হঠাৎ রাগের মাথায় তালাক উচ্চারণ করলে কি তালাক পতিত হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2693
Questioner: Shahriar Tanvir
Question Asked: 14 Jul 2026, 11:33 AM
Reviewed & Published: 14 Jul 2026, 11:50 AM
Views: 77
Tokens: 5,769
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

প্রচন্ড ঝগড়ার একটা পর্যায়ে স্বামী স্ত্রীর খুব মারামারি হয় এবং স্ত্রীর তর্কের এক মুহুতে স্বামী বলে তোকে ত তালাক দিতে হয় তখন স্বামীর কানে কে যেন এসে বলে তালাক দে তখন সে এক তালাক উচ্চারণ করে এবং তার মা স্বামীর মুখ চেপে ধরে। তবে স্বমি শুনেছিল সে কি বলেছে। এরপর স্বামীর স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরে এসে বলে আমি এ কি করলাম। তখন যে তার খুব রাগ ছিল এটা বুঝা যায়। এবং তারা মারামারিও করেছিল। সামী ত ইচ্ছা করে দেই নি প্রচুর রাগের মাথায় দেয়। তবে স্বামীর নিয়ত ছিল না বা ইচ্ছাও ছিল না

এখন সকল( হানাফি, হাম্বালী, শাফেয়ি, আলহে হাদিস বা সালাফি/ মালেকি) মাজহাব অনুযায়ী কি বলবেন

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর

প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনার সারসংক্ষেপ: এক প্রচণ্ড ঝগড়া ও মারামারির সময় স্ত্রীর উদ্দেশ্যে স্বামী বলে, “তোকে তো তালাক দিতেই হবে।” এরপর কেউ তার কানে এসে বলে “তালাক দে”, তখন স্বামী “এক তালাক” উচ্চারণ করে। তার মা এসে তার মুখ চেপে ধরে, কিন্তু সে আগেই বলে ফেলে। পরে স্বাভাবিক চিন্তায় এসে সে অনুতপ্ত হয় এবং বলে, “আমি এ কী করলাম!” তার নিয়ত বা ইচ্ছা ছিল না, শুধু রাগের মাথায় তা বলেছে।

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বিধান

হানাফি ফিকহে তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত (ইচ্ছা) সাধারণত শর্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস:

“তিনটি বিষয় এমন, যার গুরুত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা একই—তা серьёзভাবে করলে বা ঠাট্টা করলে উভয় অবস্থায় তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক ও রাজ‘আত (পুনরায় গ্রহণ)।” (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
অর্থাৎ, তালাক হাস্যরসে বা রাগের মাথায় উচ্চারিত হলেও তা গণ্য হবে, যদি উচ্চারণকারী তার কথা বুঝে থাকে এবং সচেতন থাকে।

তবে চরম ক্রোধের অবস্থায় (যে অবস্থায় মানুষ নিজের বুদ্ধি-বিবেক হারিয়ে ফেলে এবং কী বলছে তা জানে না) তালাক কার্যকর হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:

“যদি ক্রোধ এমন চরমে পৌঁছে যে, ব্যক্তি নিজের কথা ও কাজের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং পরে তার কিছুই স্মরণ থাকে না, তাহলে তালাক পতিত হবে না।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭; ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২)

প্রশ্নে উল্লেখিত স্বামী:

  • সে প্রচণ্ড রাগে ছিল, মারামারি করেছিল।
  • কারো পরামর্শে এক তালাক উচ্চারণ করে।
  • তার মা মুখ চেপে ধরার পরও সে শুনতে পায় যে সে কী বলেছে।
  • পরে স্বাভাবিক চিন্তায় এসে অনুতপ্ত হয় এবং “আমি এ কী করলাম” বলে—এতে বোঝা যায় সে তার উচ্চারণ সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং পরবর্তীতে তার স্মৃতি আছে।

সুতরাং হানাফি মাজহাব অনুযায়ী:
স্বামী তার কথা বুঝে ও জেনে তালাক দিয়েছে। তার ক্রোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছলেও সে সম্পূর্ণরূপে বুদ্ধি-বিবেক হারায়নি (কারণ পরে তার স্মৃতি আছে)। তাই তার উচ্চারিত “এক তালাক” পতিত হয়েছে এবং তা এক ‘রাজ‘ঈ’ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) তালাক হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, ইদ্দতের (তিন মাসিক বা তিন পবিত্রতা) মধ্যে স্বামী চাইলে কোনো নতুন বিবাহ ছাড়াই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তবে শর্ত হলো, সে ইচ্ছা করে (নিয়ত সহ) ফিরিয়ে নেবে, জোর করে নয়। (ফতোয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৪; ফতোয়া উসমানী, ২/৫৩৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ৩/২৮৫)

