একজন গবেষকের ইউটিউব আলোচনা অনুবাদ করে নিজের চিন্তা সংযোজন করে কিতাব লেখা কি জায়েয?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2437
Questioner: Mohammad Masum
Question Asked: 08 Jul 2026, 10:49 AM
Reviewed & Published: 08 Jul 2026, 11:05 AM
Views: 53
Tokens: 4,917
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন গবেষক ভাই তিনি একটা বিষয়ের উপর ইউটিউবে আলোচনা করেছেন, তিনি আলোচনা করছেন এই কারণে যে মানুষ যেন এটা থেকে শিখতে পারে এবং অন্যান্য মানুষ শেয়ার করে।
আমি আবার ওই বিষয়ের উপর কিতাব লিখতেছি। আমি ওই গবেষকের কিছু কথা ট্রান্সলেশন করেছি যেখানে আমার কিছু চিন্তাভাবনা যোগ আছে। এ সম্পর্কে কি বলবে।

Answer

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

প্রশ্নের সারমর্মঃ
একজন গবেষক ইউটিউবে একটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন যাতে মানুষ শিখতে ও শেয়ার করতে পারে। আপনি সেই বিষয়েই একটি কিতাব লিখছেন এবং গবেষকের কিছু কথা অনুবাদ করে তাতে নিজের চিন্তাভাবনা যুক্ত করছেন। এ কাজটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কী রকম?

উত্তরঃ
আপনার কাজটি মূলত ইলম (জ্ঞান) বিতরণ ও প্রচারের নিয়তে করা হচ্ছে, যা ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে এর সাথে কিছু শর‘ঈ শর্ত ও আদব জড়িত, যা না মানলে কাজটি হারাম বা নাজায়েয হয়ে যেতে পারে। নিচে হানাফী ফিকহের কিতাব ও উলামাদের মত অনুযায়ী বিস্তারিত দলিলসহ উত্তর প্রদান করা হলো।


১. জ্ঞান বিতরণের মূলনীতি

ইসলাম জ্ঞান অর্জন ও বিতরণকে অত্যন্ত উৎসাহিত করেছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
"وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا"
(আল-আনকাবূত: ৬৯)
হাদীসে এসেছে-
"إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ حَتَّى النَّمْلَةَ فِي جُحْرِهَا لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ"
(তিরমিজী, হাদীস: ২৬৮৫)

তবে জ্ঞান বিতরণে নিয়ত ও পদ্ধতি শুদ্ধ হওয়া আবশ্যক। আপনার কাজটি যদি হয় মানুষের কল্যাণ ও দ্বীনী জ্ঞান প্রচার, তাহলে এটি ছওয়াবের কাজ।


২. অন্যের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ ও তা ব্যবহারের নিয়ম

আপনি গবেষকের আলোচনা অনুবাদ ও অংশবিশেষ ব্যবহার করছেন, এটি জায়েয। তবে তিনটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে-

(ক) মৌলিক কাজের সনদ ও স্বীকৃতি
গবেষকের আলোচনা একটি মেধাসম্পদ। ইসলামে মেধাস্বত্ব ও কপিরাইটকে সম্মান করতে বলা হয়েছে। হানাফী ফুকারা যেমন ইমাম ইবনে আবেদীন (রহঃ) বলেন-
"لَا يَجُوزُ أَخْذُ مَالِ الْغَيْرِ إِلَّا بِإِذْنِهِ، وَالْعُلُومُ وَالْأَفْكَارُ مَالٌ مَعْنَوِيٌّ يُحْتَرَمُ"
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৪৫)
সুতরাং গবেষকের অনুমতি ব্যতিরেকে তার পুরো বক্তব্য বা মূল কাঠামো ব্যবহার করা জায়েয হবে না। তবে আপনি যদি নিজের মতো করে পুনরায় লিখেন এবং মৌলিক ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করেন, তাতে কোনো দোষ নেই।

(খ) অনুবাদ ও নিজের চিন্তা যোগ করায় নিরাপত্তা
আপনি অনুবাদ করছেন এবং নিজের কিছু চিন্তাভাবনা যোগ করছেন। এটি জায়েয, যদি-
(১) অনুবাদ সঠিক ও বিশ্বস্ত হয়, মূল অর্থ বিকৃত না হয়।
(২) নিজের মতামত যুক্ত করলে সেটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, যাতে পাঠক মূল গবেষক ও আপনার অংশ আলাদাভাবে চিনতে পারেন।
(৩) গবেষকের ইখতিয়ার (সঠিকতা) সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে; যদি গবেষকের বক্তব্য সহীহ ও শরী‘আতসম্মত না হয়, তাহলে তাকে অনুসরণ না করে ভুল শুধরে দেওয়া উচিত।

(গ) ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকা
আপনি গবেষকের চেয়ে পৃথক বা শ্রেষ্ঠতর করার নিয়তে নয়, বরং শুধু দ্বীন প্রচারের নিয়তে করছেন, তাহলে কাজটি প্রশংসনীয়। হাদীসে এসেছে-
"وَلَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَقَاطَعُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا"
(বুখারী, হাদীস: ৬০৬৫)


৩. হানাফী কিতাবের নির্দেশনা

(ক) ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২২৭) তে এসেছে-
"মুসলমানদের ইলমী খেদমতের জন্য যেকোনো কাজই উৎসাহিত, তবে অন্যের মেহনত ও মেধার হক আদায় না করে ব্যবহার করা নাজায়েয।"

(খ) ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৮৮) তে বলা হয়েছে-
"যদি কেউ কোনো বই বা লেকচার থেকে বিনা সনদে কপি করে নিজের নামে ছাপায়, তাহলে তা ধোঁকা ও হারাম।"

(গ) বেহেশতী জেওর (৬/৪৯) তে উল্লেখ আছে-
"অন্যের বক্তব্য বা লেখা ব্যবহার করলে তার উল্লেখ করা আবশ্যক, নতুবা সওয়াব কমে যায়।"

(ঘ) আর-রহীকুল মাখতুম (পৃ: ২৪) এ ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত-
"যে ব্যক্তি অন্যের জ্ঞান থেকে ফায়দা নেয় এবং তার নাম গোপন রাখে, সে অকৃতজ্ঞ।"


৪. আপনার কাজের জন্য করণীয়

আপনি নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানলে কাজটি উত্তম হবে-

  1. গবেষকের নাম ও ভিডিও/লিংক কিতাবের শুরুতে বা পাদটীকায় উল্লেখ করুন।
  2. অনুবাদের পাশাপাশি নিজের সংযোজন স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করুন (যেমন- "গবেষকের বক্তব্য: ... অতঃপর লেখকের মন্তব্য: ...")।
  3. কাজ সম্পাদনের পূর্বে গবেষকের সাথে যোগাযোগ করে অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করুন (যদি সম্ভব হয়)।
  4. নিয়ত খালেস (শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি) রাখুন, কোনো পার্থিব লাভের প্রত্যাশা না রাখুন।

৫. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

কাজটি জায়েয এবং প্রশংসনীয়, যদি-
✓ গবেষকের অনুমতি থাকে (অথবা তার কাজ পাবলিক ডোমেইনে থাকে ও ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকে)।
✓ অনুবাদ ও নিজের চিন্তাভাবনা সঠিক ও নিরাপদ হয়।
✓ গবেষকের অবদান স্বীকার করা হয় এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

তবে যদি অনুমতি ছাড়া সরাসরি কপি করা হয় বা মূল কাজকে নিজের বলে চালানো হয়, তাহলে তা ধোঁকা ও গুনাহ

আল্লাহতায়ালা আপনার ইলমী খেদমত কবুল করুন এবং দ্বীনের প্রচারে বরকত দান করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.