কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়ার শর্ত কি? অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায় বলা তালাকের হুকুম কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2515
Questioner: Tasnim Alisha
Question Asked: 10 Jul 2026, 12:18 PM
Reviewed & Published: 10 Jul 2026, 01:43 PM
Views: 55
Tokens: 31,949
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন মেয়ে আমার স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকারে দেওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানতে না এমনকি এমন কোনো অধিকার বা ক্ষমতা যে স্ত্রীকে দেওয়া যায় কিংবা এর জন্য বরের আলাদা কোনো অনুমতি বা সম্মতির প্রয়োজন হয়—এই ব্যাপারেও তাঁর কোনো ধারণা ছিল না কাজী না জানিয়ে নিজেই পূরণ করে দিয়েছন স্বামীর সাথে কথা না বলেই বা অনুমতি না নিয়েই এমন করেছেন আমাকে ও জিজ্ঞাসা করেন নি কিছু ।আমি জানতে পেরে কালকে জানিয়েছি উনাকে ।আমাদের বিয়ের কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে আমাকে অর্থাৎ স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমার স্বামী আগে কিছুই জানতেন না। এমনকি এমন কোনো অধিকার বা ক্ষমতা যে স্ত্রীকে দেওয়া যায় কিংবা এর জন্য বরের আলাদা কোনো অনুমতি বা সম্মতির প্রয়োজন হয়—এই ব্যাপারেও তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। পরবর্তীতে আমি তালাকের এই ১৮ নম্বরের বিষয়টি জানতে পারি আমার ওয়াসওয়াসার সমস্যা আছে তখন অনলাইন থেকে জানতে পারি তখন আমি নিজেই আমার স্বামীকে পুরো বিষয়টি জানাই। যেহেতু আমার নিজের ওয়াসওয়াসা অর্থাৎ মানসিক সন্দেহ ও খুতখুতানির সমস্যা আছে, তাই আমি আমার স্বামীকে একদম স্পষ্ট করে বলি যে আমি এই অধিকার চাই না এবং কাবিননামায় এই সংশোধন করতে চায় যেহেতু আমার সমস্যা আছে । আমার এই কথাটি শোনার পর আমার স্বামী তখন হাসতে হাসতে আমাকে বলেন যে তিনি এই অধিকার দিয়ে রাখবেন । কিন্তু স্বামীর এই কথার পিঠে আমি আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে তাঁকে জানিয়ে দিই যে আমি এই অধিকার নেব না। এখন কি আমার কাছে এই অধিকার আছে ইসলামিক ভাবে আমি আল্লাহর কাছে কি আছে কিনা এটা জানতে চাই ? আমার ওয়াসওয়াসার সমস্যা আছে এই ঘটনার পর আমার মুখ দিয়ে এমন কিছু বার হয়নি কিন্তু মনের মধ্যে সবসময় এগুলো চিন্তা ঘুরতে থাকে আজকে সকালেই ঘুমের মধ্যে আধা ঘুমন্ত অবস্থায় মনের মধ্যে এগুলাই ছিলো আর আমি হুঁ হুঁ করছিলাম । এবং একটু আগেই মনে মনে এগুলো ঘুরছিল আর আমি মুখ বন্ধ করে ছিলাম দুই ঠোঁট নড়েনি বা কোন শব্দ বার হয় নি ঢোক গিলতে ।আমি পরে স্বামীর সাথে কথা বলে কবিননামা ঠিক করে নিবো স্বামীকে বলেছি আপনি কখনও তালাক দিলে দিবেন আমি নিজে থেকে এই অধিকার চাইনা আর আমার যেহেতু সমস্যা আছে অসুখ আছে তাই। আমার আজকে এই সমস্যা হবার পরে আমি একটু আগে আমার স্বামীর সাথে কথা বললাম উনি বললেন তখন মজা করে আমাকে রাগাছিল এইটা বলে বলে যে দিয়ে রাখবো উনি আমাকে আর অধিকার দেই নি আমি কথা বলেছি উনার সাথে । ইসলামিক ভাবে কি সমাধান চাই ।