হারাম সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার উপায়
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি এক হারাম সম্পর্কে গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়েছি, এমন একজনের সাথে যিনি বিবাহিত। উনার রুকাইয়াহ জনিত ভয়াবহ সমস্যার কথা জানাতে প্রথম আমাদের কথা হয়। সমস্যার কথা শুনতে শুনতে আমার তার প্রতি ভীষণ মায়া জন্মে। প্রথমে আমি জানতাম না যে তিনি বিবাহিত। পরে ব্যাপারটা জানতে পারি এবং এটাও জানি যে উনার স্ত্রীর সাথে উনার সম্পর্ক খুব বাজে ও তার সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কম। এবং উনার দ্বিতীয় বিয়ে করা উনার চরিত্র হেফাজতের জন্য খুব বেশি জরুরি। প্রথমে নিয়ত ছিল পরিপূর্ণ বিয়ে। কিন্তু দুই পরিবার চালানোর সামর্থ্য না থাকায় তিনি এখন পর্যন্ত আমার বাসায় জানাতে পারেননি। এভাবে হারামটা আসলে জেঁকে বসেছে যা আমি টের পেয়েও কিছু করতে পারিনি। অনেকবার ব্যাপার টা থেকে ডের হতে চেয়েছি। মনে হয়েছে অন্য কোথাও যথি বিয়ে হয়ে যেত, তাহলে হয়তো সমাধান হতো। কিন্তু আমি মেধাবী হওয়ায় আমার পরিবার আমাকে চাকরি করাতে চায়। প্রথমে আমি বিয়ের জন্য জুরাজুরি করলেও দেখি যারাই বিয়ের জন্য আসে তারা মেয়ের চাকরি চায় বা পিতার অনেক সম্পদ চায়। নয় যারা আসে তারা একদম অশিক্ষিত থাকে যাদের সাথে আমার একদমই বনিবনা হওয়া সম্ভব না।
এভাবে আমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। এখন জানলাম যে তার স্ত্রীর এ মাসে বাচ্চা হবে। এ কথা শোনার পর আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। আমি জানি না, এমন একটা মানুষের কথা কিভাবে পরিবার কে বলবো, যার সন্তান আছে, স্ত্রী আছে, অসুস্থতা অনেক অনেক এবং যে আর্থিক ভাবে দুজনকে চালাতে সক্ষম নয়। তিনি আমাকে বলতেছেন, গোপনে বিয়ে করার কথা যা আমার পক্ষে একদম সম্ভব নয়, আবার পরিবারকে বললে কেটে ভাসিয়ে দিবে তাও রাজি হবে না। তারা শুনলে কষ্টেই মরে যাবে। আমি ব্যাপারটা থেকে বের হতে চাইলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং উনার অবস্থা খুব বাজে হয়ে গেছে। আমি এভাবে কোনো সংসারে যেতে চাই না, যদিও আমি জানি, দুজন স্ত্রী তার জন্য ফরজের মতো হয়ে গেছে। অন্তত আমি যদি শক্ত হতে পারতাম।
আমি কিছু বুঝতেছি না। আমি সব হারিয়ে ফেলেছি, আমি আল্লাহ থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। আমি কোথাও শান্তি পাচ্ছি না, আমি কি করব বুঝতেছি না। আমি কি করব? আমি উনাকে ছাড়া অন্য কোথাও বিয়ে করেও শান্তি পাবো বলে মনে হচ্ছে না, আর তার কাছে গেলেও শান্তি পাবো না। আমি আমার নিজেকে শুধু হিফাজত করতে চেয়েছিলাম, উল্টো আমি আমার নিজের সব হাযিয়ে ফেললাম।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আমি আপনার মনের কষ্ট ও দ্বিধা বুঝতে পেরেছি। আল্লাহর দরবারে আপনি যে অসহায় বোধ করছেন, তা খুবই স্বাভাবিক। তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা আত-তালাক, ২-৩)
আপনি এখন যে পরিস্থিতিতে আছেন, তা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং হারাম সম্পর্ক পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করছি:
১. বর্তমান সম্পর্কের শর‘ঈ বিধান
-
হারাম সম্পর্ক: যে কোনো অবৈধ সম্পর্ক (বিবাহ বহির্ভূত) ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। এটি কেবল শারীরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আবেগ, মায়া, গোপন দেখা-সাক্ষাৎ, টেক্সটিং—সবই হারামের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“চোখের জিনা হলো তাকানো, কানের জিনা হলো শোনা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো হারামের দিকে হাঁটা এবং অন্তর কামনা করে ও চায়, আর যৌনাঙ্গ তা সত্যায়িত করে বা মিথ্যা প্রমাণ করে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৫৭)
আপনি যে “মায়া” ও “ভালোবাসা” অনুভব করছেন, তা অন্তরের জিনা। তাই অবিলম্বে এই সম্পর্কের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করা ফরজ। -
