সিজারিয়ানের পর ডাক্তারের নির্দেশে ২-৩ বছরের জন্য গর্ভনিরোধক ইমপ্লান্ট ব্যবহার কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার ইমার্জেন্সি সিজার হয়েছে, ডাক্তার কড়াকড়িভাবে বারণ করেছেন ২বছরের মধ্যে বাচ্চা না নিতে, তাই ইমপ্লান্ট (জন্ম বিরতিকরণ মাধ্যম) নেয়া হয়েছে ।
১) উপরোক্ত সমস্যার কারণে পরবর্তী প্রেগন্যান্সির জন্য ২-৩বছরের গ্যাপ দিতে চাচ্ছি, এতে কি আমার গুনাহ হবে? বিস্তারিত জানাবেন ।
২) মানুষের মধ্যে ধারণা আছে যে, এসব জন্ম নিয়ন্ত্রণের কোনো মাধ্যমই জায়েজ না, বড় ধরনের গুনাহ হয়, ১টার পর আরেক বাচ্চা পয়দা করা লাগবেই। দেখা যায় যে সন্তান বেশি হলে ভালো তারবিয়্যাতে গড়ে তোলার সুযোগ হয়না - খারাপ পথে যাক তাও সমস্যা নেই তাও অনেকগুলো সন্তান লাগবে গুনাহ না হওয়ার জন্য ।
*এগুলো কি সঠিক? এই ব্যাপারে একটু বিস্তারিত জানাবেন
Answer
উত্তর:
আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রথমেই বলে নিই, ইসলামে সন্তান ধারণ ও জন্মদান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং নবী করীম (সা.)-এর উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে কিছু বৈধ কারণে অস্থায়ীভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা জায়েয হতে পারে। আপনার প্রশ্ন দুটির বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
প্রশ্ন ১: ডাক্তারের নির্দেশে ২-৩ বছরের গ্যাপ দেওয়ার জন্য ইমপ্লান্ট ব্যবহার করলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর:
আপনার ক্ষেত্রে ডাক্তারের কড়া নির্দেশনা (সিজারিয়ানের পর জরায়ু দুর্বল থাকা ও মায়ের জীবন ঝুঁকি) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ কারণ। ইসলামী ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী, অস্থায়ীভাবে Birth Control (যেমন ইমপ্লান্ট, পিল, কনডম ইত্যাদি) ব্যবহার করা জায়েয, তবে শর্ত হলো:
- স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে।
- এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (যেমন টিউবেকটমি বা ভাসেকটমি) না হয়।
- কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকে।
- উদ্দেশ্য হয় সন্তানের ভালো লালন-পালন অথবা মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষা।
আপনার ক্ষেত্রে ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। তাই ২-৩ বছরের জন্য ইমপ্লান্ট ব্যবহার করলে গুনাহ হবে না, বরং এটি মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি বৈধ ব্যবস্থা।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩৫৪): "যদি কোন ওজর (প্রয়োজন) থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রী সম্মতিতে গর্ভধারণ প্রতিরোধ জায়েয।"
- রদ্দুল মুহতার (২/৪০৪): "সন্তানের সংখ্যা বেশি হলে বা মায়ের স্বাস্থ্যের কারণে অস্থায়ী গর্ভনিরোধ জায়েয।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪৭): "মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন, ডাক্তারের পরামর্শে যদি মায়ের জীবনের ঝুঁকি থাকে তবে গর্ভনিরোধ জায়েয।"
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
- ইমপ্লান্ট যদি স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাকরণ না করে, বরং অস্থায়ীভাবে গর্ভধারণ বিলম্বিত করে, তাহলে তা হারাম নয়।
- ডাক্তারের পরামর্শ ও স্বামীর সম্মতি থাকলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
প্রশ্ন ২: মানুষের ধারণা—জন্ম নিয়ন্ত্রণের সব মাধ্যমই হারাম এবং বেশি সন্তান নেওয়া জরুরি। এগুলো কি সঠিক?
উত্তর:
মানুষের এই ধারণাটি সঠিক নয় এবং এটি ভুল ও অতিরঞ্জিত। আসল কথা হলো:
(ক) জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যম:
- স্থায়ী মাধ্যম (যেমন নসবন্দি বা অপারেশন) হারাম, কারণ এটি আল্লাহর দেওয়া সন্তান ধারণের ক্ষমতা চিরতরে নষ্ট করে।
- অস্থায়ী মাধ্যম (যেমন পিল, ইমপ্লান্ট, কনডম, ক্যালেন্ডার পদ্ধতি) জায়েয, যদি কোনো বৈধ কারণ থাকে (যেমন মায়ের স্বাস্থ্য, সন্তানের লালন-পালনের অক্ষমতা, ডাক্তারের নির্দেশ)।
রেফারেন্স:
-
সহীহ বুখারী (হাদীস ৫২৪২): সাহাবারা 'আজল' (গর্ভধারণ প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি) ব্যবহার করতেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তা নিষেধ করেননি।
-
ফাতাওয়া উসমানী (২/১৬৭): "সন্তান বেশি হলে ভালোভাবে লালন-পালন করা কঠিন হয়ে যায়, এমন অবস্থায় অস্থায়ী গর্ভনিরোধ জায়েয।"
-
মা'আরিফুল কুরআন (৮/৫৮৪): "সন্তানের ইসলামী তারবিয়ত নিশ্চিত করা পিতামাতার দায়িত্ব। যদি সন্তান সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তা কঠিন হয়, তবে সীমিত সংখ্যায় সন্তান নেওয়া উত্তম।"
-
বেহেশতী জেওর (২১ অধ্যায়): "স্বামী-স্ত্রী মিলে যদি মনে করেন যে সন্তান বেশি হলে তারবিয়ত ঠিকমতো হবে না, তাহলে অস্থায়ী গর্ভনিরোধ জায়েয।"
সারসংক্ষেপ:
-
আপনার জন্য ইমপ্লান্ট ব্যবহার জায়েয এবং গুনাহ হবে না, কারণ এটি ডাক্তারের নির্দেশ ও মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা।
তবে আকীদা বিশুদ্ধ রাখতে হবে। রিযিকের ভয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ হারাম। -
সব জন্মনিয়ন্ত্রণ মাধ্যম হারাম নয়—শুধু স্থায়ী পদ্ধতি হারাম। অস্থায়ী পদ্ধতি বৈধ কারণে জায়েয।
আপনার জন্য দোয়া: আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার সন্তানের জন্য ভালো ব্যবস্থা করুন।
রেফারেন্স কিতাবসমূহ:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া
- রদ্দুল মুহতার
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- মা'আরিফুল কুরআন
- ফাতাওয়া উসমানী
আল্লাহু আলাম।