হানাফি মতে ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা।

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 2487
Questioner: Champa0395
Question Asked: 09 Jul 2026, 07:41 PM
Reviewed & Published: 09 Jul 2026, 07:48 PM
Views: 22
Tokens: 5,041
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস-সালামু আলাইকুম।
আমার স্বাভাবিক কোন কিছু হলে
আমি অনেক টেনশন করি যেমন হাতে একটা গোটা উঠলে অনেক টেনশন করি বার বার চেক করি কোথাও কোনো কিছু না হলে শরীলে ভাবি কিছু হলো নাকি হাত দিয়ে বার বার চেক করি ভয়ে হাত পাও কাপে মানে সামন্য হালকা অসুস্থ হলে ভয় পাই হায় বড় কোনো রোগ হবে না তো মানে অনেক ভয় পাই বার বার চেক করি নানান বিষয় এটা কি ওয়ওয়াস।
আলহামদুলিল্লাহ আমি সব সময় সুস্থ থাকি।
যদি ওসওয়াসা হই তাহলে কি ভাবে বাচতে পারি।

আর মৃত্যুর সময় তো নির্ধারিত তাই না।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যে ধরনের উদ্বেগ, বারবার চেক করা, সামান্য শারীরিক পরিবর্তন (যেমন হাতে গোটা ওঠা) নিয়ে অতিরিক্ত ভয় এবং রোগ-ব্যাধির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন—এটি স্পষ্টতই ওয়াসওয়াসা (وسوسہ) বা মনের অবৈধ কুমন্ত্রণা। শাইতানের পক্ষ থেকে এসব চিন্তা এসে থাকে, যা মুমিনের ইমান ও মানসিক শান্তি নষ্ট করতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ
"সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে লুকিয়ে থাকে।" (সূরা আন-নাস: ৪)

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

ذَاكَ الْإِيمَانُ
(এটি [ওয়াসওয়াসা] ইমানেরই নিদর্শন) [সহীহ মুসলিম: ১৩২]

অর্থাৎ, শাইতান তখনই এসব কুমন্ত্রণা দেয়, যখন ব্যক্তির অন্তরে ইমানের আলো থাকে। তাই হতাশ না হয়ে বরং এটা থেকে বাঁচার পথ জানা জরুরি।


ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার ইসলামি পদ্ধতি

১. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া
ওয়াসওয়াসার মূল চিকিৎসা হলো একে একেবারেই পাত্তা না দেওয়া। আপনি যেসব বিষয়ে বারবার চেক (হাত-পা, চামড়া ইত্যাদি) করেন, সেসব ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দিন। প্রথমে কষ্ট হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে শাইতান হতাশ হয়ে চলে যাবে। হানাফি ফিকাহর ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন:

مَنْ تَوَسْوَسَ فِي شَيْءٍ فَلْيُعْرِضْ عَنْهُ وَلاَ يَلْتَفِتْ إِلَيْهِ
"যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়, সে যেন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৪২৮)

২. আ‘উযুবিল্লাহ পড়া
ওয়াসওয়াসা আসার সাথে সাথে বলুন: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ (আমি আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত শাইতান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি)। অতঃপর সূরা আন-নাস ও সূরা আল-ফালাক পড়া অভ্যাস করুন।

৩. মৃত্যুর সময় নির্ধারিত—এই বিশ্বাস দৃঢ় করা
আপনি লিখেছেন, "মৃত্যুর সময় তো নির্ধারিত তাই না।" হ্যাঁ, অবশ্যই। আল্লাহ বলেন:

وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلًا
"আর কোনো প্রাণের মৃত্যু হয় না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া, যা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী লিখিত রয়েছে।" (সূরা আলে ইমরান: ৩/১৪৫)

সুতরাং একটি ছোট অসুখ থেকে বড় রোগ হবে এ ভয় করাটা শাইতানের প্রতারণা। আপনি বর্তমানে আলহামদুলিল্লাহ সব সময় সুস্থ থাকেন—এটাই বাস্তবতা। অতীতের কোনো ছিলে না তার জন্য শুকরিয়া আদায় করুন।

৪. জিকির ও দোয়া বেশি করা
নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার জিকির (যেমন: بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ) পড়লে মানসিক প্রশান্তি আসবে। হাদীসে এসেছে:

مَنْ قَالَ حِينَ يُمْسِي وَحِينَ يُصْبِحُ: بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَمْ يَضُرَّهُ شَيْءٌ
"যে ব্যক্তি সন্ধ্যা ও সকালে তিনবার এই দু‘আ পড়ে, তাকে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না।" (আবু দাউদ: ৫০৮৮, তিরমিযী: ৩৩৮৮)

৫. চিন্তাভাবনা এবং চেক করার অভ্যাস বন্ধ করার কৌশল

  • যখনই হাত বা শরীর চেক করতে ইচ্ছে করবে, নিজেকে বলুন: "এটা শাইতানের কাজ, আমি করবো না।"
  • অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিন (ইবাদত, পড়াশোনা, পরিবারের সাথে সময়) যাতে ফাঁকা সময় না থাকে।
  • মনে রাখবেন, এটা কোনো বাস্তব রোগ নয়; এটি মানসিক বিভ্রম। তাই নিজেকে বুঝান: "আমি সুস্থ, শুধু শাইতান অস্থির করছে।"

হানাফি ফিকাহ ও উলামাদের মতামত

  • হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো বিপরীত কাজ করা—যেমন হাতে গোটা উঠলে বারবার চেক না করে বরং অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকা। একে ‘ইজতিহাদ ফি মুকাবালাতিল ওয়াসওয়াসা’ বলে।" (বেহেশতী জেওর: ১/৬৯)

  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার তাফসীর মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা আন-নাসের ব্যাখ্যায় বলেন: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং শাইতানের কুমন্ত্রণাকে তুচ্ছ মনে করা।

  • মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন: ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা হলো, নিজের সন্দেহ ও ভয়কে কখনোই ব্যবহারিক জীবনে স্থান না দেওয়া। (ফতোয়া উসমানী: ১/৫৬২)

  • ইমাম ত্বাহাবী (রহ.) শারহু মাআনিল আসার-এ উল্লেখ করেন: সাহাবায়ে কিরাম যখন ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে বলতেন এবং গভীর চিন্তা না করতে নির্দেশ দিতেন। (শারহু মাআনিল আসার: ৪/২৪৩)


আপনার জন্য বিশেষ দোয়া

আপনি সব সময় সুস্থ থাকেন—এ জন্য আলহামদুলিল্লাহ। সুতরাং প্রকৃত কোনো সমস্যা নেই, শুধু মনের অতিরিক্ত উদ্বেগ আছে। এটি শারীরিক নয়, বরং শাইতানি কুমন্ত্রণা। আপনি যতই এ বিষয়ে চিন্তা করবেন, ততই বাড়বে। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করে ‘ইস্তিগফার’ ও ‘দরুদ শরীফ’ বেশি পড়ুন। মনে রাখবেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য ধারাবাহিকভাবে উপরের নিয়মগুলো কমপক্ষে ২১ দিন মেনে চলার চেষ্টা করুন। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনাকে পূর্ণ শান্তি দেবেন।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসার অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.