স্বপ্নে বাবাকে মরতে যেতে দেখার অর্থ কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
গত কয়েকদিন ধরে আমি খুব বাজে স্বপ্ন দেখছি।একদিন দেখলাম আমার বাবা মা*রা গেছেন।আরেকদিন দেখলাম আমার নানুবাড়িতে আমাকে আর আমার মা কে জাদু(বান মা *রা) হয়েছে।
আমাকে হ*ত্যা,রে*পের বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে আমার নানুবাড়ির লোক।আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি....
আসলে নানুবাড়ির বা দাদুবাড়ির ম্যাক্সিমাম মানুষের সাথে সম্পর্ক ভালো না।তারা আমাকে অর্থসম্পদ এর কারনে হিংসা করে।কারন আমি বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা সন্তান।ভাই নেই।
আমার খুব ভয় করছে।এই স্বপ্নের মানে কি আর করনীয় কি এখন?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ভালো-মন্দ যেকোনো স্বপ্নই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয় অথবা এটি শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শনের জন্য হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"الرُّؤْيَا الْحَسَنَةُ مِنَ اللَّهِ، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يُحِبُّ فَلَا يُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا مَنْ يُحِبُّ، وَإِذَا رَأَى مَا يَكْرَهُ فَلْيَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ، وَلْيَبْصُقْ عَنْ يَسَارِهِ ثَلَاثًا، وَلَا يُحَدِّثْ بِهَا أَحَدًا فَإِنَّهَا لَنْ تَضُرَّهُ" "ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং তোমাদের কেউ যদি খারাপ স্বপ্ন দেখে, তাহলে সে যেন আল্লাহর কাছে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চায় এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চায়, এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে (শুকনো ভাবে) এবং কাউকে তা না বলে; তাহলে তা তাকে কখনো ক্ষতি করবে না।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৭৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)
অতএব, আপনি যে সকল ভয়ংকর ও অশুভ স্বপ্ন দেখছেন, তা শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন ও ওয়াসওয়াসা মাত্র। এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, ইনশাআল্লাহ।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও করণীয়:
১. স্বপ্নের অর্থ নিয়ে ভয় না করা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে, খারাপ স্বপ্ন দেখার পর তার অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বা ভয় পাওয়া উচিত নয়। বরং একে শয়তানের প্ররোচনা মনে করে উপেক্ষা করাই উত্তম। ইমাম আবু হানীফা (রহিমাহুল্লাহ) ও অন্যান্য ফকীহগণ বলেছেন: খারাপ স্বপ্ন দেখলে তা কাউকে না বলা এবং এর ব্যাখ্যা না চাওয়াই উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৬; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৪০)
২. আপনার বাস্তব ভয় ও সম্পর্কের টানাপোড়েন: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, নানুবাড়ি ও দাদুবাড়ির কিছু লোক আপনার প্রতি হিংসা করে এবং সম্পদের কারণে আপনাকে হুমকি দেয়। বাস্তব জীবনে যদি আপনার সাথে কারো মনোমালিন্য বা শত্রুতা থাকে, তবে তা স্বপ্নে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে স্বপ্নকে ভিত্তি করে বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া জায়েজ নয়। আপনি যদি সত্যিই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হন, তাহলে বাস্তবিক ব্যবস্থা নিন—যেমন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলোচনা, আইনি সুরক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
৩. জাদু-বান বিষয়ক স্বপ্ন: স্বপ্নে জাদু বা বানমারা দেখার অর্থ এই নয় যে বাস্তবেও আপনার উপর জাদু হয়েছে। কারণ শয়তান মানুষকে ভীত করে তোলার জন্য এরূপ স্বপ্ন দেখায়। তবে আপনার যদি সন্দেহ হয় যে বাস্তবেও কেউ জাদু বা অপকর্ম করেছে, তাহলে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নিম্নোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করুন:
করণীয় আমল:
-
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে নিজের গায়ে ফুঁ দিন (দম করুন)। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে তিনবার করে "কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ", "কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক" ও "কুল আউযু বিরাব্বিন্নাস" পড়ে শরীরে ফুঁ দিন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০১৭)
-
সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) রাতে ঘুমানোর আগে পড়লে তা রক্ষাকারী হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০০৯)
-
দুআ পড়ুন:
"بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ"
(উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলীম)
সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়লে কোনো ক্ষতি পৌঁছাবে না। (আবু দাউদ, হাদীস: ৫০৮৮) -
নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন, বিশেষ করে ফজর ও ইশার নামাজ জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করুন। নামাজ শয়তান থেকে দূরে রাখে।
-
ভয়ের সময় এই দুআ পড়ুন:
"اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩৬৯) -
পরিবারের সাথে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করুন। যদি কারো সাথে মনোমালিন্য থাকে, তবে সম্ভব হলে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ"
"আর আপনি ধৈর্য ধরুন যা আপনাকে পীড়া দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।" (সূরা লুকমান: ১৭)
মনে রাখবেন: শয়তান মানুষকে ভয় দেখিয়ে ঈমান থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করে। আপনি যদি এসব স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখেন এবং উপরোক্ত আমলগুলো করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণা আপনার ক্ষতি করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকে হেফাজত করুন এবং আপনার পারিবারিক সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ করুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী ও মুসলিম (খারাপ স্বপ্নের করণীয়)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৬)
- রদ্দুল মুহতার (২/৪৪০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩১২)
- বাহেশতী জেওর (ভয় ও স্বপ্ন সম্পর্কিত অধ্যায়)