Last time ask
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم। আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার ওয়াসওয়াসা (OCD) জনিত সমস্যার কারণে আপনি ও আপনার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া হয়েছে এবং সেই সময় স্বামী রাগের মাথায় কিছু কথা বলেছেন, যা তালাকের অধিকার দানের মতো মনে হচ্ছে। আসলে ইসলামী ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে সিরিয়াল ধরে দেওয়া হলো:
প্রশ্ন ১: উনি রাগ করে বলেছেন, মন থেকে অধিকার দেননি, নিয়ত ছিল না। তাহলে আমার কি অধিকার ছিল? আমি না বলে দেওয়ার পরেও মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কি সমস্যা হত?
উত্তর: হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিতে চান, তাহলে তার জন্য স্পষ্ট ইচ্ছা (নিয়ত) এবং সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। শুধু রাগের মাথায় বলা কথা, যা তিনি পরে অস্বীকার করেন এবং বলেন যে তার কোনো নিয়ত ছিল না, তা দ্বারা স্ত্রী তালাকের অধিকার পায় না। আপনি এই অধিকার পেয়েছিলেন না। তাই আপনার মুখ দিয়ে যদি তালাক গ্রহণের কথা ('আমি তালাক নিলাম' ইত্যাদি) বের হত, তাহলেও তা বৈধ তালাক হত না, কারণ স্বামী আপনাকে অধিকারই দেননি। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
প্রশ্ন ২: 'Tu kor' বলার দ্বারা তিনি আমাকে নিজে থাকতে দিতে বলেছেন? তিনি রেগে বলেছেন, অধিকার দেননি।
উত্তর: 'তুই কর' বলার দ্বারা সাধারণত 'তুমি যা ইচ্ছা কর' বা 'তোমার ইচ্ছা' বোঝানো হয়। কিন্তু প্রসঙ্গ ও পরবর্তী ব্যাখ্যা দেখে বোঝা যায়, তিনি রাগের মাথায় এটি বলেছেন এবং পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাই এর দ্বারা তালাকের কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। (সূত্র: আল-হিদায়া, ২/৩০০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২)
প্রশ্ন ৩: আমার ওয়াসওয়াসার কারণে মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল, মুখে উচ্চারণ করিনি। এটি কি কোনো প্রভাব ফেলবে?
উত্তর: মুখে উচ্চারণ না করলে শুধু মনে মনে কোনো চিন্তা আসা বা সংকল্প করা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়। ইসলামে তালাক সাব্যস্ত হওয়ার জন্য স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করা জরুরি। তাই আপনার মনে মনে আসা চিন্তা কোনো তালাক সৃষ্টি করেনি। (সূত্র: বাহেশতি জেওর, ৮/১৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৪৫)
প্রশ্ন ৪ & ৫: স্বামী রাগে 'অধিকার দিলাম' বলেছেন, কিন্তু নিয়ত ছিল না। তাহলে আমার মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে সমস্যা হত? আর আমি প্রত্যাখ্যান না করলেও কি সমস্যা হত?
উত্তর: না, সমস্যা হত না। কারণ স্বামীর বক্তব্য ছিল রাগের মাথায় এবং তিনি পরে তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তার কোনো নিয়ত ছিল না। তাই স্ত্রী তার কথাকে তালাকের অধিকার হিসেবে গণ্য করতে পারেন না। এমন অবস্থায় স্ত্রী যদি মুখে কিছু বলেও ফেলে, তাহলেও তা গণ্য হবে না। (সূত্র: ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৭৩; শারহু মাআনি আল-আসার, ৩/২৬)
প্রশ্ন ৬: ঝগড়া শেষে আমি বলেছি 'নিবো না, আপনি দেন না', উনি 'ওকে' বলেছেন। এবং আজকেও হামি দিচ্ছিলাম, কিন্তু মনে মনে তালাকের কথা ঘুরছিল। এর প্রভাব কী?
