ডিবোর্স পরবর্তী জীবনের দিকনির্দেশনা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট ও মনঃপীড়া আমি সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারছি।离婚ের পর এই মানসিক অবস্থা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু ইসলাম এ ক্ষেত্রে আপনাকে ধৈর্য ও প্রশান্তির পথ দেখায়। নিচে কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো।
১. আপনার বর্তমান অবস্থা ও মানসিক কষ্টের বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ
-
ধৈর্য ও শুকরিয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফলফসলের ক্ষতি দিয়ে। আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)আপনার বর্তমান অবস্থা একটি বড় পরীক্ষা। আপনি সারাদিন ইস্তিগফার করছেন, এটি খুবই উত্তম। তবে মন বসছে না? এটা স্বাভাবিক। ধৈর্য ধরে আমল চালিয়ে যান। ইস্তিগফার ও দোয়া অব্যাহত রাখুন।
-
প্রাক্তন স্বামীর কথা বারবার মনে আসা: এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আপনি যত বেশি এ নিয়ে চিন্তা করবেন, কষ্ট তত বাড়বে। নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। কুরআন তেলাওয়াত, নফল ইবাদত, এবং পরিবার-বন্ধুদের সাথে সময় কাটান।
-
ঘুম না হওয়া, খেতে না পারা: এটি ডিভোর্স-পরবর্তী বিষণ্ণতার লক্ষণ। শরীয়ত আপনাকে এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অনুমতি দেয়। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা জরুরি। প্রয়োজনে সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
২. যারা আপনার সংসার ভাঙার জন্য কলকাঠি নেড়েছে—আল্লাহ কি তাদের বিচার করবেন?
অবশ্যই করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর যে কেউ মন্দ কাজ করে বা নিজের প্রতি জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু পায়।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১১০)
তবে অন্যদের কু-পরামর্শ যারা দিয়েছে, তারা জালিম। আল্লাহ তাদের বিচার করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যদি কেউ অন্য মুসলিমের ক্ষতি করে, তবে আল্লাহ তার ক্ষতি করেন। আর যদি কেউ অন্যকে ফাঁদে ফেলে, তবে আল্লাহ তাকে ফাঁদে ফেলেন।” (আবু দাউদ, তিরমিযী)
সুতরাং আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। তাদের অন্যায়ের জন্য তাদেরকে দুনিয়াতেও এবং আখিরাতেও জবাবদিহি করতে হবে। তবে আপনার উচিত তাদের ক্ষমা করে দেওয়া, যাতে আপনার মন শান্ত হয় এবং আপনি এগিয়ে যেতে পারেন। (কুরআন ২৪:২২)
৩. ডিভোর্সের পর করণীয় সম্পর্কে হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
-
ইদ্দত পালন: আপনার ইদ্দত এখনও শেষ হয়নি (ডিভোর্সের ২ দিন কম ১ মাস, অর্থাৎ ইদ্দত ৩ মাসের মধ্যে)। এই সময়ে আপনি নিজের ইবাদতে মন দিন, বেশি বেশি দোয়া করুন এবং তাওবা-ইস্তিগফার করুন।
-
নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা না করা: চারপাশে অন্য সুখী সংসার দেখে হতাশ হবেন না। প্রতিটি মানুষের রিযিক ও ভাগ্য ভিন্ন। আল্লাহ বলেন, “আমি তাদের মধ্যে দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দিয়েছি।” (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩:৩২)
-
ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা: ডিভোর্স একটি সমাধান, শেষ নয়। অনেক সাহাবী ও সাহাবিয়ার জীবনেও ডিভোর্স হয়েছে। পরে তারা আরও ভালো জীবন পেয়েছেন। আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। দ্বীনের উপর স্থির থাকুন।
৪. কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ
-
রাতের নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ): বিশেষ করে শেষ রাতে উঠে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে আপনার পস্তাবনা জানান। তাহাজ্জুদ কঠিন সময়ে অসাধারণ প্রশান্তি আনে।
-
কুরআন তেলাওয়াত ও তাফসীর: সূরা ইউসুফ, সূরা মারিয়াম, সূরা দুখান—এসব সূরা পড়ুন। কষ্টের সময় এগুলো মনকে শক্ত করে।
-
গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকুন: নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। নতুন কিছু শিখুন। পরিবার ও বান্ধবীদের সাথে মেলামেশা করুন।
-
চিকিৎসা নিন: আপনার ঘুম না হওয়া, না খেতে পারা—এগুলি গুরুতর। একজন ভালো ডাক্তার বা মনোবিদের সাথে দেখা করুন। ইসলামে চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
-
দুআ: বলেন, “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবান্নার।” আর কাছে ডাকে—“ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, ছাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনিকা।”
৫. শেষ কথা
আপনার এই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা পাগল হওয়ার ভয় کاملاً শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহ কখনো বান্দাকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না। (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)
আপনার ইদ্দত শেষ হলে—ইনশাআল্লাহ—একটি ভালো পরিবারে পুনরায় বিবাহের সুযোগ তৈরি হবে। হতাশ হবেন না। আপনার মূল্যবান জীবন শেষ হয়ে যায়নি। আল্লাহ সেই ব্যক্তির জন্য উত্তম প্রতিদান দেবেন যে ধৈর্য ধরে।
বিশেষ দোয়া:
হে আল্লাহ! এই বোনের মনকে প্রশান্তি দান করুন। তাকে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা দান করুন। যারা তার সংসার ভাঙার কারণ হয়েছে, তাদেরকে ন্যায়বিচার দিয়ে আপনি সুবিচার করুন। তার ভবিষ্যৎ জীবন আপনার রহমতে সুন্দর করে দিন। আমীন।
হানাফী কিতাবের উল্লেখ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ডিভোর্স ও ইদ্দতের বিধান।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ডিভোর্স ও পরবর্তী জীবন ব্যবস্থাপনা।
- বাহিশতী জেওর (হাকীমুল উম্মত থানভী রহ): ডিভোর্স পরবর্তী মানসিক দিকনির্দেশনা।