিল (যেমন প্রাণনাশের ভয়), তাহলে তালাক গণ্য হবে না। কিন্তু এখানে তা প্রযোজ্য নয়। তাই তিনি তালাককে বৈধ ধরে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দিন।
ঘ. নতুন বিয়ে করার মানসিক প্রস্তুতি:
তিনি বর্তমানে পড়াশোনা ও চাকরির দিকে মনোযোগ দিন। বিয়ে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুত হতে সময় লাগতে পারে। আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিন। দোয়া করুন:
“رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ” (সূরা ফুরকান: ৭৪)
ইসলামী পরামর্শ:
জীবনের প্রতিটি বিপদে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। তিনি বলেন,
﴿فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا﴾ (الشرح: ৫)
“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে সহজি আছে।”
আপনার বন্ধুকে বলুন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সুন্দর পরিকল্পনা করুক। শক্তিমান ও ধার্মিক জীবনসঙ্গী পেতে এখন থেকে দ্বীনের উপর আমল ও ইস্তিখারা করুক।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও তাওফীকদাতা।