কিতাব লেখা সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আবার ওই বিষয়ের উপর কিতাব লিখতেছি। আমি ওই গবেষকের কিছু কথা ট্রান্সলেশন করেছি যেখানে আমার কিছু চিন্তাভাবনা যোগ আছে। এবং আমি কিতাবের শুরুতে স্পষ্ট ভাষায় লিখে দিয়েছি যে 'এই কিতাবের সবকিছুই আমার নিজের বলে চালানোর অপশন নেই কারণ অনেক কথা আছে যেগুলো এ বিষয়ে এক্সপার্টদের বক্তব্য কিংবা গবেষণা থেকে নেয়া। ' এ সম্পর্কে কি বলবে।
Answer
উত্তর / جواب
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন ব্যক্তি একটি গবেষকের ইউটিউব আলোচনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একই বিষয়ে একটি কিতাব লিখছেন। তিনি গবেষকের কিছু কথা অনুবাদ ও সম্পাদনা করে নিজের চিন্তাভাবনা যুক্ত করেছেন এবং কিতাবের শুরুতে একটি সাধারণ বিবৃতি দিয়েছেন যে, “এই কিতাবের সবকিছুই আমার নিজের বলে চালানোর অপশন নেই, কারণ অনেক কথা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বা গবেষণা থেকে নেওয়া।” তিনি জানতে চান, এভাবে কিতাব লেখা কি জায়েয?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
১. আমানত ও সততার নীতি:
ইসলামে জ্ঞান বিতরণ ও লেখালেখিতে আমানত ও সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসে এসেছে:
مَنْ حَدَّثَ بِحَدِيثٍ وَهُوَ يَرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبَيْنِ
“যে ব্যক্তি এমন হাদীস বর্ণনা করে যা সে মিথ্যা বলে জানে, সে দুজন মিথ্যাবাদীর মধ্যে একজন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১)
অন্যের গবেষণা বা বক্তব্য নিজের নামে চালানো গীবত, ধোঁকা ও আমানতে খিয়ানতের শামিল। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন আমানতসমূহ তার অধিকারীর নিকট পৌঁছে দিতে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮)
২. স্বত্বাধিকার ও কপিরাইট:
আধুনিক যুগে লেখক ও গবেষকদের বৌদ্ধিক সম্পদ (Intellectual Property) হিসেবে গণ্য করা হয়। হানাফী ফিকহের প্রখ্যাত আলেমগণ কপিরাইটকে সম্মানিত মালিকানা (مال متقوم) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
- মুফতী তাকী উসমানী লিখেছেন:
“আজকের প্রচলিত নিয়মে কিতাব, গবেষণাপত্র ও ভিডিওর কপিরাইট হচ্ছে একটি স্বীকৃত সম্পদ। সুতরাং মালিকের অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করা জায়েয নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৫৮)
- ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
“অভ্যাস বা প্রথা (العرف) যখন কোনো বস্তুকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে, তখন শরী’আতেও তা সম্পদের মতোই গণ্য হয়।” (রাদ্দুল মুহতার, ৪/৫০)
অতএব, গবেষকের ভিডিওর বিষয়বস্তু যদি কপিরাইটযুক্ত হয়, তবে তার স্পষ্ট অনুমতি (শারীয়াহ সম্মত) ছাড়া তা কিতাবে স্থানান্তর করা জায়েয হবে না।
৩. দাবি (Disclaimer) যথেষ্ট নয়:
আপনি কিতাবের শুরুতে সাধারণভাবে লিখেছেন যে, “অনেক কথা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য থেকে নেওয়া” – এটি যথেষ্ট নয়। কারণ:
- নির্দিষ্ট উল্লেখ: প্রতিটি বিশেষজ্ঞের নাম ও উৎস উল্লেখ করতে হবে। অন্যথায় এটি প্লেজিয়ারিজম (অন্যের কাজ নিজের বলে চালানো)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
- গবেষকের অধিকার: ইউটিউব ভিডিওর গবেষক যদি তার কথাগুলো পূর্ণ বা আংশিকভাবে হুবহু নেওয়ার অনুমতি না দেন, তাহলে তা নেওয়া নিষেধ। হাদীসে এসেছে:
“মুসলমানগণ তাদের শর্তসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।” (আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৯৪)
