বিতর সালাতের হানাফী পদ্ধতি: দ্বিতীয় রাকাতে কি বসতে হবে?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 2434
Questioner: Binte Tahsin
Question Asked: 08 Jul 2026, 05:45 AM
Reviewed & Published: 08 Jul 2026, 07:15 AM
Views: 51
Tokens: 5,376
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিতরের ৩ রাকাত সালাতের ক্ষেত্রে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী দ্বিতীয় রাকাতে প্রথম বৈঠক করতে হয়। কিন্তু এতদিন ১ রাকাত আদায় করেছি।আর ৩ রাকাতের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় রাকাতে বৈঠক না করে একেবারে ৩ রাকাত পড়ে ৩য় রাকাতে শেষ বৈঠক করি।

এক্ষেত্রে কি আমার এতদিনের বিতর সালাত কবুল হবে না?

Answer

উত্তর: বিতর সালাতের হানাফী পদ্ধতি ও পূর্বের সালাতের বিধান

প্রশ্নকারী জানিয়েছেন, তিনি এতদিন বিতরের সালাত দুভাবে পড়েছেন: (১) কখনো শুধু ১ রাকাত পড়েছেন, এবং (২) কখনো ৩ রাকাত পড়েছেন কিন্তু দ্বিতীয় রাকাতে বসা (প্রথম বৈঠক) ছাড়াই সোজা তৃতীয় রাকাতে গিয়ে শেষ বৈঠক করেছেন। এখন জানতে চান, তাঁর এই সালাতগুলি কি কবুল হবে না?

আমরা কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর দিচ্ছি।


১. বিতর সালাতের হানাফী পদ্ধতি

হানাফী মাযহাব মতে বিতর সালাত ৩ রাকাত, এক সালামে পড়তে হয়। এর পদ্ধতি হলো:

  • প্রথম দুই রাকাত পড়ে (সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে) দ্বিতীয় রাকাতে বসা (ক্বা’দা উলা) এবং তাশাহহুদ পড়া ওয়াজিব।
  • তারপর তৃতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও সূরা পড়ে, আবার বসে (ক্বা’দা আখিরা) তাশাহহুদ, দরূদ ও দুয়া পড়ে সালাম ফিরানো।

এটাই সহীহ পদ্ধতি। দ্বিতীয় রাকাতে বসা ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১১২; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৫০৮)


২. প্রশ্নকারীর ৩ রাকাত পড়ার পদ্ধতি (দ্বিতীয় রাকাতে না বসা)

  • ফিকহী বিধান: দ্বিতীয় রাকাতে না বসে সরাসরি তৃতীয় রাকাতে উঠে গিয়ে শেষ বৈঠক করলে ওয়াজিব তরক হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াজিব ছেড়ে দিলে সালাত সহীহ হওয়া নিয়ে ইমামদের মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে সালাত বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে সালাত সহীহ হলেও তা মাকরূহ তাহরীমী (গুনাহের কাজ) এবং এতে সিজদা সাহু ওয়াজিব হয়। ফৎওয়া দ্বিতীয় মতের ওপর। (রদ্দুল মুহতার ২/৮১; ফাতাওয়া উসমানী ১/৪৫২)

  • আপনার অবস্থা: আপনি হয়তো জানতেন না যে এটা ওয়াজিব, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করেননি। অজ্ঞতা সত্ত্বেও সালাত সহীহ হবে এবং সিজদা সাহু দরকার নেই? হ্যাঁ, যদি ভুলে যান তবে সিজদা সাহু দরকার। কিন্তু আপনি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এভাবে পড়েছেন। তাই আপনার পূর্বের সালাতগুলি সহীহ হলেও তার মধ্যে ত্রুটি রয়েছে এবং আপনি গুনাহগার হবেন না যদি না জানতেন। তবে এখন থেকে সহীহ পদ্ধতি অনুসরণ করা আবশ্যক। (আহসানুল ফাতাওয়া ২/৪৭৫)

  • কবুল হবে কি? আল্লাহর রহমতের আশা রাখুন। আপনার সালাতের ফরজ ওয়াজিব আদায় হয়েছেন, তবে ওয়াজিব তরকের কারণে কিছুটা ক্রটি হয়েছে। আপনি এখন থেকে সঠিক পদ্ধতি শিখে পড়ুন এবং তওবা করুন। পূর্বের সালাতগুলি পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই, তবে যদি সম্ভব হয় তবে সতর্কতামূলক পড়ে নেওয়া উত্তম। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৫০৯; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ ৪/৩৮১)


৩. শুধু ১ রাকাত বিতর পড়া

আপনি বলেছেন, “এতদিন ১ রাকাত আদায় করেছি।” হানাফী মাযহাবে বিতর কমপক্ষে ৩ রাকাত। কারো কারো মতে ১ রাকাত বিতর শুদ্ধ নয় (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১১২)। যদি আপনি শুধু ১ রাকাত নফল বা বিতরের নিয়তে পড়ে থাকেন, তবে তা বিতর হিসেবে সহীহ নয়। বরং তা নফল গণ্য হবে। কিন্তু আপনি যদি ২+১ পদ্ধতিতে (অর্থাৎ ২ রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে পরে ১ রাকাত পড়ে থাকেন) তাহলে সেটিও হানাফী মতে মাকরূহ, তবে অনেকেই তা জায়েজ মনে করেন, কিন্তু প্রথমোক্ত পদ্ধতি (এক সালামে ৩ রাকাত) অধিক উত্তম এবং ওয়াজিব। (বেহেশতী জেওর ২/৪১; রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৮)

  • যারা শুধু ১ রাকাত পড়েছেন, তাদের জন্য নিয়ম হলো: প্রতিদিনের বিতর ছুটে গেছে এবং তা কাজা করতে হবে? বরং যেহেতু নির্ধারিত সময়ে বিতর পড়া ফরজ নয় (ওয়াজিব), তাই যদি কেউ ভুল পদ্ধতিতে পড়ে, তবে সেটি আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে না। সুতরাং আপনি যদি কখনো ১ রাকাতই পড়ে থাকেন, তাহলে সে দিনগুলোর বিতর কাজা করা উচিত? ফিকহী বিধান: ১ রাকাত বিতর হানাফী মতে মূলত বিদআত, তাই উক্ত সালাত সহীহ নয়। (আপ-কি মাসয়েল ২/৫৭; ফাতাওয়া উসমানী ১/৪৫৫)

তবে আপনি যদি এখন থেকে সহীহ পদ্ধতি শিখে নেন, তাহলে বিগত দিনগুলোর জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সঠিকভাবে পড়ুন। অতীতের বিতরগুলি কি কাজা করা জরুরি? অধিকাংশ হানাফী ফকীহ বলেছেন, যে ব্যক্তি ভুল পদ্ধতিতে সালাত পড়েছে, সে জানতে পারার পর সতর্কতামূলক পুনরায় পড়ে নেবে (ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৫১০; ফাতাওয়া দারুল উলুম ৪/৩৮৫)। তাই আপনার জন্য উত্তম হবে: পূর্বের দিনগুলোর বিতরের কাজা যতটুকু সম্ভব পড়ে নেওয়া (যেমন গত এক মাস বা তার চেয়ে বেশি) এবং নিয়মিত সহীহ পদ্ধতি অনুসরণ করা।


৪. সংক্ষিপ্ত সমাধান

  1. ৩ রাকাত পড়ার সময় দ্বিতীয় রাকাতে বসা ওয়াজিব। আপনার পূর্বের পড়া পদ্ধতি ভুল ছিল। সালাত সহীহ হলেও এতে ত্রুটি ছিল। এখন থেকে দ্বিতীয় রাকাতে বসে তাশাহহুদ পড়বেন, তারপর দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাকাত শেষ করবেন।

এক্ষেত্রে সেই এই বিতর নামাজগুলির কাজা আদায় করা আবশ্যক কিনা এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে।

অনেকের মতে যদিও এক্ষেত্রে পুনরায় সেই বিতর গুলির কাজা আদায় করা আবশ্যক নয় তদুপরি সময় সুযোগ মোতাবেক আস্তে ধীরে সে বিতর গুলির কাজা আদায় করে নেওয়ার পরামর্শ থাকবে

  1. শুধু ১ রাকাত পড়া সম্পূর্ণ ভুল। হানাফী মতে বিতর ৩ রাকাত। আপনি যদি কখনো ১ রাকাত পড়ে থাকেন, তা বিতর হিসেবে গণ্য হবে না; সে দিনগুলোর বিতর কাজা করা কর্তব্য।
  2. তওবা ও ইস্তেগফার করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তাঁর রহমত অপরিসীম; তিনি তওবা কবুল করেন।
  3. ভবিষ্যতে সহীহ পদ্ধতি শিখে তা আমল করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ আমল করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)


রেফারেন্স সমূহ (হানাফী কিতাব)

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ২/৪৯৭-৪৯৮ (বিতরের পদ্ধতি), ২/৮১ (ওয়াজিব তরকের হুকুম)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): ১/১১২ (বিতর ৩ রাকাত এক সালামে)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী): ১/৫০৮-৫১০
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ১/৪৫২-৪৫৫
  • বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): ২/৪১ (বিতরের পদ্ধতি)
  • আহসানুল ফাতাওয়া (মুফতি রশীদ আহমদ): ২/৪৭৫
  • ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ৪/৩৮১, ৩৮৫

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.