বদদুয়া দিতে না চাইলেও অন্তর থেকে বদদুয়া আসায় করণীয় কী
Family Life · Hanafi
Question
ওরা ঢাকায় থাকে। আমি ওকে দেখার জন্য ভাবিকে কল দিলে ভাবি ধরে না ফোন। রিপ্লাই দেয় না। বা ব্যাক করে না। আবার বলে ঘুমাচ্ছে। বা কেটে দেয় আর বলে বাবু ঘুমাচ্ছে। বা লেট করে বলে ঘুমাচ্ছে। একদিন কল দেওয়ার পর কল দিয়েছে তখন যখন বাবুকে ভাত খাওয়ানোর সময় কার্টুন দেখাচ্ছিল। ও সময় তো স্বাভাবিক যে ও কথা বলতে চাইবে না। এমন কারণে আমার খুব কষ্ট লাগে। আমাকে দেখতে দেয় না। ওর বাবা তো অফিসে থাকে তাই ওকে বেশি একটা দেখার সুযোগ হয় না।
আমার সাথে কোনো ঝগড়া বা ঝামেলা হয়নি। আমি প্রায়ই আমার ভাতিজাকে মিস করি, স্বপ্ন দেখি। ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। আমার কোনো বোন নেই, ওই প্রথম বাবু আমাদের ফ্যামিলিতে। তাই ভাবির এমন কাজে আমার খুব কষ্ট হয়, আর মনে হয় আল্লাহ তায়ালা কি বিচার করবেন না এর কোনো?
আবার ভাবি যে আমি নিজেও তো কত ভুল করি। আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে কোনো গুনাহ মাফ করবেন। কিন্তু আমার বদদুয়া দিতে ভয় করলেও মাঝে মাঝে কেমন মনে হয় আল্লাহ তায়ালা যেন এর বিচার করেন আমার পক্ষ থেকে অভিভাবক হয়ে আমার দুনিয়া ও আখিতের জন্য যেটা কল্যাণের সেটাই করেন উনার সাথে। আমার শুধু কান্না পায় আর বদদুয়া দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বদদুয়া দেওয়া তো ভালো কাজ না। আমি কি করতে পারি?
আর আল্লাহ তায়ালা তো ন্যায়বিচারক কিন্তু আমি নিজেই তো ভুলে ভরা মানুষ। আল্লাহ তায়ালার কাছে কি বিচার চাওয়া যাবে? ভয় লাগে আমি আবার বিপদে না পড়ি বা বদদুয়া দেওয়ায় জালিম না হয়ে যাই।
আবার ভাবি আল্লাহ তায়ালা কি চান আমি বার বার কল দিয়ে অপদস্ত হই, অপমানিত হই? এই যে কল ধরে না তাও বার বার দেই আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে হাদিসের কারোণে। যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। সব মিলিয়ে আমার খুব পেরেশান লাগে।
আবার মনে হয় আল্লাহ তায়ালা তো ন্যায় বিচারক তিনি হয়তো চান না আমি কষ্ট পাই। কী যে করি।
ভয় লাগে বদদুয়া দিলে যদি জালিম হই। আল্লাহ তায়ালা সহজ করুন আমার জন্য আমার কোনো ভুল হয়ে থাকলে মাফ করে দিন। আমাকে ক্বলবুন স্বালীম দান করুন, আর জালিম হওয়া থেকে রক্ষা করুন।। আমার জন্য এই পরিস্থিতিতে কী করলে আল্লাহ তায়ালা খুশি হবেন আর আমিও শান্তি পাব জানাবেন দয়া করে।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার অনুভূতি ও আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি আপনার আগ্রহের প্রশংসা করছি। আপনি আপনার ভাতিজাকে ভালোবাসেন, তাকে দেখতে চান—এটি স্বাভাবিক এবং সওয়াবের কাজ। তবে আপনার ভাবির আচরণে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন, এবং মাঝে মাঝে বদদুয়া দেওয়ার ইচ্ছা জাগছে। এটি একটি সংবেদনশীল অবস্থা। নিম্নে ইসলাম ও হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর সমাধান দেওয়া হলো।
১. বদদুয়া দেওয়া কি জায়েজ?
