বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে জাকাত দেওয়া যাবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
এমন মানুষদের সাহায্যে কি জাকাতের টাকা ব্যবহার জায়েজ?
Answer
উত্তর:
বাংলাদেশের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্যে জাকাতের টাকা ব্যবহার করা জায়েজ এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা জাকাতের খাতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হন। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. জাকাতের খাত (কোরআন ও হাদিসের আলোকে)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
(سورة التوبة: 60)
"নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী, যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"
এই আটখাতের মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাধারণত নিম্নোক্ত খাতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হন:
- ফকির (فقير) – যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, কিন্তু কিছু আছে।
- মিসকিন (مسكين) – যার একেবারেই কিছু নেই বা অত্যন্ত অভাবী।
- গারিম (غارم) – ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।
- ইবনুস সাবীল (ابن السبيل) – মুসাফির বা পথিক, যে নিজের বাড়ি থেকে দূরে আটকে পড়েছে এবং কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই।
২. বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অবস্থা ও জাকাতের যোগ্যতা
বন্যার কারণে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি, সম্পদ, ফসল ও জীবিকা হারিয়েছেন। তাদের অবস্থা বিবেচনা করে হানাফি ফিকহের আলোকে বলা যায়:
ক. দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তিরা
যারা আগে থেকেই দরিদ্র ছিলেন বা বন্যার কারণে নিঃস্ব হয়েছেন, তারা ফকির/মিসকিন হিসেবে জাকাত গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত পাত্র।
(রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪; ফতোয়া উসমানি, ২/২৭৩)
খ. আগে সচ্ছল ছিল কিন্তু বন্যায় সব হারিয়েছে
এমন ব্যক্তি যদি তার নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয় এবং কাছে কোনো সম্পদ না থাকে, তাহলে তিনি ইবনুস সাবীল (মুসাফির)-এর অন্তর্ভুক্ত। হানাফি ফিকহে ইবনুস সাবীলকে জাকাত দেওয়া জায়েজ, যদিও তার নিজ দেশে সম্পদ থাকে।
(আল-হিদায়া, ১/৪৫৩; ফতোয়া আলমগিরি, ১/১৮৮)
উদাহরণ: বন্যার পানি বাড়িতে ঢুকেছে, লোকজন উঁচু ভবনে বা আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে আছে। তাদের কাছে খাবার, পানি বা নগদ টাকা নেই। তারা ইবনুস সাবীল হিসেবে জাকাত পেতে পারেন।
গ. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা
অনেকেই বন্যার কারণে জিনিসপত্র, বাড়ি মেরামত, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য ঋণ করেছেন। তারা যদি ঋণ পরিশোধে অক্ষম হন এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তাহলে গারিম হিসেবে জাকাত দেওয়া জায়েজ।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৪৪; বাহিশতি জেওর, ২/১৪)
৩. কাদের জাকাত দেওয়া যাবে না?
যারা বন্যার শিকার হলেও এখনও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক (যেমন: ব্যাংকে টাকা, জমি-জিরাত যা বিক্রি করে চাহিদা পূরণ করতে পারে), তাদের জাকাত দেওয়া জায়েজ নয়। তবে তাদের নফল সদকা দেওয়া যেতে পারে।
(রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪)
৪. জাকাত দেওয়ার পদ্ধতি
-
সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে।
-
কোনো বিশ্বস্ত সংস্থার মাধ্যমে (যারা জাকাতের অর্থ সঠিক পাত্রে পৌঁছায়) দেওয়া যাবে। সংস্থা যদি জাকাতের টাকা আলাদা করে বিতরণ করে এবং যোগ্য ব্যক্তি চিহ্নিত করে, তবে তা জায়েজ।
(ফতোয়া উসমানি, ২/২৮১) -
বন্যায় পানি, খাবার, ওষুধ, আশ্রয় ইত্যাদি দিতেও জাকাতের টাকা ব্যবহার করা যাবে, যদি তা যোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হয়। তবে জাকাতের মালিকানা (তামলিক) শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি—অর্থাৎ জিনিসটি প্রকৃতপক্ষে নিঃস্ব ব্যক্তির মালিকানায় পৌঁছাতে হবে।
(শরহু মাআনিল আসার, ২/৪৩)
৫. হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স
| বিষয় | রেফারেন্স | |------|-----------| | জাকাতের খাতসমূহ | রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪; ফতোয়া আলমগিরি, ১/১৮৮ | | ইবনুস সাবীলকে জাকাত দেওয়া | আল-হিদায়া, ১/৪৫৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৪৪ | | দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি | ফতোয়া উসমানি, ২/২৭৩-২৭৪; মাআরিফুল কুরআন, ৪/৪৮২ | | জাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য | বাহিশতি জেওর, ২/১৪-১৫ |
৬. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
➡️ বন্যাকবলিত দরিদ্র, অভাবী, ঋণগ্রস্ত ও পথহারা ব্যক্তিদের জাকাত দেওয়া জায়েজ।
➡️ এরা জাকাতের খাতসমূহের (ফকির, মিসকিন, গারিম, ইবনুস সাবীল) অন্তর্ভুক্ত।
➡️ যারা শুধু পরিস্থিতির শিকার কিন্তু নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাদের জাকাত দেওয়া যাবে না; তবে নফল দান দেওয়া যাবে।
➡️ জাকাত বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি—যেন প্রতিটি পয়সা সঠিক পাত্রে পৌঁছায়।
উত্তর: হ্যাঁ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্যে জাকাতের টাকা ব্যবহার করা জায়েজ এবং অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।