গাঁজা পান করা ঘুমের ঔষধ দিয়ে নেশা করা কি মূর্তিপূজার মত হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।গাঁজা পান করলে যদি সব মনে থাকে বিবেক পুরোপুরি লোপ না পায় তাহলে ইমাম আবু হানিফা রহ: আগের মত অনুযায়ী কি হবে?
৩।গাঁজা খাওয়া ঘুমের ঔষধ ছাড়তে না পারে যদি সে নেক আমলও করে সে কি সয়তানের অনুসারি হবে সে সয়তানের অনুসারি হতে চায়না সয়তানকে ঘৃনা করে?
৪।গোনাহ করার কারনে সয়তানের অনুসারী বা ভাই হবেনা এটা কাফেরদের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়েছে এইমত সঠিক কিনা
Answer
প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ:
১. গাঁজা পান করা বা ঘুমের ওষুধ দিয়ে নেশা করা কি মূর্তিপূজার মত হবে?
উত্তর: না, গাঁজা পান করা বা ঘুমের ওষুধ দিয়ে নেশা করাকে মূর্তিপূজার (শিরক) সমতুল্য বলা যাবে না। তবে এটি একটি কবীরা গুনাহ (বড় পাপ)।
-
কুরআন ও হাদীস: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের কাজের অপবিত্র অংশ; সুতরাং তোমরা তা থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯০-৯১) এই আয়াতে মদ (নেশা) ও মূর্তিপূজা উভয়কেই শয়তানের কাজ বলা হয়েছে, কিন্তু একে অপরের সমতুল্য নয়; বরং উভয়ই শিরক ও নেশার ভিন্ন ভিন্ন অপকর্ম।
-
হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নেশা করা কবীরা গুনাহ, কিন্তু এটি শিরক বা কুফর নয়। ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ আছে যে, নেশা হারাম এবং এর কারণে ইবাদত বিনষ্ট হয়, কিন্তু ব্যক্তি মুসলিম থাকে (যতক্ষণ না সে এটি হালাল মনে করে)।
সারসংক্ষেপ: নেশা করা কবীরা গুনাহ, কিন্তু মূর্তিপূজার মর্যাদা পায় না। তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
২. গাঁজা পান করলে যদি সব মনে থাকে ও বিবেক পুরোপুরি লোপ না পায়, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতানুযায়ী কী হবে?
উত্তর: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নেশাদার দ্রব্য সেবন করলে তা হারাম। বিবেক পুরোপুরি লোপ না পেলেও এটি গুনাহ থেকে রেহাই দেয় না।
-
হানাফী নীতি: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, নেশামুক্ত না হলে নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতের প্রভাব কমে যায় এবং কিছু বিশেষ বিধান (যেমন তালাক) কার্যকর হয় না। তবে সেবনের কারণে গুনাহ হ্রাস পায় না; বরং নেশার মাত্রা কম থাকলেও হারাম সেবনের অপরাধ থেকে যায়।
-
ফিকহী দলিল: রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ আছে, "যে ব্যক্তি বেহুঁশ করে দেয় এমন কিছু সেবন করে, তার ওপর তালাক ও ইবাদতের বিধান নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রযোজ্য নয়, কিন্তু গুনাহ অপরিবর্তিত থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩২৫)
সারসংক্ষেপ: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নেশা করা সবসময় হারাম; বিবেক লোপ না পেলে গুনাহ কমানো যায় না। তাওবা করা আবশ্যক।
৩. গাঁজা/ঘুমের ওষুধ ছাড়তে না পারা ব্যক্তি নেক আমল করলে সে কি শয়তানের অনুসারী হবে?