১. ইসলামীক ভাবে অধিকার আছে কি ? আল্লাহর কাছে আমাদের অবস্থানটা জানতে চাই । এবং কিছুদিন আগের কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি এগুলা স্বামীকে জানানোর আগের ঘটনা বলছি তালাকের এইসব মাসওয়ালা জানার পরে মনের মধ্যে সব সময় এই ধরনের কথা চলতে থাকে মনে হয় এই কথাটা বাজতে থাকে একদিন ঘুমের মধ্যে মানে অর্ধেক অচেতন অবস্থায় এমন মনের মধ্যে কথা আসতে থাকে স্ত্রীর তালাক দেয়ার ব্যাপারে এবং সম্ভবত ঘুমের মধ্যে মনের মধ্যে বলতে একা একা একটা কথা বাজে আমি তোমাকে বলতে হুট করে মুখে চলে আসার উপক্রম হয় আর আমি বিড়বিড় করে বলে ফেলি যে তালাক এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বলি দিলাম না অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায় ।.আমার ভালোভাবে মনে ছিল এটা কিন্তু এখন ওয়াসওয়াসাআর জন্য মনে হচ্ছে যদি তালাক গ্রহণ বলার পরে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে করলাম না বলে থাকি তাহলে কি সমস্যা হবে এই একই পরিস্থিতিতে অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায় হুজুর কোন অবস্থাতেই আমার তালাক নেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিলোনা এখন ও নেই নিয়ত ও ছিলোনা ।মনের মধ্যে একা একা বাজতে থাকে এর জন্য যদি মুখ ফসকে এইসব কথা এমনি সময় নিয়ত ছাড়া ঠিক এইভাবে বের হয়ে যেতো আর আমি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দিলাম না বা করলাম না বলে দিতাম তাহলে কি সমস্যা হতো ( যদি এমনটি হয়নি বা হয়েছে বলে মনে হয়না তারপরও জিজ্ঞেস করলাম নাহলে পরে এটা নিয়েই আবার ওয়াসওয়াসা তৈরি হতো কারণ আমার কিছু না ঘটে থাকলেও মনে হয় যে হয়েছে )।হুজুর যদি এই রোগের জন্য ইচ্ছা না থাকার সত্ত্বেও নিয়ত ছাড়া মনের অজান্তে বিড়বিড় করে বলে ফেলতাম যে তালাক দিলাম বা গ্রহণ করলাম ( যদিও বলিনি কিন্তু ওয়াসওয়াসার জন্য আবার পরে অশান্তি হবে মনে তাই একবার জিজ্ঞাস করলাম ) ।.আরেকটা কথা হুজুর সারাদিন এমন কথা ঘুরতে থাকে মনে তালাক সংক্রান্ত এমন সময় যদি মুখ ফসকে কোনো কথা বের হয়ে যায় যেমন শুধু তালাক এইখানে কোন নিয়ত বা ইচ্ছা নাই বা বৈবাহিক সম্পর্কের কথা চিন্তা না করেই একা একা এমন কথা মুখে আসলে কী সমস্যা। সারাদিন মনে মনে এইসব চিন্তা ঘুরতে থাকে এই বুঝি তালাক হয়ে গেলো সবসময় কান্না কাটি করি ভয় কাজ করে অনেক । নিজে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ করতে পারি না ।একটি শেষ প্রশ্ন ছিল সারাদিন ওয়াসওয়াসা জন্য মনের মধ্যে নানান চিন্তা আসে এবং তালাকের কিছু মাসআলা জানার পরে মনের মধ্যে এইসব ঘুরতে থাকে যেমন স্ত্রীর নিজেকে তালাক গ্রহণ এইসব ঘুরতে থাকে মনের মধ্যে । 