উত্তর: আপনার 'নিবো না' বলা এবং স্বামীর 'ওকে' বলার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আজকেও আপনি শুধু মনে মনে ভেবেছেন, মুখে বলেননি। তাই তালাক বা কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয়নি। (সূত্র: বাহেশতি জেওর, ৮/১৮)
প্রশ্ন ৭: স্বামী বলেন 'তুই বাদ দে আমাকে', 'তোকে তালাকের অধিকার দিয়ে রাখলাম', আমি বলি 'দিবনা', 'তোর অধিকারের মুখে মুতি'। পরে জানতে চাইলে তিনি বলেন অধিকার শুধু ওই সময়ের জন্য ছিল, মন থেকে দেননি।
উত্তর: স্বামী নিজেই যখন বলছেন যে তিনি মন থেকে অধিকার দেননি এবং শুধু ওই সময়ের জন্য রাগে বলেছেন, তখন ইসলামী ফিকহে তা আমলে নেওয়া হয় না। বিশেষ করে স্ত্রী যখন তা প্রত্যাখ্যান করেছে ('দিবনা'), তখন ঐ অধিকার আর কার্যকরী থাকে না। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
প্রশ্ন ৮: স্বামী যেহেতু অধিকার দেননি (রাগে বলেছেন), তাহলে যদি আমি গ্রহণ করতাম, তাহলে কি বৈধ হতো?
উত্তর: আপনি যদি তালাক গ্রহণ করতেন (যেমন বলতেন 'আমি তালাক নিলাম'), তাহলে যেহেতু স্বামী সঠিকভাবে অধিকার দেননি, তাই আপনার তালাক পতিত হতো না। অর্থাৎ তা বৈধ হতো না এবং বিবাহ বহাল থাকত। (সূত্র: আল-হিদায়া, ২/৩০০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২)
প্রশ্ন ৯ & ১০: যেহেতু অধিকার পাইনি, তাই মুখ দিয়ে কিছু বার হলেও সমস্যা হতো না, আমি প্রত্যাখ্যান না করলেও সমস্যা হতো না?
উত্তর: হ্যাঁ, সমস্যা হতো না। কারণ স্বামীর রাগের বাক্য দ্বারা আপনি কোনো অধিকার পাননি। তাই আপনি সেই অধিকার ব্যবহার করতে পারবেন না, আর আপনি মুখে কিছু বললেও তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। (সূত্র: ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৭৩)
প্রশ্ন ১১: স্বামী নিয়ত ছাড়া 'অধিকারের কথা' বলেছেন, তাহলে আমি যদি গ্রহণ করে নিতাম, তাহলে কি বৈধ তালাক হতো? তিনি ফোনে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।
উত্তর: বৈধ হতো না। স্বামীর নিয়ত না থাকা এবং পরবর্তীতে তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাহার করা প্রমাণ করে যে তিনি আপনাকে অধিকার দেননি। তাই আপনি গ্রহণ করলেও তা তালাক হিসেবে গণ্য হতো না। বিবাহ অটুট থাকত। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৪৬; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩)
প্রশ্ন ১২ & ১৩: ঘটনার সময় এবং এখন আমার কি অধিকার আছে?
উত্তর: ঘটনার সময় আপনার কাছে কোনো তালাকের অধিকার ছিল না। বর্তমানেও আপনার বিবাহ অটুট আছে। কোনো তালাক পতিত হয়নি। স্বামীর রাগের কথা দ্বারা কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয়নি। আপনি ও আপনার স্বামী এখনও আইনত স্বামী-স্ত্রী। আপনার উচিত এই বিষয় নিয়ে আর চিন্তা না করে, ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা নেওয়া এবং স্বামীর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা। (সূত্র: বাহেশতি জেওর, ৮/১৮)
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:
- আপনার স্বামী রাগের মাথায় যা বলেছেন, তা দ্বারা আপনাকে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়নি। তিনি পরে তা পরিষ্কার করেছেন।
- আপনার ওয়াসওয়াসা থাকা সত্ত্বেও আপনি মুখে তালাকের কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি, তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি।
- বর্তমানে আপনার বিবাহ বৈধ ও অটুট রয়েছে।
- ওয়াসওয়াসা একটি মানসিক রোগ। এর জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি ধৈর্য ও দোয়া প্রয়োজন। আপনি স্বামীকে বুঝিয়ে বলুন আপনার এই সমস্যা সম্পর্কে।
- ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের আলোচনা না করাই ভালো। শান্ত মাথায় বসে সমস্যার সমাধান করুন।
উল্লেখিত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৭)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৭৩)
- আল-হিদায়া (২/৩০০)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪২-৪৩)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩৪৫-৩৪৬)
- বাহেশতি জেওর (৮/১৭-১৮)
- শারহু মাআনি আল-আসার (৩/২৬)
দলিল: স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিতে চান, তাহলে তার জন্য স্পষ্ট ইচ্ছা ও জ্ঞান আবশ্যক। রাগের বশে বলা কথা, যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়, তা দ্বারা অধিকার সাব্যস্ত হয় না। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সম্পর্ক শান্তি ও স্থিতিশীলতা দান করুন। আমিন।