জালেমের প্রতি বদ দুআ করা সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি অত্যাচারিত হয়েছেন এবং আপনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বাক্যে দু‘আ করে আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চেয়েছেন। ইসলামী শরী‘আতে মজলুমের দু‘আ কবুল হয়, তবে সে দু‘আতে অবশ্যই শরী‘আতের সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। আপনি যে দু‘আ করেছেন তার কিছু অংশ শরী‘আতসম্মত, আবার কিছু অংশে বাড়াবাড়ি (যুলুম) হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. সাধারণ নীতি: মজলুমের দু‘আ জায়েজ, তবে সীমারেখা মেনে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ»
“মজলুমের দু‘আ থেকে বাঁচো, কেননা তার দু‘আ ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।” (সহীহ বুখারী: ১৪৯৭; সহীহ মুসলিম: ৪৮)
তবে এই দু‘আও যুলুমের পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا ۖ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ»
“আর মন্দের প্রতিফল তার অনুরূপ মন্দ; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।” (সূরা আশ-শূরা: ৪০)
অন্য আয়াতে:
«فَمَنِ اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ»
“তোমাদের প্রতি কেউ বাড়াবাড়ি করলে তোমরাও তার প্রতি তদ্রূপ বাড়াবাড়ি করতে পারো।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৯৪)
এখানে ‘মিসল’ (অনুরূপ) শব্দটি স্পষ্ট। তাই নিজের উপর যত অন্যায় হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট কামনা করা জায়েজ নয়। কারণ সেটি নতুন যুলুমের শামিল।
২. আপনি যা বলেছেন তার বিশ্লেষণ
(ক) জায়েজ অংশ:
- “যা করেছ তা যেন কয়েশত গুণ হয়ে ফিরে আসে” – এখানে ‘কয়েশত গুণ’ (অনেক গুণ) বলা অতিরঞ্জিত, বরং ‘মিসল’ বা ‘অনুরূপ’ বলাই কর্তব্য। তবে মজলুমের দু‘আয় আল্লাহ নিজেই হয়তো বহুগুণে প্রতিশোধ নিতে পারেন, কিন্তু কামনা করা উচিত মাত্রার মধ্যে।
- “আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না” – এটি একটি মাকবূল বাক্য, এতে দোষ নেই।
- “আমার প্রতিশোধ আমি সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দিলাম” – এটি খুবই উত্তম। কুরআনে নির্দেশ আছে:
«وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ ۖ وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ»
“আর যদি তোমরা শাস্তি দাও, তবে তোমাদেরকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে তার অনুরূপ শাস্তি দাও। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো, তবে ধৈর্যশীলদের জন্য তা উত্তম।” (সূরা আন-নাহল: ১২৬)
(খ) সমস্যাজনক অংশ:
- “ঐ হাত ও জবান ও মানুষদের যেন আল্লাহ ধ্বংস করেন” – একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ বা ব্যক্তির জন্য ধ্বংস কামনা করা জায়েজ, যদি তারা জালেম হয়। কিন্তু নবী ﷺ সাধারণভাবে মু’মিনকে লা‘নত করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম: ২৫৯৭)
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“কোনো জালেমকে লা‘নত করা জায়েজ, তবে তা সাধারণ লা‘নত না হয়ে বিশেষভাবে সেই জালেমের জন্য হলে উত্তম।” (রদ্দুল মুহতার: ৬/৪০২) - “তাদের মনের শান্তি যেন আমার শান্তি যেভাবে নষ্ট হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিয়ে কেড়ে নেন” – এটি স্পষ্টতই ‘মিসল’-এর সীমা অতিক্রম করেছে। কারণ তাতে ‘আরও বেশি কষ্ট’ কামনা করা হয়েছে।
- “ঐ মানুষের সংসারও যেন উজাড় হয়” – সংসারের মধ্যে হয়তো নিষ্পাপ সন্তান, স্ত্রী ইত্যাদি থাকতে পারে। তাদের ক্ষতি কামনা করা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ، وَلَا عَلَى أَوْلَادِكُمْ، وَلَا عَلَى أَمْوَالِكُمْ»
“তোমরা নিজেদের উপর, নিজেদের সন্তানদের উপর ও নিজেদের সম্পদের উপর লা‘নত করো না।” (সহীহ মুসলিম: ৩০০৯)
ইমাম শাফি‘ঈ ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এমন দু‘আ যখন একান্তই ন্যায়সঙ্গত নয়, তখন তা মাকরূহ বা হারাম। (ফাতাওয়া আলমগীরী: ২/৪০২)
৩. হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
ইমাম কাসানী (রহ.) ‘বাদায়িউস সানায়ি’তে উল্লেখ করেন:
“মজলুমের জন্য জায়েজ যে সে জালেমের বিরুদ্ধে দু‘আ করবে, কিন্তু তার দু‘আতে বাড়াবাড়ি (যুলুম) না থাকা শর্ত।”
(বাদায়িউস সানায়ি: ৭/৭৩)
মুফতী মুহাম্মদ শাফী (রহ.) ‘মা‘আরিফুল কুরআনে’ লেখেন:
“নিজের উপর অত্যাচার কারীর জন্য বদদু‘আ করা জায়েজ, তবে তা যথাযথ মাত্রায় হতে হবে। এর চেয়ে বেশি বা ব্যক্তি-সম্প্রদায়ের উপর সাধারণ লা‘নত করা অনুচিত।”
(মা‘আরিফুল কুরআন: ৮/৫৫৩)
মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানী’তে বলেন:
“অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দু‘আ করতে কোনো বাধা নেই, তবে সতর্কতা এই যে, দু‘আতে যেন অন্যায় বাড়াবাড়ি (যুলুম) না হয়। বিশেষ করে পরিবারের নির্মম ধ্বংস কামনা করা ঠিক নয়।”
(ফাতাওয়া উসমানী: ১/২৮০)
৪. আপনার করণীয়
- আপনি যেহেতু অত্যাচারিত, তাই আপনার দু‘আ মূলত কবুল হওয়ার উপযুক্ত। তবে আপনার দু‘আর মধ্যে কিছু অংশ (যেমন “আরও বেশি কষ্ট”, “সংসার উজাড়”) শরী‘আতের সীমা অতিক্রম করেছে। তাই উত্তম হলো:
- তওবা করুন – আল্লাহর কাছে আপনার দু‘আর অতিরিক্ত অংশের জন্য ক্ষমা চান।
- দু‘আকে সংশোধন করুন – এইভাবে বলুন:
“হে আল্লাহ! আপনি আমার উপর যেসব অত্যাচার হয়েছে, তার পূর্ণ প্রতিশোধ নিন। তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের অন্যায়ের সমান শাস্তি দিন। তাদের হাত-জবানকে বন্ধ করুন, কিন্তু তাদের পরিবারের নির্দোষদের রক্ষা করুন। আমাকে ধৈর্য দিন এবং ক্ষমার সওয়াব দান করুন।” - ক্ষমাকে সর্বোত্তম মনে করুন – নবী ﷺ বলেছেন:
«وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا»
“ক্ষমা করা ব্যতীত আল্লাহ বান্দার মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন না।” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)
উপসংহার: আপনার দু‘আটিকে সম্পূর্ণ গুনাহ বলা যাবে না, তবে এর কিছু অংশ (অতিরিক্ত চাওয়া) গুনাহের শামিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপনি তওবা করে দু‘আকে সংশোধন করে নিন। আল্লাহ তওবা কবুল করেন এবং মজলুমের দু‘আ ফিরিয়ে দেন না।