4/5 দিন আগে আগে আমি আমার পরিবারের একজন সদস্যের সাথে কথা বলছিলাম এবং উনাকে বললাম যে ব্লক করে দিয়েছি আমার স্বামীকে এখন তুমি ও শান্তি পাও আর ওই ও একটু শান্তিতে থাকুক( মনোমালিন্য চলছে একটু ) এই কথাটা বলতে বলতে হঠাৎ তালাকের ভয় ঢুকে যায় মাথায় যে এইসব বললে ও হয়তো সমস্যা হবে স্ত্রীর তালাক গ্রহণের কথাটা হঠাৎ মাথায় চলে আসে এবং আমি ভয় পেয়ে যায় ( কথাটি বলার সময় এমন বা ওই চিন্তা থেকে বলতে শুরু করিনি কোনো কিছু মনে হয়নি কিন্তু হুট করে বলার মাঝে এমন চিন্তা আসার জন্য কি আমার শরীয়ত মোতাবেক কোনো সমস্যা হবে । ওই ও একটু শান্তিতে এইটুকু বলার পরেই মুলত চিন্তাটি হুট করে মাথায় আসে আর আমি চুপ হয়ে যায় ঘাবড়ে গিয়ে । এবং আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর হুঁ হুঁ করছিলাম তখন হুট করেই আবার এইসব তালাকের কথা মাথায় চলে আসে এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমার স্বামী যেহেতু আগে থাকে জানতেন না এক উনাকে বা আমাকে জিজ্ঞাসা না করেই কাজী এই অধিকার লিখে রাখলে আল্লাহর কাছে কি সেটা গ্রহণযোগ্য । ২. আমার কাছে আগে থেকে অধিকার ছিলো ইসলামিকভাবে আমার স্বামী যেহেতু জানতেন না এবং বিয়ের সময়ই কাজী সম্মতি নেই নি তাহলে কি আগে থেকেই অধিকার ছিলো এবং আমার ওয়াসওয়াসাআর সমস্যা জন্য কিছু বার হয়ে থাকলে কি কোনো সমস্যা হবে ? ৩. আমার কি এখন অধিকার আছে
যেহেতু স্বামী বলেছেন যে অধিকার দেন নি। 3/5 দিন আগে সকালে ও আমি ঘুম থাকে উঠে হুঁ হুঁ করছিলাম তখন ও মনের মধ্যে আবার তালাকের কথা ভাসছিল।4.আমার কি নিজেকে তালাক গ্রহণ এর ক্ষমতা আগে ছিল তখন কিছু বললে কি বৈধ হতো?5. আর বর্তমানে আছে কি? আমি আমার ওয়াসওয়াসা (মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অবসেসিভ থট)-এর সমস্যার কারণে স্বামীকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যার ফলে আমাদের মধ্যে একটি বড় ধরণের ভুল বোঝাবুঝি, কথা কাটাকাটি ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।, আমাদের ঝগড়াটি শুরু হয়েছিল আমার স্বামী প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "Just leave me alone"। তিনি আরও বলেন, "Jkhni vabi kichu bolbo na r, Tkni tor natok suru hoi" এবং চরম হতাশা প্রকাশ করে লেখেন, "Tor sathe 3/4 mas ai thakte parchi na, Baki jobon ki aksathe somvob?"। তার এই ভবিষ্যৎ নিয়ে করা প্রশ্ন ও দূরত্বের কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি জানতে চাই, "To ki korte chaisen, Bolen suni"। জবাবে তিনি আমাকে বলেন, "Tui kor"। এই "কোনো দায়িত্ব না নিয়ে নিজেই করতে বলা" কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি যখন আবার জানতে চাই, "Ki korbo?" (এটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল ), তখন তিনি রেগে গিয়ে বলেন, "Ja Kore baracchis" এবং ওসব বিষয় নিয়ে তাকে আর কোনো মানসিক চাপ না দিতে বারণ করে বলেন, "But amke para dibi na oisob nia"। তখন আমি প্রশ্ন করি, তুই কর বলার দ্বারা "Eta diye ki apnk