ইসলামে বদদুয়া (অভিশাপ বা ক্ষতি কামনা করা) সাধারণত উৎসাহিত করা হয়নি, বিশেষ করে কোনো মুসলিমের জন্য। তবে কেউ যদি সীমালঙ্ঘন করে এবং অত্যাচার করে, তবে মজলুমের জন্য আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া জায়েজ। কিন্তু সর্বোত্তম পথ হলো ক্ষমা করা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا ۖ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
“মন্দের প্রতিশোধ সমান মন্দ। তবে যে ক্ষমা করে ও সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা শূরা: ৪০)
হাদিসে এসেছে:
عَنْ جَابِرٍ رضي الله عنه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَوْلَادِكُمْ، وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَمْوَالِكُمْ، لَا تُوَافِقُوا مِنَ اللَّهِ سَاعَةً يُسْأَلُ فِيهَا عَطَاءٌ فَيَسْتَجِيبُ لَكُمْ» (صحيح مسلم: ৩০০৯)
“নিজেদের ওপর, সন্তানদের ওপর এবং সম্পদের ওপর বদদুয়া দিও না, কারণ এমন এক সময় হতে পারে যখন আল্লাহ কোনো কিছু চাইলে তা দেন এবং সে সময় তোমাদের বদদুয়া কবুল হয়ে যেতে পারে।”
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবে এসেছে:
“মজলুম ব্যক্তির জন্য অত্যাচারীর ওপর বদদুয়া করা জায়েজ, তবে উত্তম হলো তার জন্য ক্ষমা ও হেদায়েতের দুয়া করা।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২; ফাতাওয়া উসমানি, ৪/১৫২)
আপনার ক্ষেত্রে ভাবি হয়তো অজ্ঞতা বা অন্য কোনো কারণে আপনাকে সন্তান দেখতে দিচ্ছেন না। এটি নিঃসন্দেহে আপনার জন্য কষ্টকর, তবে এটাকে ‘অত্যাচার’ বলা যায় কি না তা স্পষ্ট নয়। তাই সরাসরি বদদুয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
২. আপনি কি আল্লাহর কাছে বিচার চাইতে পারেন?
আপনার ইচ্ছা যদি হয় ‘হে আল্লাহ, আপনিই ন্যায়বিচারক, আমার প্রতি যে অন্যায় করেছে তার ব্যাপারে আপনি ন্যায়বিচার করুন’—এমন দুয়া করা জায়েজ। কিন্তু মনে যদি ঘৃণা বা প্রতিহিংসা থাকে, তাহলে তা থেকে বেঁচে থাকবেন। ভালো হবে যদি আপনি এইভাবে দুয়া করেন:
“اللَّهُمَّ إِنِّي أَشْكُو إِلَيْكَ ضَعْفِي وَقِلَّةَ حِيلَتِي وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ”
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আমার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং মানুষের কাছে আমার তুচ্ছতার অভিযোগ করছি।” (সীরাতে ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত নবীজির দুয়া)
আরও বলতে পারেন:
“اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ”
“হে আসমান-জমিনের স্রষ্টা, গায়েব ও উপস্থিতের জ্ঞানী, আপনি আপনার বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করুন যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছিল।” (সূরা যুমার: ৪৬)
এভাবে বিচার চাওয়া জায়েজ এবং এতে আপনি জালিম হবেন না।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বাধ্যবাধকতা
আপনি ঠিকই বলেছেন যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। কিন্তু সম্পর্ক রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে আপনি নিজেকে অপমানিত ও কষ্টের মধ্যে ফেলবেন। আপনি যদি বিনীতভাবে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু অপরপক্ষ যদি বিনা কারণে আপনার অনুরোধ উপেক্ষা করে, তবে আপনার ওপর কোনো গুনাহ নেই।
হাদিসে এসেছে:
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنَّ الْوَاصِلَ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا (صحيح البخاري: ৫৯৯১)
“সম্পর্ক জোড়া দেওয়া ব্যক্তি সে নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সম্পর্ক জোড়া দেওয়া ব্যক্তি সে, যে সম্পর্ক ছিন্ন হলে তাকে পুনরায় জোড়ে।”
অর্থাৎ অপর পক্ষ যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবুও আপনি যদি তাদের সাথে ভালো আচরণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি ওসিল। তাই আপনি চেষ্টা করে যান, কিন্তু নিজেকে অপদস্থ বা হেয় করবেন না।
৪. আপনার করণীয় কী?