তার স্ত্রী গর্ভবতী: আপনি জানতে পেরেছেন যে তার স্ত্রী গর্ভবতী। এটি একটি বড় নিয়ামত ও দায়িত্ব। তার জন্য দ্বিতীয় বিবাহের কোনো জরুরি প্রয়োজন এখন নেই (যদি স্ত্রী তার চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়)। আপনার প্রতি তার দুর্বলতাগুলো আসলে শয়তানের প্ররোচনা, ইসলামী সমাধান নয়।
২. বিবাহের বিষয়টি
- তার সাথে বিবাহ: ইসলামে পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ জায়েজ, তবে শর্ত হলো ন্যায্য আচরণ ও ভরণ-পোষণ। তিনি নিজেই স্বীকার করছেন যে দুজনের ভরণ-পোষণ সামর্থ্য নেই। সুতরাং তার জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা হারাম না হলেও অত্যন্ত কঠিন এবং ফরজ নয়। আপনি বলেন “দুজন স্ত্রী তার জন্য ফরজের মতো হয়ে গেছে”—এটি ভুল ধারণা। ফরজ তো কেবল আল্লাহর আদেশ, এখানে কোনো ফরজ নেই।
- গোপন বিবাহ: ইসলামে বিবাহের জন্য অভিভাবকের অনুমতি এবং দু’জন সাক্ষী জরুরি। গোপনে বিবাহ করা ঠিক হবে না।
- পরিবারের আপত্তি: আপনি যদি তার সাথে বিবাহ করতে চান, তাহলে তা বৈধ পদ্ধতিতে, আপনার অভিভাবকের মাধ্যমে করতে হবে। কিন্তু তিনি যদি দ্বিতীয় স্ত্রী রাখার মতো সামর্থ্য না রাখেন, তাহলে এই বিবাহ বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অধিকন্তু, আপনার পরিবার যদি চাকরি ও সম্পদ নিয়ে শর্ত দেয়, তবে সেটিও অন্যায়। আপনি দো‘আ করুন এবং উপযুক্ত দ্বীনদার পাত্র খুঁজুন যারা সম্পদ বা চাকরি চায় না।
৩. তার অসুস্থতা ও মানসিক চাপ
- আপনি যখন সম্পর্ক থেকে সরে আসতে চান, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটি একটি আবেগজনিত হেরফের। ইসলামে কাউকে নিজের আবেগের দড়িতে বেঁধে রাখা জায়েজ নয়। আপনার কর্তব্য হলো আল্লাহর ভয়ে দৃঢ়ভাবে সরে আসা। তার অসুস্থতার দায়িত্ব আপনার নয়, বরং তার নিজের তাওবার ওপর নির্ভর করে।
- আপনি যদি ফিরে যান, তবে এই পাপ চলতেই থাকবে এবং আপনার উভয়ের আখিরাত ধ্বংস হবে।
৪. করণীয় (প্র্যাকটিক্যাল স্টেপ)
-
তাওবা ও ইস্তিগফার:
- এখনই নামাজে দাঁড়িয়ে দু’ রাকাত সালাতুত তাওবা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চান।
- দৃঢ় সংকল্প করুন যে, এই সম্পর্ক আর কখনো করবেন না।
- ইস্তিগফার বেশি পড়ুন: “আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিন ওয়া আতুবু ইলাইহি”
-
সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করুন:
- তার ফোন নম্বর, সোশ্যাল মিডিয়া সব ব্লক করে দিন।
- কোনো অজুহাতে আর কথা বলবেন না। তিনি অসুস্থ হলেও নিজেকে দোষী মনে করবেন না—এটা শয়তানের কুমন্ত্রণা।
-
নিজেকে শক্তিশালী করুন:
- নামাজের প্রতি যত্নবান হোন, কুরআন তিলাওয়াত করুন, নফল ইবাদত বাড়ান।
- আপনার পড়াশোনা ও চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যান—এতে আপনার আত্মসম্মান বাড়বে এবং অপেক্ষায় থাকা ভালো পাত্র খোঁজা সহজ হবে।
-
পরিবারের সঙ্গে আলোচনা:
- আপনি এখন পর্যন্ত কোনো পাপের কথা পরিবারকে বলবেন না (গোপন রাখা ভালো)। তবে বিয়ের জন্য আপনার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন।
- পরিবারকে বোঝান যে, আপনি সাদাসিধে, দ্বীনদার পাত্র চান, যিনি সম্পদ বা চাকরি চান না। তাদের জন্য দো‘আ করুন যেন তারা আপনার পছন্দ বুঝতে পারেন।
-
মনোবল:
- আপনি ধ্বংস হয়ে যাননি। আপনি এখনো সময় থাকতে সাবধান হচ্ছেন। আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
“বলো, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না।” (সূরা আয-যুমার, ৫৩)
- আপনি ধ্বংস হয়ে যাননি। আপনি এখনো সময় থাকতে সাবধান হচ্ছেন। আল্লাহ বলেন:
উপসংহার
আপনি এখনও সময় থাকতে সঠিক পথে আসতে পারেন। আপনার শান্তি কেবল আল্লাহর আনুগত্যেই। এই ব্যক্তি আপনার জন্য নয়, বরং আপনার জন্য রয়েছে উত্তম দ্বীনদার পাত্র। আল্লাহ আপনাকে শক্তি দিন। আপনি একা নন—আল্লাহ আছেন।
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
“হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করো না।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২৮৬)
আমিন।