উত্তর: না, যদি সে নেক আমল করে এবং শয়তানকে ঘৃণা করে, তাহলে তাকে সরাসরি শয়তানের অনুসারী বলা যাবে না।
-
ইসলামী বিধান: গুনাহ করলেও যদি ব্যক্তি তাওবার ইচ্ছা পোষণ করে ও নেক আমল করে, তাহলে সে মুসলিম এবং আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। শয়তানের অনুসারী বলা হয় তাকে, যে ইচ্ছাকৃতভাবে পাপকে হালাল মনে করে বা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে।
-
হাদীস: রাসূল (সা.) বলেন, "প্রত্যেক আদম সন্তান পাপী, আর উত্তম পাপী হলো সে যে তওবা করে।" (তিরমিযী, হাদীস ২৪৯৯) এবং তিনি আরও বলেন, "শয়তানের অনুসারীরা তারাই যারা তার ডাকে সাড়া দেয়।" (বুখারী, ৩/১২৩৩)
-
বাস্তব সমাধান: আসক্তি কোনো সহজ ব্যাপার নয়। তাই চিকিৎসা, দোয়া এবং সৎ সংগঠন গ্রহণ করে ধীরে ধীরে ছাড়তে হবে। ততদিন নেক আমল চালিয়ে যেতে হবে, কারণ তা গুনাহ মুছে দেয়। (সূরা হুদ: ১১৪)
সারসংক্ষেপ: পাপী হলেও যদি ব্যক্তি শয়তানকে ঘৃণা করে ও নেক আমল করে, তবে সে শয়তানের অনুসারী নয়; বরং মুমিন যে তাওবা করতে চায়।
৪. গুনাহ করার কারণে "শয়তানের অনুসারী/ভাই" বলা হয় কিনা? এটা কি কাফেরদের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে?
উত্তর: "শয়তানের ভাই" শব্দটি সাধারণত কাফের ও মুশরিকদের জন্য ব্যবহার করা হয়, যারা শয়তানের আনুগত্য করে এবং আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতা করে।
-
কুরআন ও হাদীস: আল্লাহ তাআলা মদপানকারীদের সম্পর্কে বলেন, "শয়তান তো চায় যে, সে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯১) কিন্তু এখানে "ভাই" বলা হয় শয়তানের কাজে অংশগ্রহণকারীকে, যা কাফেরদের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়। হাদীসে এসেছে, "শয়তানের ভাই তারা, যারা ইমামের পিছনে নামাজে দেরি করে আসে।" (তাবারানী, হাদীস ৭৯২) এখানে মুসলিমদের জন্যও সতর্কতামূলক ব্যবহার হয়েছে।
-
হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফী ফকীহগণ বলেন, গুনাহ করলে ব্যক্তি "ফাসিক" হয়, কিন্তু "কাফের" বা "শয়তানের ভাই" বলা ভুল, যতক্ষণ না সে কুফরী বিশ্বাস পোষণ করে। (আল-হিদায়া, ২/৪৫৬)
সারসংক্ষেপ: শয়তানের ভাই বলতে সাধারণত কাফের ও মুশরিকদের বোঝানো হয়, তবে সতর্কতামূলকভাবে মুসলিম পাপীদের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সরাসরি কাউকে কাফের বলা নিষিদ্ধ।
সারসংক্ষেপ ও উপদেশ:
- নেশা হারাম: সব ধরনের নেশাদার দ্রব্য (গাঁজা, ঘুমের ওষুধ) সেবন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ।
- বিবেক সচেতন থাকলেও: নেশার কারণে ইবাদত অসম্পূর্ণ হয়, কিন্তু গুনাহ কমে না।
- আসক্তি ও তাওবা: আসক্তি থাকলে নেক আমল চালিয়ে যেতে হবে, কারণ তা গুনাহ মুছে দেয়। সর্বদা তাওবা ও দোয়া করতে হবে।
- শয়তানের ভাই: এটি কাফের ও মুশরিকদের জন্য ব্যবহার হয়। মুসলিম পাপীর জন্য সতর্কতামূলক বলা হয়, কিন্তু কাউকে কাফের বলা হারাম।
দোয়া: আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেশা ও হারাম থেকে দূরে রাখুন এবং ভালো কাজের তাওফিক দান করুন। আমীন।
সূত্র:
- কুরআন: সূরা আল-মায়িদা (৯০-৯১)
- হাদীস: তিরমিযী, তাবারানী, বুখারী
- হানাফী কিতাব: রদ্দুল মুহতার (৪/৩২৫), ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, আল-হিদায়া (২/৪৫৬)