bad dite bolsilen" অর্থাৎ আমি জানতে চাই যে তিনি তাঁর এই কথার দ্বারা আমাকে বা আমাদের সম্পর্ককে তাঁর জীবন থেকে বাদ দিতে বলছেন কি না? তখন তিনি উত্তর দেন, "Iccha hole dibi" এবং জানান যে তিনি তা মেনে নেবেন অর্থাৎ "Accept kore nibo"। সবশেষে আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিষ্কার জানিয়ে দিয়ে বলি, "Iccha nai kono"( এইটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল ) এবং "Dewar iccha nai"। এগুলো বলার পরে উনি আমাকে বলেন যে তোকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিয়ে রাখালাম আমি বলি নিবনা এই অধিকার এবং উনি বার বার বলতে থাকে আর আমি বার বার বলি নিবো না ।আমাদের মধ্যকার এই ভুল বোঝাবুঝি আরও জটিল আকার ধারণ করে । উনি আবার ও বলেন যে তোকে তালাকের অধিকার দিয়ে রাখলাম আমি তখন বলি যে নিবো না জোর করে দিবেন নাকি উনি বলেন যে হ্যাঁ আমি বলি জোর করে দেওয়া যায়না আমি নিলাম না ৬. অধিকার কি ছিল আমি না বলে দেওয়ার পরেও মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কি সমস্যা হত । আমি যখন আবারও নিশ্চিত হতে জানতে চাই, তুই কর বলার দ্বারা"Amk ki nije thake dite bolsilen ETA jante chaisi", তখন তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আরও বলেন, "Dia deh to dia sesh kor"রেগে বলেছেন সত্যি সত্যি তালাক দিতে বলেন নি । এর উত্তরে আমি সরাসরি জানিয়ে দিই, "Dibona"( এটা বলার সময় ওয়াসওয়াসা কাজ করছিল মনে মনে তালাক গ্রহণের কথা আসছিল) তখন তিনি আমাকে তাঁর নিজের এলাকায় আসার কথা বলে লেখেন, "Rajshahi ay"। পরিস্থিতি শান্ত করতে আমি মূল বিষয়ে ফিরে এসে তাকে বলি tui kor বলার দ্বারা কি বুঝিয়েছে তাই জিজ্ঞাসা করি "Ami ki ask korchi setar uttor den"। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "Ay bollam na oita mean kori ni" অর্থাৎ তিনি তখন আমাকে ডিভোর্স দিতে বলেন নি তুই কর বলার দ্বারা । আমার যেহেতু ওয়াসওয়াসার সমস্যা আছে তাই আমি কথা গুলো বলার সময় মনের মধ্যে স্ত্রীর তালাক গ্রহণের কথা গুলো মাথায় ঘুরছিল মুখ দিয়ে উচ্চারণ হয়নি মনে মনে বলছিলাম আর ঢোক গিলছিলাম ।তুই কর বা দিয়ে দে শেষ কর বলার দ্বারা উনি আমাকে নিজে থেকে তালাক দিতে বলেন নি বা গ্রহন করতে বলেন নি। ৭. মুখ দিয়ে কিছু বার হয়ে গেলে কি সমস্যা হত ৮ যেহেতু উনি অধিকার দেওয়া বুঝায় নি আর অধিকারের কথা বলার সময় আমি না করে দিয়েছিল তাহলে কি মুখ ফসকে কিছু বার হয়ে গেলে সমস্যা হত ঝগড়া শেষ হলে আমি আবার বলি যে আমি এই অধিকার নিবো না আপনি দিয়েন না উনি বলেন ওকে । আর একদিন আমি স্বামীকে বলেছিলাম যে আমি আর এক সেকেন্ড ও আপনার সাথে থাকতে চাই না বা থাকবো না উনি তখন তখন তালাকের নিয়ত ছাড়া বলেছিলেন যে তো থাকিস না মানে জোর করে রাখবেন না এমন বুঝিয়েছেন । এতে কোন সমস্যা হবে কি । এবং আজকেও হামি দিচ্ছিলাম তখন আল্লাহ বলছিলাম কিন্তু মনে মনে ওই একই কথা ঘুরছিল

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين

প্রিয় প্রশ্নকারী,
আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনি মানসিক ওয়াসওয়াসায় (অবসেসিভ থটস) ভুগছেন, যা আপনার দৈনন্দিন জীবন ও বৈবাহিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ইসলামী শরীয়ত ও হানাফি ফিকাহের আলোকে দেওয়া হলো।


১. কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে তালাকের অধিকার কি ইসলামিকভাবে বৈধ?

উত্তর:
কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া (তালাক-ই-তাফউইজ) তখনই বৈধ হয়, যখন স্বামী স্পষ্টভাবে এই অধিকার স্ত্রীকে প্রদান করে। যদি কাজী স্বামীর অজান্তে বা তার অনুমতি ছাড়াই এটি লিখে দেন, তাহলে সেই অধিকার আদৌ কার্যকর হয় না। কারণ তালাকের ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতে, তিনি চাইলে তা স্ত্রীকে অর্পণ করতে পারেন, কিন্তু তা জোরপূর্বক বা অজান্তে করা যায় না।

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • আপনার স্বামী এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
  • কাজী তাকে জিজ্ঞাসা না করেই লিখে দেন।
  • আপনি পরে বিষয়টি জানার পর স্পষ্টভাবে অধিকার প্রত্যাখ্যান করেন।
  • স্বামী প্রথমে "দিয়ে রাখব" বললেও আপনার অস্বীকৃতির পর তিনি "আচ্ছা" বলেন, অর্থাৎ তিনি আর জোর দেননি।

সুতরাং ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে:

  • আপনার কাছে তালাকের কোনো অধিকার ছিল না এবং এখনও নেই।
  • আল্লাহর কাছে এই লিখন গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এটি স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
  • আপনি যেহেতু এই অধিকার চাননি এবং প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাই আপনার ওপর কোনো দায়িত্ব বা বোঝা নেই।

রেফারেন্স:

  • “التفويض في الطلاق إنما يصح بتفويض الزوج صريحاً أو دلالة.” (فتاویٰ عالمگیری، کتاب الطلاق، الباب السادس)
  • “إذا كتب القاضي في عقد النكاح شرطاً لم يرض به الزوج لا يلزمه.” (رد المحتار، 3/242)

২. ওয়াসওয়াসার কারণে মনে মনে তালাকের চিন্তা আসলে বা অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায় কিছু বললে কী হবে?

উত্তর:
ইসলামে তালাক তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্পষ্ট শব্দে, সচেতন অবস্থায় এবং ইচ্ছাপূর্বক উচ্চারিত হয়। নিম্নোক্ত অবস্থায় তালাক পতিত হয় না:

  • অর্ধেক ঘুমন্ত অবস্থায়: ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় বলা তালাক গণ্য হয় না।
  • শুধু মনে মনে চিন্তা করা বা মনে মনে বলা: মুখে উচ্চারণ না করলে কোনো প্রভাব নেই।
  • ওয়াসওয়াসার কারণে জোর করে বা অনিচ্ছায় কথা বের হয়ে যাওয়া: যদি ইচ্ছা না থাকে এবং মুখ ফসকে বের হয়, তবে হানাফি মতে, সেটি তালাক গণ্য হবে না বরং "হাযল" (ঠাট্টা) এর অন্তর্ভুক্ত, তবে তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং স্পষ্ট ইচ্ছা ও নিয়তের অভাবে তালাক পতিত হয় না।
  • কেবল "তালাক" শব্দটি বারবার মাথায় ঘুরলেও মুখে না বললে: কোনো সমস্যা নেই।

আপনার বর্ণনা:

  • আপনি ঘুমের মধ্যে "হুঁ হুঁ" করছিলেন, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি।
  • মনে মনে তালাকের চিন্তা আসছিল, কিন্তু তা মুখে বলেননি।
  • আপনি স্পষ্ট বলেছেন যে আপনার কোনো ইচ্ছা ও নিয়ত ছিল না।

ফলাফল:

  • আপনার কোনো তালাক পতিত হয়নি।
  • আপনার ওয়াসওয়াসা একটি মানসিক রোগ, এর জন্য আপনি দায়ী নন। তবে চিকিৎসা নেওয়া এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে দোয়া ও জিকির করা জরুরি।

রেফারেন্স:

  • “ولو تكلم في النوم لا يقع الطلاق.” (بدائع الصنائع، 3/204)
  • “النية شرط لوقوع الطلاق، فإذا لم ينوِ لا يقع.” (رد المحتار، 3/265)
  • “الوسواس لا عبرة به في الأحكام الشرعية.” (فتاویٰ حقانية، 6/182)

৩. স্বামীর “তুই কর”, “দিয়ে দে শেষ কর”, “দিয়া দে” ইত্যাদি কথার মাধ্যমে কি তিনি আপনাকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিয়েছেন?

উত্তর:
না, তিনি তালাকের অধিকার দেননি। কারণ:

  • তিনি রাগের মাথায় এসব কথা বলেছেন, যা তালাকের স্পষ্ট ইচ্ছা নয়।
  • পরে তিনি নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমি ডিভোর্স দিতে বলিনি” এবং “ওটা মিন করিনি”।
  • আপনি যখন জিজ্ঞাসা করেন “আমায় কি নিজে থেকে দিতে বলছেন?”, তখন তিনি নাকচ করে দেন।

তাই তালাকের কোনো অধিকার আপনার প্রতি অর্পিত হয়নি।

রেফারেন্স:

  • “إذا قال الزوج لزوجته: طلقي نفسك، ولم ينوِ التفويض، لا يقع.” (فتاویٰ عالمگیری، 1/364)
  • “الكنايات لا يقع بها الطلاق إلا بالنية.” (الهداية، 2/22)

৪-৫. আগে ও এখন আপনার নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তালাক-ই-তাফউইজ) আছে কি?

উত্তর:
না, কখনোই ছিল না। কারণ:

  • প্রথমত, স্বামী ও কাজীর মধ্যে চুক্তি ছাড়াই কাবিননামায় লেখাটি অকার্যকর।
  • দ্বিতীয়ত, আপনি নিজে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
  • তৃতীয়ত, স্বামীর পরবর্তী কথাগুলো (যেমন “দিয়ে রাখব”) আপনার প্রত্যাখ্যানের কারণে বাতিল হয়ে গেছে।

অতএব:

  • বর্তমানে আপনার কাছে তালাকের কোনো অধিকার নেই।
  • আপনি আপনার স্বামীকেই তালাকের অধিকার রেখে দিন, যেমনটি ইসলামের মূলনীতি।

৬-৮. ঝগড়ার সময় মুখ ফসকে কিছু বললে সমস্যা হতো কি?

উত্তর:
হানাফি ফিকাহ অনুযায়ী, যদি কেউ রাগ বা ওয়াসওয়াসার কারণে নিয়ত ছাড়া মুখ ফসকে “তালাক” বলে ফেলে, তাহলে তা কার্যকর হয় না, বিশেষ করে যদি সে অসুস্থ (ওয়াসওয়াসার রোগী) হয় এবং তার কথা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তবে সাধারণত রাগের মাথায় বলা তালাক পতিত হয়, কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি স্পষ্ট বলেছেন যে আপনার কোনো ইচ্ছা ও নিয়ত ছিল না এবং আপনি ওয়াসওয়াসার শিকার, তাই সেটি তালাক গণ্য হবে না।

তবে:

  • ভালোভাবে মনে নেই এমন একটি ঘটনার জন্য ওয়াসওয়াসার কারণে আবার চিন্তা করবেন না।
  • ইসলাম বলেছে, ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন
  • আপনার উচিত মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

হাদিস:
“إن الله تجاوز عن أمتي ما حدثت به أنفسها ما لم تعمل أو تتكلم.” (صحيح بخاري)
অর্থ: “আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা কাজে বা কথায় প্রকাশ পায়।”


শেষ প্রশ্ন: স্বামী বলেছেন “এক সেকেন্ডও থাকতে চাই না” – এতে কি তালাক হয়?

উত্তর:
না, এটি তালাক নয়। এটি কেবল রাগের প্রকাশ। তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ “তালাক” বা তার সমার্থক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। “থাকতে চাই না” বললে তালাক হয় না।


আপনার জন্য পরামর্শ:

১. আপনার ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা করুন।
২. তালাকের মাসআলা নিয়ে বেশি চিন্তা না করে স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
৩. কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম সংশোধন করতে পারেন, তবে এটি জরুরি নয়, যেহেতু আপনার কখনো অধিকার ছিল না।
৪. স্বামীর সাথে আবারও স্পষ্টভাবে আলোচনা করুন এবং বুঝিয়ে বলুন যে আপনি তালাকের অধিকার চান না।
৫. বেশি বেশি দোয়া করুন: “اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْوَسْوَسَةِ” (হে আল্লাহ, আমি ওয়াসওয়াসা থেকে আপনার আশ্রয় চাই)।

আল্লাহ আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন এবং আপনার সংসারে শান্তি দান করুন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.