জন্মদিনের দাওয়াতে যাওয়া যাবে কি?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
প্রশ্ন: ১. জন্মদিন পালন করা জায়েজ নয়। কিন্তু পরিবারের কোনো ছোট বাচ্চার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে যদি আয়োজন করা হয়, এবং দাওয়াত এড়ানো সম্ভব না হয়, তাহলে কি অংশগ্রহণ করা যাবে?
২. জন্মদিনে কাউকে "উইশ" না করে শুধু দোয়া করা কি জায়েজ?
উত্তর:
জন্মদিন পালন করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি একটি বিদ‘আত (নতুন আবিষ্কৃত ধর্মীয় রীতি) এবং অমুসলিমদের অনুকরণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বা তাঁর সাহাবীরা কখনো জন্মদিন পালন করেননি। এ সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীসে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ» (متفق عليه)
অর্থ: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী ও মুসলিম) - আরও বলেছেন: «مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ» (أبو داود)
অর্থ: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আবু দাউদ)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবন বায, আলবানী, ইবন উসাইমীন ও সালিহ আল-ফাওযান সহ সকল সালাফী আলিম একমত যে জন্মদিন উদযাপন করা হারাম এবং তা বিদ‘আত।
প্রথম অংশ: বাচ্চার এক বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ
নীতিগতভাবে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়, কারণ অংশগ্রহণ করলে তা অনুষ্ঠানের বৈধতা প্রদানের মতো হয়। তবে যদি পরিবারের লোকজন এতটাই জোর করে যে, না গেলে সম্পর্কচ্ছেদ বা মারাত্মক মনোমালিন্যের আশঙ্কা হয়, তাহলে কিছু শর্তে অংশগ্রহণ করা যেতে পারে।
শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেছেন:
জন্মদিনের পার্টিতে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়, কারণ এটি একটি বিদ‘আতী উৎসব। কিন্তু যদি কেউ বাধ্য হয়ে যায় (যেমন পরিবারের চাপে) এবং না গেলে ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে তিনি উপস্থিত হতে পারেন, কিন্তু উদযাপনে অংশ নেবেন না; শুধু খাওয়া-দাওয়া শেষে চলে আসবেন এবং মৃদুভাবে নসীহত করবেন। (ফতোয়া ইবন বায, ৯/৮৭)
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন:
এ ধরনের অনুষ্ঠানে যাওয়া জায়েজ নয়। তবে যদি না গেলে পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা হয় এবং তারা এটাকে খুব গুরুত্ব দেয়, তাহলে আপনি যেতে পারেন, তবে কোনো প্রকার উৎসবে শরীক হবেন না। এবং সুযোগ পেলে দ্বীনের সঠিক বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করবেন। (আল-মুনতাকা মিন ফতোয়া আল-ফাওযান, ২/২৬৯)
সুতরাং জবাব:
আপনি যদি এই দাওয়াত এড়াতে না পারেন (অর্থাৎ বাধ্যতামূলক অবস্থায়), তাহলে নিম্নোক্ত শর্তে যেতে পারেন:
১. শুধু উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু উৎসবের অংশ হিসেবে কিছু করবেন না।
২. গান-বাজনা বা হারাম কোনো কাজ থাকলে সেখানে না বসে চলে আসবেন।
৩. মনের মধ্যে দৃঢ় ইচ্ছা রাখবেন যে এটি একটি বিদ‘আত এবং আপনি তা পছন্দ করেন না।
৪. সুযোগ পেলে মৃদুভাবে তাদেরকে ইসলামের সঠিক বিধান জানাবেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি রুখসাত (অবস্থার কারণে শিথিলতা), সাধারণ অনুমতি নয়। সুতরাং কোনোভাবেই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত।
দ্বিতীয় অংশ: জন্মদিনে “উইশ” না করে দোয়া করা
“জন্মদিনের শুভেচ্ছা” (যেমন: Happy Birthday) বলা বা এ জাতীয় বাক্য বলা হারাম, কারণ তা বিদ‘আতকে সমর্থন করার নামান্তর। কিন্তু যদি কেউ কেবল একটি সাধারণ দোয়া করে (যেমন: “আল্লাহ তোমাকে হায়াত দান করুন”, “আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত দিন”) এবং তার কাছে এই দোয়া করার উদ্দেশ্য জন্মদিন উদযাপন নয়, বরং শুধুমাত্র মঙ্গল কামনা, তাহলে কিছু আলিম তা জায়েজ বলেছেন—তবে যেহেতু দিনটির সঙ্গে দোয়া যুক্ত হওয়ার কারণে জন্মদিনকে গুরুত্ব দেয়ার মতো মনে হতে পারে, সেহেতু উত্তম হলো সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা।
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
যে ব্যক্তি জন্মদিনের দিনে কাউকে “বারাকাল্লাহু ফিকা” (আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন) বলে দোয়া করে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য জন্মদিন উদযাপন করা নয়, বরং সাধারণ দোয়া, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই। তবে উত্তম হলো বিরত থাকা, কারণ এতে জন্মদিনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার ভাব আসতে পারে। (ফতোয়া নূর আলা আদ-দারব, ১২/২৫৪)
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেছেন:
জন্মদিনের দিনে কাউকে দোয়া করাও বিদ‘আতকে সমর্থন করে বলে এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। (সিলসিলা আস-সহীহা, ২/২৩২)
সুতরাং জবাব:
যেহেতু প্রশ্নে “উইশ না করে দোয়া” বলা হয়েছে, অর্থাৎ জন্মদিনের শুভেচ্ছা বাদ দিয়ে কেবল দোয়া করা, সেটা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে—তবে যেহেতু বিষয়টি ফিতনার (বিভ্রান্তির) কারণ হতে পারে, তাই উত্তম হলো একেবারেই না করা। যদি খুবই প্রয়োজন হয়, তাহলে সাধারণ দোয়া করুন, কিন্তু “জন্মদিন” শব্দটি উল্লেখ না করে শুধু কল্যাণ কামনা করুন।
সারসংক্ষেপ:
- জন্মদিন উদযাপন করা সম্পূর্ণ হারাম।
- বাচ্চার জন্মদিনের দাওয়াত এড়ানো সম্ভব না হলে শর্তসাপেক্ষে উপস্থিত থাকা যেতে পারে, তবে উদযাপনে অংশ নেওয়া যাবে না।
- জন্মদিনের দিনে “উইশ” করা নিষিদ্ধ; শুধু দোয়া করাও মাকরূহ এবং উত্তম হলো পরিহার করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
তথ্যসূত্র:
- ফতোয়া ইবন বায, ৯/৮৭
- আল-মুনতাকা মিন ফতোয়া আল-ফাওযান, ২/২৬৯
- ফতোয়া নূর আলা আদ-দারব (ইবন উসাইমীন), ১২/২৫৪
- সিলসিলা আস-সহীহা (আলবানী), ২/২৩২
- ইসলামকিউএ (ফতোয়া নং ১০৬৪৬৮, ১০০৬২)