ক. ধৈর্য ধারণ করুন এবং ইখলাসের সাথে আল্লাহর কাছে দুয়া করুন:
আপনার কষ্ট আল্লাহ জানেন। তিনি ন্যায়বিচারক এবং আপনার সহনশীলতার বিনিময়ে আপনাকে পুরস্কৃত করবেন। বদদুয়া না করে আপনার ভাবি ও তার সন্তানের জন্য হেদায়েত ও কল্যাণের দুয়া করুন।
“اللَّهُمَّ اهْدِ زَوْجَةَ أَخِي وَأَصْلِحْ بَيْنَنَا، وَارْزُقْنِي صَبْرًا وَحُسْنَ الْخُلُقِ”
“হে আল্লাহ, আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে হেদায়েত দিন, আমাদের মধ্যে সংশোধন করুন এবং আমাকে ধৈর্য ও সুন্দর চরিত্র দান করুন।”
খ. যোগাযোগের পদ্ধতি পরিবর্তন করুন:
- সরাসরি ফোন না করে মেসেজ বা হোয়াটসঅ্যাপে সময় চেয়ে লিখুন।
- আপনার ভাইকে (ভাবির স্বামী) বিষয়টি নরম ভাষায় জানান—যাতে তিনি মধ্যস্থতা করেন।
- ভাতিজার জন্য উপহার পাঠান (খেলনা, কাপড়) এবং ভাবিকে বোঝান আপনি শুধু ভালোবাসায় দেখতে চান।
গ. নিজের জন্য দুয়া করুন:
আপনার মধ্যে যে ‘ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা’ আছে, তাকে পূর্ণতা দিন আল্লাহর কাছে সবকিছু সোপর্দ করে। নিজের ভুলের জন্য ইস্তিগফার করুন এবং ক্বলবুন স্বালীম (নিষ্কলুষ অন্তর) চান।
“رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ”
“হে আমাদের রব, আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে সত্যচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয় আপনিই সবচেয়ে বড় দাতা।” (সূরা আলে ইমরান: ৮)
ঘ. জালিম হওয়ার ভয় দূর করুন:
আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায়ভাবে বদদুয়া না দেন, বরং আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চান এবং নিজের কষ্টের কথা বলেন, তাহলে আপনি জালিম হবেন না। বরং মজলুমের জন্য দ্বার উন্মুক্ত। তবে উত্তম হলো দুয়া করা:
“اللَّهُمَّ إِنْ كَانَتْ نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، فَأَجْرِ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ ارْضِنِي بِهِ”
৫. সংক্ষিপ্ত উপসংহার
- বদদুয়া থেকে বিরত থাকুন; তার পরিবর্তে আপনার জন্য কল্যাণ ও ধৈর্যের দুয়া করুন।
- আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান, কিন্তু হেয় হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচান।
- আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া জায়েজ, তবে সেটা শুদ্ধ নিয়তে হতে হবে।
- আপনার কষ্ট আল্লাহ জানেন। আপনি নিজেকে জালিম ভাববেন না; বরং নিজের ভুল স্বীকার করে ইস্তিগফার করুন।
- আপনার ভাতিজার জন্য ভালোবাসা অব্যাহত রাখুন, এবং ভাবির সাথে নরম আচরণ করুন—আশা করা যায় পরিস্থিতি শোধরাবে।
আল্লাহ আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন, আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনার ভাবিকে সঠিক পথ দেখান। আমিন।
গ্রন্থপঞ্জি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৬/৪১২
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), ৪/১৫২
- বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী), অধ্যায়: আত্মীয়তার সম্পর্ক
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯
- কুরআন: সূরা শূরা: ৪০, সূরা আলে ইমরান: ৮