৪. অনুবাদ ও নিজের চিন্তা যুক্ত করা:
- যদি আপনি গবেষকের কথাগুলো অর্থ বুঝিয়ে নিজের ভাষায় (প্যারাফ্রেজ) লিখেন এবং স্পষ্টভাবে কৃতিত্ব দেন, তবে তা জায়েয হতে পারে যদি গবেষক মনোনিবেশ করেন বা অনুমতি থাকে।
- কিন্তু আংশিক অনুবাদ ও নিজের চিন্তা মিশ্রিত করলেও মূল উৎসের স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক। অন্যথায় পাঠকগণ ধোঁকায় পড়বেন যে এগুলো আপনার নিজস্ব গবেষণা কিনা।
নির্দিষ্ট ফতোয়া ও সমাধান
প্রস্তাবনা:
- প্রথমে গবেষকের অনুমতি নিন: তার ভিডিওতে সাধারণত “বিস্তারের জন্য উন্মুক্ত” (শেয়ার/রিইউজ) থাকলেও কিতাবে ব্যবহারের জন্য সরাসরি অনুমতি নেয়া উত্তম। ইমেল বা মেসেজের মাধ্যমে অনুমতি চেয়ে নিন।
- স্পষ্ট উল্লেখ দিন: কিতাবের শুরুতে নির্দিষ্ট করে বলুন – “এই কিতাবের অমুক অধ্যায়টি ‘____’ গবেষকের ইউটিউব ভিডিও থেকে অনুবাদ ও সম্পাদনার মাধ্যমে নেওয়া”। পাদটীকায় বা গ্রন্থপঞ্জিতে পূর্ণ রেফারেন্স দিন।
- নিজের মৌলিকতা বজায় রাখুন: গবেষকের কথা নেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব বিশ্লেষণ ও সংযোজন থাকলে তা আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য হবে, তবে উৎস উল্লেখ আবশ্যক।
ফিকহী রায়:
- উল্লিখিত পদ্ধতিতে সাধারণ দাবি যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেকটি ধার করা বক্তব্য বা গবেষণার উৎস নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। যদি গবেষক দ্ব্যর্থহীনভাবে অনুমতি না দেন, তাহলে তার বক্তব্য লিখে প্রকাশ করা জায়েয হবে না।
- তবে যদি গবেষকের ভিডিওতে “শেয়ার ও পুনঃপ্রকাশের অনুমতি” (Creative Commons ইত্যাদি) থাকে, তাহলে সেটা শর্তসাপেক্ষে জায়েয হতে পারে।
হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী)-তে বলা হয়েছে:
“কোনো ব্যক্তি যদি নিজের জ্ঞান বা গবেষণা কারো সাথে শেয়ার করে, তবে গ্রহীতার জন্য সেটাকে নিজের নামে চালানো বা উৎস লুকানো জায়েয নয়।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩৫১)
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী) থেকে শিক্ষা: সাহাবী ও তাবিয়ীদের বক্তব্য উদ্ধৃতিতে সনদ উল্লেখ করতে তাগিদ দেয়া হয়েছে।
শাস্ত্রীয় দিকনির্দেশনা (آخِرُ الْكَلَامِ)
উপসংহার:
আপনার লেখার পদ্ধতি বর্তমানে শরী‘আহসম্মত নয় যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি গবেষকের নাম ও ভিডিওর লিঙ্ক স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করছেন, অথবা তার কাছ থেকে লিখিত অনুমতি না নিচ্ছেন। একটি অস্পষ্ট দাবি (ডিসক্লেইমার) আপনাকে দায়িত্বমুক্ত করবে না।
প্রস্তাবিত সমাধান:
- গবেষকের সাথে যোগাযোগ করে কিতাবে তার বক্তব্য ব্যবহারের অনুমতি নিন।
- কিতাবের “স্বীকৃতি” (Acknowledgement) অংশে গবেষক ও তার ভিডিওকে ধন্যবাদ দিন।
- প্রতিটি অধ্যায়ে ফুটনোটে উৎস দিন – “অমুক গবেষকের ভিডিও, ‘শেয়ার করার নিয়তে’ অনুবাদ ও সম্পাদনা করা”।
- নিজস্ব চিন্তাভাবনা সংযোজন করলেও মূল বক্তব্যের কৃতিত্ব গবেষককে দিন।
আল্লাহ তাআলা আমানত রক্ষাকারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আল-আন’আম, ৬:১৫২)
উত্তর প্রদানে:
আপনার কিতাবটি যদি ইলমের বিস্তারে সহায়ক হয়, তবে সেটা সওয়াবের কাজ। তবে সেটা হতে হবে শুদ্ধ পদ্ধতিতে – সততা ও উৎস স্বীকৃতির মাধ্যমে।
শেষ কথা:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
(হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের কাছ থেকে (এ কাজ) কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।)