রাসুল স কে স্বপ্নে দেখলে জাহান্নাম হারাম হয়ে যায় কথাটা কতটুকু সত্য?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 2617
Questioner: Sydunnesa Mim
Question Asked: 12 Jul 2026, 09:46 PM
Reviewed & Published: 12 Jul 2026, 09:59 PM
Views: 78
Tokens: 4,731
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রাসুল স কে স্বপ্নে দেখলে জাহান্নাম হারাম হয়ে যায় কথাটা কতটুকু সত্য

Answer

প্রশ্ন:

রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে স্বপ্নে দেখলে জাহান্নাম হারাম হয়ে যায়—এই কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর:

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
রাসুল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখলে জাহান্নাম সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাওয়ার কথা কোনো authentic (সহিহ) হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। হ্যাঁ, স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখা একটি বড় নেয়ামত ও সুসংবাদ, যা ঈমানের পরিচায়ক এবং জান্নাত লাভের আশা জাগায়, কিন্তু এটি এককভাবে জাহান্নামের চিরস্থায়ী মুক্তির গ্যারান্টি নয়। কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ভর করে ঈমান, আমল ও আল্লাহর রহমতের ওপর।


বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

১. সহিহ হাদিসে কী এসেছে?
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে:

مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي؛ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِي
“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে সত্যই আমাকে দেখে; কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।”
(সহিহ বুখারি: ৬৯৯৪; সহিহ মুসলিম: ২২৬৬)

এই হাদিসে নবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখার সত্যতাশয়তানের অনুকরণের অসম্ভবতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এতে জাহান্নাম হারাম হওয়ার কোনো বক্তব্য নেই।

২. ‘জাহান্নাম হারাম’ সংক্রান্ত বর্ণনা:
কিছু বর্ণনায় এসেছে:

“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।”
“যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।”
তবে এসব বর্ণনা যয়ীফ (দুর্বল) বা গারীব হিসেবে চিহ্নিত। ইমাম বায়হাকী, ইবনে হিব্বান, হাকিম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এগুলোর সনদে সমালোচনা করেছেন। (দেখুন: মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৭/১৮৭; আল-মাকাসিদুল হাসানা, হাদিস নং ৫৬৪)

৩. হানাফি ফকিহদের মত:
হানাফি বিদ্যানরা নবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা সম্পর্কে বলেন:

  • এটি একটি বড় নেয়ামত এবং ঈমানের আলামত
  • কিন্তু এটি দ্বারা কারও জন্য জাহান্নামের চিরস্থায়ী মুক্তি নিশ্চিত হয় না। বরং কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَحِيمًا (সূরা নিসা: ১১০)
“যে কেউ মন্দ কাজ করে কিংবা নিজের ওপর জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে।”

অর্থাৎ, জান্নাত-জাহান্নাম নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছা, ঈমানের পরিণতিআমলের ওপর। হাদিসে এসেছে:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ بِعَمَلِهِ، قَالُوا: وَلَا أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللَّهُ بِرَحْمَةٍ (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৩)
“কেউ তার আমলের কারণে জান্নাতে যেতে পারে না। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও না? তিনি বললেন: আমিও না, তবে আল্লাহ আমাকে স্বীয় রহমতে ঢেকে নিলে ভিন্ন কথারক।”

৪. ফাতাওয়া ও উসুলি কিতাবের উদ্ধৃতি:

  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.) তে বলা হয়েছে: “স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখা ঈমান ও নেকী বাড়ায়, কিন্তু এটি জাহান্নামের চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.) তে উল্লেখ: “যে ব্যক্তি নবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখে, তার জন্য জান্নাতের আশা করা যেতে পারে, তবে জাহান্নামের শাস্তি চিরতরে মাফ হওয়ার কোনো গ্যারান্টি নেই।”
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: “স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখা মুমিনের জন্য সুসংবাদ, তবে এর মধ্যে কোনো ইবাদতের পরিবর্তে মুক্তির বিধান নেই।”

৫. বাংলাদেশি হানাফি উলামাগণের বক্তব্য:
মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) তার বিভিন্ন ফতোয়া ও বয়ানে বলেছেন:

“স্বপ্নে রাসুল (সা.)-কে দেখা একজন মুমিনের জন্য অনেক বড় নেয়ামত, কিন্তু এটা ভাবা ঠিক নয় যে, শুধু স্বপ্ন দেখলেই জাহান্নাম থেকে চিরতরে বাঁচা যাবে। বরং এর মাধ্যমে ঈমান ও আমলের শক্তিদান হয়।”


গুরুত্বপূর্ণ নোট:

স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখার পরও যদি কোনো ব্যক্তি পাপাচার করে এবং তাওবা না করে, তবে সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। তবে স্বপ্নটি তার জন্য একটি সতর্কতা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের ইশারা


সঠিক আকিদা:

১. নবী (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা একটি মহান নেয়ামত।
২. এটি ঈমান ও তাকওয়া বাড়ানোর মাধ্যম।
৩. জান্নাত-জাহান্নাম নির্ভর করে ঈমান, আমল এবং আল্লাহর রহমতের ওপর।
৪. কোনো ব্যক্তি শুধু স্বপ্ন দেখার কারণে জাহান্নাম থেকে চিরতরে মুক্ত হবে—এমন কথা কুরআন-সুন্নাহ বা হানাফি ফিকহের কোনো নির্ভরযোগ্য উৎসে নেই।

সুতরাং ‘জাহান্নাম হারাম হয়ে যায়’—এ বক্তব্য অতিরঞ্জিত ও ভুল। বরং স্বপ্নটি নেয়ামত ও সুসংবাদ, কিন্তু মুক্তির গ্যারান্টি নয়।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.