অন্যান্য মাজহাবের বিধান

শাফিঈ ও হাম্বালি মাজহাব:
তালাকের জন্য ইচ্ছা বা নিয়ত শর্ত নয়, বরং উচ্চারণই যথেষ্ট। চরম ক্রোধে যদি ব্যক্তি জ্ঞান হারায়, তাহলে তালাক পতিত হয় না। কিন্তু এখানে স্বামী জানত ও বুঝত, তাই অধিকাংশ উলামার মতে তালাক পতিত হবে। (মুগনী, ৭/২৩৬; নিহায়াতুল মুহতাজ, ৬/৩৮৬)

মালেকি মাজহাব:
মালেকি মতে, যদি ক্রোধ এমন হয় যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাহলে তালাকের ইচ্ছা না থাকলে তা পতিত হয় না। তবে সাধারণ রাগে উচ্চারিত তালাক পতিত হয়। (আল-মুদাওয়ানা, ২/৪৫; হাশিয়াতুদ দাসুকি, ২/৩২)
এখানে স্বামী কারো পরামর্শে তালাক দিয়েছে এবং পরে অনুশোচনা করেছে—এতে বোঝা যায় তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিন্তু মালেকি ফিকহে এই অবস্থাকে ‘চরম ক্রোধ’ (মুগলব আলা আকলিহি) হিসেবে গণ্য করতে কিছুটা জটিলতা আছে। অধিকাংশ মালেকি আলেম বলবেন, তালাক পতিত হয়েছে, কারণ সে সচেতনভাবে উচ্চারণ করেছে।

আহলে হাদিস/সালাফি মত:
তারা হাদিসের জন্যই তালাককে গুরুত্ব দেন। চরম ক্রোধে তালাক কার্যকর নয়—এ বিষয়ে তাদের মত হানাফি ও শাফিঈর কাছাকাছি। তবে তারা সাধারণত অনিচ্ছাকৃত তালাককে গণ্য করেন না যদি না উচ্চারণ স্পষ্ট ও সচেতন হয়। এখানে সচেতন উচ্চারণ আছে, তাই অধিকাংশ সালাফি আলেমের মতে তালাক পতিত হবে। (শাইখ ইবনে উসাইমিন, ফতোয়া তালাক)

সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

  • অধিকাংশ মাজহাবের কাছেই স্বামীর উচ্চারিত তালাক পতিত হয়েছে বলে গণ্য হবে, যদি না প্রমাণিত হয় যে সে একদম অচেতন বা বুদ্ধিহীন অবস্থায় ছিল।
  • যেহেতু স্বামী পরে স্মরণ করতে পেরেছে এবং “আমি এ কী করলাম” বলেছে, তাই তার সচেতনতা প্রমাণিত।
  • হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এটি এক রাজ‘ঈ তালাক। স্বামী চাইলে ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে (মৌখিকভাবে বা সংসার করায়) এবং নতুন করে বিবাহের প্রয়োজন নেই।
  • ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে স্ত্রী নিজে চাইলে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে, কিংবা স্বামী চাইলে নতুন মাহর ও বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে।

কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স:

  • সূরা আল-বাকারা (২:২২৯-২৩০) — রাজ‘ঈ তালাক ও ইদ্দতের বিধান।
  • হাদিস: “তিনটি বিষয় ঠাট্টায়ও серьёзভাবে গণ্য হয়…” (আবু দাউদ, তিরমিজি)
  • ফতোয়া হিন্দিয়া: “যদি কেউ রাগের মাথায় তালাক দেয় এবং সে জানে কী বলছে, তাহলে তালাক পতিত হয়।” (১/৩৭৩)
  • রদ্দুল মুহতার: “ক্রোধে তালাক দেওয়ার পর যদি ব্যক্তি জেনে থাকে, তাহলে তা কার্যকর।” (৩/২৪৮)

শেষ বিচার:
বাস্তব ঘটনা ও স্বামীর মানসিক অবস্থা বিচার করে স্থানীয় একজন বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। তবে সাধারণ ফতোয়া হিসেবে উপরোক্ত তথ্যই নির্ভরযোগ্য।

و الله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.