নন মাহরাম পুরুষের কাছ থেকে জোর করে দেওয়া খাবার খাওয়া যাবে কি?
Food and Drink · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নটি মূলত গায়রে মাহরাম (নন-মাহরাম) ছেলের কাছ থেকে জোরপূর্বক দেওয়া খাবার গ্রহণের প্রসঙ্গে। যেহেতু আপনি তা নিতে চাননি কিন্তু তিনি জোর করে দিয়েছেন, এখন সেই আইসক্রিমের কী করবেন, তা জানতে চেয়েছেন।
ইসলামী শরিয়তে অমাহরাম পুরুষ-নারীর মধ্যে সম্পর্ক সীমিত ও সংযত হওয়া আবশ্যক। গিফট বা উপহার দেওয়া-নেওয়া সাধারণত জায়েজ, কিন্তু যদি তাতে ফিতনার (প্রেম-প্রণয়, অন্যায় আকর্ষণ) আশঙ্কা থাকে, তবে তা হারাম বা মাকরুহ হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন একজন পক্ষ অনিচ্ছুক, অন্যজন জোর করে দেয়, তখন সেই জিনিস গ্রহণ না করাই উত্তম। কিন্তু যদি ইতিমধ্যে তিনি তা আপনার হাতে দিয়ে থাকেন এবং আপনি ফিরিয়ে দিতে পারেননি (যেমন আইসক্রিম ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়), তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
১. আইসক্রিমের ব্যাপারে করণীয়
- যেহেতু আইসক্রিম একটি ভোগ্য দ্রব্য এবং ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়, তাই আপনি তা খেতে পারবেন না নিজে, কারণ তা অমাহরামের পক্ষ থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোর করে দেওয়া (যা একটি ‘যবরদস্তি’ বা জোরপূর্বক দান) এবং এতে আপনার অন্তরে কোনো স্বাচ্ছন্দ্য নেই।
- সঠিক পদ্ধতি: আইসক্রিমটি গরিব-মিসকিন কাউকে সদকা করে দিন বা মসজিদে ফ্রিজে রেখে কারো জন্য রেখে দিন (যদি সম্ভব হয়)। অথবা পশু-পাখিকে খেতে দিন (যেমন মাটিতে বা ডাস্টবিনে না ফেলে কোথাও রেখে দিন) – তবে এটা সর্বোত্তম নয়; সদকা করাই উত্তম।
- যদি আপনি নিজে না খেয়ে অন্যদের খাওয়ান, তাহলে সেটা জায়েজ এবং এর মাধ্যমে আপনার জন্য কোনো পাপ নেই। কারণ আপনি তো নিতে চাননি।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“যদি কেউ এমন জিনিস জোর করে দেয় যা ফেরত দেওয়া অসম্ভব, তাহলে তা গ্রহণ করার পর সদকা করা জায়েজ।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫৫)
২. অমাহরামের সাথে সম্পর্ক সম্পর্কে সতর্কতা
- ভবিষ্যতে পড়ার জন্য বই নেওয়া-দেওয়ার সময় অমাহরামের সাথে সরাসরি দেখা করা বা হাতবদল করা এড়িয়ে চলুন। বই ফেরত দেওয়া বা নেওয়া মাধ্যমে (যেমন তৃতীয়জন, স্কুল/কলেজের লাইব্রেরি, ডাকযোগে) করতে পারেন।
- যদি কোনো কারণে অমাহরামের কাছে থেকে কোনো খাবার নিতেই হয়, তবে অবশ্যই মাহরাম (পিতা, ভাই, স্বামী) উপস্থিত থাকলে গ্রহণ করা যেতে পারে, অন্যথায় নেবেন না।
কুরআনের নির্দেশনা:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর যিনার নিকটবর্তী হয়ো না; নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও অতি নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩২)
অমাহরামের সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা ও খাবার গ্রহণও এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত।
হাদীস:
“নিশ্চয় কোনো পুরুষ যখন কোনো (অমাহরাম) নারীর সাথে নির্জনে থাকে, তখন তৃতীয়জন হয় শয়তান।” (তিরমিযী, হাদীস: ২১৬৫)
৩. জোর করে দেওয়া আইসক্রিম কি আপনার মালিকানা?
- ইসলামী ফিকহে জোরপূর্বক দেওয়া (ইকরাহ) কোনো বৈধ দান নয়। যদি আপনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন এবং তিনি জোর করে চলে যান, তবে সেই জিনিস আমানত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি ‘মাল’ যা আপনার হাতে এসেছে কিন্তু আপনি এর মালিক নন।
- তাই আপনি তা নিজের সম্পদে পরিণত করতে পারবেন না। সদকা করা বা অন্যকে দেওয়া এটাকে ‘মালিকানাহীন দ্রব্য’ থেকে মুক্ত করার উপায়।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর মতে:
“জোর করে দেওয়া বস্তু গ্রহণ করলেও তা মালিকানা সাব্যস্ত হয় না, বরং মালিকের পক্ষ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু যদি ফেরত দেওয়া অসম্ভব হয়, তাহলে সদকা করাই কর্তব্য।” (শরহু মা’আনিল আসার, ৩/২২৪)
সারসংক্ষেপ (সংক্ষিপ্ত উত্তর)
- আইসক্রিম নিজে খাবেন না।
- গরিব-মিসকিনকে সদকা করুন অথবা হালাল উপায়ে অন্যকে খাইয়ে দিন (যেমন মসজিদের ছোট বাচ্চা, পাড়ার ছেলেমেয়ে) – নিজে না খেয়ে।
- ভবিষ্যতে অমাহরামের কাছ থেকে কোনো জিনিস নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- বই ফেরত দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় কাজ মাহরাম বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বীনদারী ও সংযম কবুল করুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫৫
- শরহু মা’আনিল আসার, ৩/২২৪
- ফাতাওয়া উসমানী, ৪/৪৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩০২
- বেহেশতি জেওর, ২/৪৮-৪৯ (আশরাফ আলী থানভী)