স্বপ্নে স্ত্রীকে বেপর্দা দেখার ব্যাখ্যা কি হতে পারে ? জানতে চাই
Family Life · Hanafi
Question
আমি একটি বিষয়ে চিন্তিত।
গত কয়েকদিন থেকে একই স্বপ্ন দেখছি।
আমার স্ত্রী হিজাব নেকাব ছাড়া নন মাহরম সামনে যায়।
স্বপ্নে আমি দেখি এ কারণে আমি তাকে শারীরিক আঘাত করি,এমন বাজে ভাবে তাকে আঘাত করি, আমি নিজে হাপিয়ে যাই এবং আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
যদিও উনি পরিপূর্ণ পর্দা করেন,আমাদের বিয়ের প্রায় দেড় বছর আমার ফ্যামিলির কোন নন মাহরাম পুরুষ তাকে দেখিনি। আমিও চাইনা আমার স্ত্রী কারো সামনে যাক।
গত রাতসহ একই স্বপ্ন প্রায় পাঁচবার দেখলাম। আল্লাহই ভালো জানেন এ ব্যাপারে তিনি কি ইঙ্গিত করছেন।
এ ব্যাপারে আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, এই স্বপ্নের কি কোন গুরুত্ব আছে?
ধন্যবাদ
Answer
উত্তর: স্বপ্নের গুরুত্ব ও শরয়ী দিকনির্দেশনা
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নকারী ভাই, আপনি যে স্বপ্নটি বারবার দেখছেন এবং এর কারণে চিন্তিত, প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী দৃষ্টিতে স্বপ্ন তিন প্রকারের হয়:
- রহমানি স্বপ্ন – যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা নির্দেশনা বহন করে।
- শয়তানি স্বপ্ন – যা শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি, অশান্তি বা মিথ্যা কল্পনা সৃষ্টির জন্য হয়।
- মানসিক কল্পনা ও দৈনন্দিন চিন্তার প্রতিফলন – যা মানুষের মনের চিন্তা ও আবেগের প্রতিছবি মাত্র।
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৭০১৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬১; মেশকাতুল মাসাবিহ, পৃষ্ঠা ১১৪)
আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
আপনার স্বপ্নের বর্ণনা থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট:
- বাস্তবে আপনার স্ত্রী সম্পূর্ণ পর্দা করেন – তাকে কোনো নন-মাহরাম দেখেনি, আপনি নিজেও তা নিশ্চিত।
- স্বপ্নে তাকে পর্দাবিহীন দেখে আপনি রাগান্বিত হন ও তাকে শারীরিক আঘাত করেন – এটি আপনার গায়রাত ও দ্বীনের প্রতি তীব্র অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
- স্বপ্নটি বারবার আসছে – যা ইঙ্গিত করে এটি হয়তো শয়তানি ওয়াসওয়াসা বা মানসিক চাপের প্রতিফলন।
হানাফি ফিকহের উসুল: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারী ফকিহগণ স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন, যদি কোনো স্বপ্নে দ্বীনের বিপরীত কিছু দেখা যায় বা স্বপ্নটি অশান্তি সৃষ্টি করে, তবে তা শয়তানের পক্ষ থেকে বলে গণ্য করা উচিত এবং এর আমল না করাই উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৪; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৭৯)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসির ‘মাআরিফুল কুরআন’-এ উল্লেখ করেন, স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা অনেক সময় তার বান্দার অন্তরস্থ অবস্থা বা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেন, তবে শর্ত হলো স্বপ্নটি যেন দ্বীনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। (মাআরিফুল কুরআন, ১/৪৯৪)
এক্ষেত্রে আপনার স্বপ্নটি বাস্তবের সম্পূর্ণ বিপরীত – আপনার স্ত্রী বাস্তবে পর্দাশীল, কিন্তু স্বপ্নে তাকে পর্দাবিহীন দেখা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে এটি একটি শয়তানি ওয়াসওয়াসা যার মাধ্যমে শয়তান আপনার অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়।
স্বপ্নের গুরুত্ব ও করণীয়
আপনার এই স্বপ্নের কোনো বাস্তব গুরুত্ব নেই। এটি শয়তানের প্ররোচনা মাত্র। কেননা:
- বাস্তবে আপনার স্ত্রী সম্পূর্ণ পর্দাশীল, তাই স্বপ্নে যা দেখছেন তা ভিত্তিহীন।
- স্বপ্নে আপনি তাকে আঘাত করছেন – এটি আপনার গায়রাত ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার অতিরিক্ত চাপের প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু কোনো শরয়ি নির্দেশনা নয়।
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলেন, যে ব্যক্তি স্বপ্নে অবৈধ বা অশোভন কিছু দেখে, তাকে তা গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে এবং এর ব্যাখ্যা চাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৭৯)
করণীয় আমল
-
শয়তান থেকে বাঁচতে সূরা নাস, সূরা ফালাক ও আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমান।
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০১৭; আল-হিদায়া, ১/৪৫) -
ঘুমানোর আগে ডান কাত হয়ে শুয়ে ‘সুবহানাল্লাহ’ (৩৩ বার), ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (৩৩ বার), ‘আল্লাহু আকবার’ (৩৪ বার) পড়ুন।
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৩১১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৭) -
স্বপ্নটি কাউকে বলবেন না – কেননা স্বপ্নের বর্ণনা দিলে শয়তানি প্রভাব বাড়তে পারে। (মুসলিম, হাদিস: ২২৬)
-
যখনই স্বপ্ন দেখবেন, তিনবার ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ুন এবং বাম দিকে থুথু ফেলুন।
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৭০৪৪; আবু দাউদ, হাদিস: ৫০১২) -
স্ত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ চালিয়ে যান – স্বপ্নের কারণে তার প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব পোষণ করবেন না। বরং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, আপনার স্ত্রী যেন সর্বদা পবিত্রতা ও পর্দায় থাকে।
-
অতিরিক্ত চিন্তা ও উদ্বেগ থেকে দূরে থাকুন – ইসলামে ওয়াসওয়াসা ও অপ্রয়োজনীয় চিন্তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (কুরআন, সূরা বাকারা: ২৮৬)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- আপনার স্বপ্নটি শয়তানি ওয়াসওয়াসা বা মানসিক চাপের প্রতিফলন – এতে কোনো গুরুত্ব নেই।
- বাস্তবে আপনার স্ত্রী পর্দাশীল, তাই স্বপ্নকে ভিত্তি করে কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।
- উপরে বর্ণিত আমলগুলো করলে আল্লাহ তাআলা শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে রক্ষা করবেন, ইনশাআল্লাহ।
রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার।