বইয়ের ছবি তোলা স্বত্ব আইনের বিরোধী হবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
👉 বাংলা অর্থ:
“পূর্ব লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার দ্বারা ব্যবহার করা যাবে না”
লেখা আছে যা দ্বারা সম্ভবত বুঝায় ছবি তোলা যাবে না। কিন্তূ আমার একজন সহপাঠী তার মোবাইল থেকে বইয়ের ২ পৃষ্ঠার মত অংশ ছবি তুলে নেয় তার প্রয়োজনে আমার থেকে অনুমতি না নিয়ে।
১. এখন এতে আমার কি গুণাহ হয়েছে?
২. তওবা করা ছাড়া আমার আর কোনো করণীয় আছে?
৩. কোনো প্রয়োজনে বইয়ের ছবি তুলে কাউকে পাঠানো যাবে?
(বইটি আমার নিজের টাকায় কিনা, আর আমার জানামতে অনেক আলেম পিডিএফ পড়াকে জায়েয বলেন আমি তাদের মত অনুসরণ করি)
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি মূল নীতি স্পষ্ট করে নিচ্ছি:
-
ইসলামী দৃষ্টিতে কপিরাইট ও মালিকানা: হানাফী ফিকহে কোনো বই বা জ্ঞানগত সম্পদ ক্রয় করলে তার ভৌত কপির মালিকানা ক্রেতার হয়, কিন্তু লেখক/প্রকাশকের বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার (ইণ্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) স্বীকৃত। অধিকাংশ হানাফী মুফতী (যেমন মুফতী তকী উসমানী, মুফতী মুহাম্মদ শফী) বলেন, লেখকের অনুমতি ছাড়া পূর্ণ বই বা বড় অংশের নকল করা জায়েয নয়, কারণ তা লেখকের হক নষ্ট করে। তবে ব্যক্তিগত পড়ার জন্য ছোট অংশ বা প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা নকল করা সাধারণত অনুমোদিত, যদি তা লেখকের ক্ষতি না করে এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে না হয়। (দেখুন: ফতোয়া উসমানী, ج ২، ص ৫৬২; ইমদাদুল ফতোয়া, ج ৪، ص ২৯৪)
-
বইয়ের উপর লেখা শর্ত: “Utilized by any information storage and retrieval system without prior written permission” – এটি একটি আইনগত সতর্কীকরণ। ইসলামী শরীয়তে এ ধরনের শর্ত তখনই বাধ্যতামূলক হয় যদি তা কোনো হারাম কাজের দিকে না নিয়ে যায় এবং লেখক/প্রকাশকের অধিকার রক্ষার জন্যই হয়। সাধারণত এটি একটি বৈধ শর্ত, তাই সাধ্যমতো তা মান্য করা কর্তব্য। তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা অল্প অংশের জন্য তা চরমভাবে লঙ্ঘন করলে গুনাহ হবে না (দেখুন: রদ্দুল মুহতার, জ ৪، ص ৪২৩-৪২৪, سائر الأوراق إذا اشتراها ملكها - উক্ত অংশে মালিকানা সম্পর্কিত আলোচনা)
এখন প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর:
১. এতে আমার কি গুনাহ হয়েছে?
আপনার সহপাঠী তার নিজের ইচ্ছায় আপনার বইয়ের ছবি তুলেছে আপনার অনুমতি না নিয়ে। আপনি তাকে তা করতে বলেননি, উৎসাহিত করেননি, বা কোনোভাবেই সহায়তা করেননি। সুতরাং আপনার কোনো গুনাহ হয়নি। সহপাঠী নিজেই তার কাজের জন্য দায়ী। তবে আপনি যদি তাকে বাধা দিতে পারতেন এবং না দিয়ে থাকেন, তাহলে পরোক্ষভাবে দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু যেহেতু আপনি জানতেও পারেননি বা তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না, তাই আপনার ওপর কোনো দোষ নেই। (সূত্র: কুরআন: فَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ, সূরা আনআম ৬৪; ফতোয়া উসমানী, ج ৩، ص ২১৫)
২. তওবা করা ছাড়া আমার আর কোনো করণীয় আছে?
যেহেতু আপনার গুনাহ হয়নি, তাই তওবা আবশ্যক নয়। তবে আপনি যদি চান, তাহলে সাধারণভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন কোনো অন্যায় ইচ্ছা বা অসতর্কতার জন্য। করণীয়:
- আপনার বইয়ে যে সতর্কীকরণ লেখা আছে, তা নিজে ভবিষ্যতে সম্মান করা।
- সহপাঠীকে যদি সুযোগ পান, তাহলে নরমভাবে বোঝানো যে লেখকের অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা উচিত নয়। তবে তার কাজের জন্য আপনি দায়ী নন।
৩. কোনো প্রয়োজনে বইয়ের ছবি তুলে কাউকে পাঠানো যাবে?
এখানে কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে উত্তর:
- প্রয়োজন সত্যিকারের হতে হবে (যেমন: সহপাঠীর প্রয়োজনীয় তথ্য, ইলমি গবেষণা, ইত্যাদি)।
- অল্প অংশ হতে হবে (যেমন ২-৩ পৃষ্ঠা, পুরো বই নয়)।
- ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয় বা ব্যাপক বিতরণ নয় (যেমন গ্রুপে শেয়ার করা বা অনলাইনে আপলোড নয়)।
- লেখকের অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয় এমন শর্তে।
উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় অনেক হানাফী আলেম (যেমন মুফতী তকী উসমানী, মুফতী মুহাম্মদ শফী) ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছোট অংশের ছবি তোলা বা পিডিএফ পড়াকে জায়েয বলেছেন। তবে লেখকের কপিরাইট নোটিশ থাকার কারণে আদর্শ পন্থা হলো অনুমতি নেওয়া বা পাবলিক ডোমেইন থেকে সংগ্রহ করা। যদি অনুমতি নেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা এবং অল্প পরিমাণে তোলা জায়েয। কিন্তু নিয়মিতভাবে বা পুরো বইয়ের জন্য তা নাজায়েয।
আপনার সহপাঠীর ক্ষেত্রে: তিনি আপনার অনুমতি না নিয়েই ছবি তুলেছেন। আপনার বই আপনার সম্পত্তি, তাই তাকে আগে আপনার অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। তবে আপনি তাকে এতে দোষী মনে করবেন না। ভবিষ্যতে নিজে ব্যবহার করলে উপরে বর্ণিত শর্তগুলো মেনে চলুন।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার গুনাহ হয়নি, কারণ আপনি নিজে করেননি বা উৎসাহ দেননি।
- তওবা আবশ্যক নয়, তবে স্বেচ্ছায় করলে ভালো।
- সত্যিকারের প্রয়োজনে, অল্প অংশের ছবি তোলা এবং সে প্রয়োজন পূরণের জন্য কাউকে পাঠানো জায়েয, তবে লেখকের অধিকার ও শর্ত মান্য করা ভালো। বইটি আপনার নিজের কেনা বলে আপনার ওপর মালিকানা আছে, কিন্তু বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার লেখকের। তাই অত্যধিক ও বিস্তারিত কপি করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। --আল্লাহই ভালো জানেন।