সিজদা কি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নাকি তাঁর কুদরতের প্রতি? ফরজ নামাজের আগে সুন্নাত না পড়লে কি হবে? ফজরের পর শুয়া কি সুন্নাহ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১/আমি একটা জায়গায় পড়েছিলাম,আমরা আল্লাহর উদ্দেশ্য সিজদাহ দেই,আরেকজন থেকে শুনেছি আমরা আল্লাহর কুদরতি পায়ে সরাসরি সিজদা দেই।আমাকে এই বিষয়ে ক্লিয়ার করে দিলে মুনাসিব হতো।কোনটা বিশ্বাস করলে ঈমানের ক্ষতি
হবেনা....!
২/কোথায় বের হওয়ার কারনে যদি মনে হয় নামায কাযা হবে তাহলে আগে ফরয আদায় করে(ওয়াক্তের সময়ই) বের হই,পরে যদি সময়/সুযোগ হয় তাহলে কি ফরযের আগের সুন্নাহ আদায় যাবে?মানে সুন্নাহ,তারপর ফরয এই সিরিয়াল ব্রেক করে পড়া যাবে?
৩/ফজরের ফরজ নামাযের পর শুয়া কি সুন্নাহ?
৪/সুরা আল ইমরান এর ১৯০-২০০ নাকি ১৯১-২০০ আয়াত পাঠ সুন্নাহ?(তাহাজ্জুদে উঠে)
৫/তাহাজ্জুদ নামাযে একাধিক নিয়ত করা যাবে?
৬/সালাতুল দুহা ৪রাকাত পড়া সুন্নাহ।আমি যদি একাধিক নিয়ত করে ৪রাকাত আদায় করি এটা কি সুন্নাহ বিরোধী হয়ে যাবে?
جزاك الله خيرا في الدنيا والاخره
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নের উত্তর:
নিম্নে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
১. সিজদার বিষয়ে আকিদা
আপনি যা পড়েছেন বা শুনেছেন—“আমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করি”—এটাই সঠিক আকিদা। আর যে কথা শুনেছেন “আমরা আল্লাহর কুদরতি পায়ে সরাসরি সিজদা করি”—এটি ভুল ও বিপজ্জনক আকিদা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কোনো স্থান, দেহ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অধিকারী নন। তিনি “لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ” (সূরা শূরা: ১১) অর্থাৎ তাঁর মতো কিছুই নেই। তাঁর ‘কুদরত’ তাঁর গুণ, কিন্তু তা কোনো দেহবিশিষ্ট বস্তু নয়। সুতরাং আল্লাহর ‘পা’ বা ‘কুদরতি পা’ কল্পনা করে সিজদা করা শিরক ও ইমান নষ্টকারী বিশ্বাস।
সঠিক আকিদা: আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের জন্য সিজদা করি, কোনো মাধ্যম বা দেহকল্পনা ছাড়া। (দ্র.: রদ্দুল মুহতার, ১/৪৬; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৩)
২. ফরজের আগের সুন্নাতের ক্রম ভঙ্গ করা
যদি বের হওয়ার তাড়ায় মনে হয় ফরজ কাযা হয়ে যাবে, তাহলে প্রথমে ফরজ পড়ে নেওয়া বৈধ। পরে যদি সময়/সুযোগ থাকে, তাহলে সেই ফরজের আগের সুন্নাত (যেমন ফজরের সুন্নাত) পড়া যাবে—তবে ফজরের ক্ষেত্রে সুন্নাত ফরজের আগে পড়াই উত্তম; কিন্তু বাধ্য হলে ফরজের পরেও পড়া যায়, যদি সূর্যোদয়ের পূর্বে সময় থাকে। আর যদি সূর্য উদিত হয়ে যায়, তাহলে ফজরের সুন্নাত ইশরাকের সময় ২ রাকাত নফল হিসাবে পড়ে নেওয়া যায় (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৫২)।
উপসংহার: ফরজের আগে সুন্নাত না পড়ে ফরজ পড়া জায়েজ আছে, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এ ক্রম ভঙ্গ করা মাকরুহ, যদি কোনো মানি (প্রতিবন্ধক) না থাকে।
৩. ফজরের ফরজ নামাজের পর শুয়া
হ্যাঁ, ফজরের ফরজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত ডান কাতে শুয়ে থাকা সুন্নাহ। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের নামাজের পর ডান কাতে শুয়ে থাকতেন (বুখারি, হাদিস: ১১৫৮; আবু দাউদ, হাদিস: ১৩১৪)। তবে এটি একটি মুস্তাহাব আমল, ওয়াজিব নয়।
৪. তাহাজ্জুদে সুরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাহাজ্জুদে সুরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত (১৯০-২০০) পড়তেন। হাদিসে এসেছে, তিনি রাতে উঠে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন (মুসলিম, হাদিস: ৭৬৩)। সুতরাং ১৯০ থেকে ২০০ পর্যন্ত আয়াত পড়া সুন্নাহ। কেউ ১৯১ থেকে ২০০ পড়লেও তা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত, তবে উত্তম হলো ১৯০ থেকে শুরু করা।
৫. তাহাজ্জুদ নামাজে একাধিক নিয়ত
হ্যাঁ, একাধিক নিয়ত করা জায়েজ। যেমন কেউ যদি ২ রাকাত তাহাজ্জুদের নিয়ত করে এবং সাথে ‘সালাতুল হাজত’ বা ‘শুকরানা’র নিয়তও করে, তাহলে তা সহিহ হবে এবং উভয়ের সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে তাহাজ্জুদের মূল নিয়ত বজায় রাখা উত্তম (রদ্দুল মুহতার, ২/২৯; ফাতাওয়া উসমানী, ৪/২২২)।
৬. সালাতুদ দুহা (ইশরাক) ৪ রাকাত ও একাধিক নিয়ত
সালাতুদ দুহা (চাশতের নামাজ) ২, ৪, ৬ বা ৮ রাকাত পড়া সুন্নাহ। কেউ যদি ৪ রাকাত পড়ে এবং এর সাথে অন্য কোনো নফল নামাজের (যেমন ‘সালাতুল ইশরাক’ বা ‘তাহিয়্যাতুল ওয়াক্ত’) নিয়ত করে, তাহলে তা সুন্নাহ বিরোধী নয়, বরং জায়েজ। তবে মূল নিয়ত ‘দুহার সুন্নাহ’ রাখাই উত্তম, যাতে বিশেষ সওয়াব লাভ হয় (আল-হিদায়া, ১/১৫২; শারহু মাআনিল আসার, ১/২৪৩)।
সারসংক্ষেপ:
- আকিদায় আল্লাহকে কোনো দেহ বা অঙ্গ কল্পনা করা থেকে বিরত থাকুন।
- জরুরি অবস্থায় ফরজ আগে পড়ে সুন্নাত পরে পড়তে পারবেন।
- ফজরের পর শুয়া সুন্নাহ।
- তাহাজ্জুদে সুরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পড়া সুন্নাহ।
- তাহাজ্জুদ ও দুহায় একাধিক নিয়ত জায়েজ, তবে মূল নিয়ত বজায় রাখা উত্তম।
আল্লাহই তাওফিকদাতা।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين