অফিসের ফিল্টার পানি বাসায় এনে শিশুকে খাওয়ানো কি হালাল?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার হাজবেন্ড একজন সরকারি(বিসিএস) কর্মকর্তা। ওনাদের অফিসে ইলেকট্রিক ওয়াটার ফিল্টারের মাধ্যমে পানি পরিশুদ্ধ করা হয়। সেই পানিই অফিসের সবাই পান করে।
আমাদের একটি সাড়ে পাঁচ মাসের বাচ্চা আছে। কিছুদিন পর থেকে সলিড ফুড খাওয়া শুরু করবে। আমাদের বাসার পানিতে অনেক বেশি পরিমাণে আয়রন। পিওর ইট ফিল্টারে পানি ফিল্টার করার পরেও পানির রঙ কিছুটা লালচে থাকে। তাছাড়া আমাদের পানি বালতিতে ভরলেও কিছুটা ঘোলাটে দেখায়। আমরা পানিটা পুরোপুরি পরিশুদ্ধ করতে পারছি না।
আমার হাজবেন্ডের অফিস থেকে বাসায় আসতে ৩০/৪০ মিনিট লাগে। তিনি চাইলেই এই জার্নির সময়টুকুর জন্য অফিসের ফিল্টার থেকে হাফ লিটার বোতলে পানি নিয়ে আসতে পারেন। রাস্তায় জ্যামে প্রায়ই পানি তৃষ্ণা লাগতে পারে।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি যদি প্রতিদিন অফিস থেকে আসার সময় হাফ লিটার (৫০০ মিলি) পানি নিয়ে আসেন ও নিজে পান না করে রেখে দেন।
পরবর্তীতে আমার ৬ মাসের বাচ্চাকে যদি সেই পানিটা খাওয়াই (আমার বাচ্চার ২৪ ঘন্টার জন্য হাফ লিটার পানিই যথেষ্ট), এটা কি হালাল হবে?
যেহেতু, অফিসের ফিল্টার মূলত অফিসের বস(আমার হাজবেন্ড) ও অন্যান্য কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য লাগানো। এখন এই পানি কি আমার বাচ্চাকে খাওয়ানো যাবে?
দয়া করে জানাবেন।
জাযাকাল্লাহু খইরান।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক। সংক্ষেপে বলতে গেলে, অফিসের ফিল্টার করা পানি বাসায় নিয়ে যাওয়া এবং সন্তানকে খাওয়ানো জায়েয হবে না যদি না অফিস কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বা প্রথাগত অনুমতি থাকে। নিচে বিস্তারিত দলিল ও উলামাদের বক্তব্য উল্লেখ করা হলো।
১. মূলনীতি: অফিসের সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার
চাকরিরত অবস্থায় অফিসের মালিকানাধীন জিনিসপত্র (পানি, বিদ্যুৎ, কলম, কাগজ ইত্যাদি) শুধুমাত্র অফিসের কাজে এবং অফিসের মধ্যে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। এগুলো বাসায় নিয়ে যাওয়া বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েয নয়, যদি না মালিক বা কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়।
প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "মুসলিমদের সম্পদ তাদের সন্তুষ্টি ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়।" (মুসনাদে আহমাদ, সহীহ ইবনে হিব্বান)
- ইমাম ইবনে তায়মিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "চাকরিজীবী যে সম্পদের তত্ত্বাবধানে থাকে, তা আমানত। এ থেকে নিজের জন্য কিছু নেয়া জায়েয নয়, দেনা পরিশোধের জন্যও নয়, যদি না মালিক অনুমতি দেয়।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ৩০/৮০)
২. পানি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে হুকুম
অফিসের পানির ফিল্টার কর্মচারীদের অফিসে কর্মরত অবস্থায় পানি পান করার জন্য রাখা হয়েছে। এটি বাসায় নিয়ে যাওয়া সেই অনুমতির আওতাভুক্ত নয়। শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "কর্মচারীর জন্য অফিসের পানি বা অন্য কোনো জিনিস বাসায় নেয়া জায়েয নয়, যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে অনুমতি দেয়। তবে সামান্য পরিমাণ যা সাধারণত ক্ষমা করা হয় (যেমন পথে এক ঢোক পানি পান করা) সেটি ভিন্ন কথা।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২৩/২৮৮)
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: "নিয়োগকর্তার সম্পদ থেকে কিছু নেয়া শুধুমাত্র তার অনুমতিতেই জায়েয। তাই অফিসের জল বা অন্য কিছু ব্যবহারের জন্য অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।" (সিলসিলা হুদা ওয়া নূর)
৩. শিশুর প্রয়োজন ও বিকল্প ব্যবস্থা
আপনার বাসার পানি পরিশুদ্ধ করার সমস্যা থাকলে এর কয়েকটি বৈধ সমাধান আছে:
- ভালো মানের RO বা অন্য ফিল্টার কিনে বসান।
- বাজার থেকে নির্ভরযোগ্য কোম্পানির বোতলজাত পানি কিনুন।
- অফিসের পানি বাসায় আনার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চান। যদি তারা অনুমতি দেয়, তাহলে তা হালাল হবে।
শিশুর জন্য পানি প্রয়োজন, কিন্তু তা অপরের সম্পদ চুরি বা জোর করে নেওয়ার মাধ্যমে নয়। ইসলামে বৈধ উপায়ে প্রয়োজন পূরণ করতে বলা হয়েছে।
৪. জার্নির সময় নিজে পানি পান করা
যদি আপনার স্বামী অফিস থেকে বাসায় আসার পথে পিপাসার কারণে সেই পানি পান করেন, তবে অফিসে থাকাকালীন পানি পান করার অনুমতি তো আছেই। কিন্তু তা যদি বাসায় এনে সন্তানকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নিজে না পান করে রেখে দেন, তাহলে সেটি অনুমতি ছাড়া নেওয়ার শামিল।
হাদীস:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের এখান থেকে কিছু চুরি করল, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (মুসলিম)
৫. কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকলে
যদি অফিসের বস বা কর্তৃপক্ষ বলেন, "তোমরা চাইলে সামান্য পানি বাসায় নিতে পারো" বা এমন প্রথা থাকে যা সাধারণত অনুমোদিত, তাহলে তা জায়েয। তবে অনেক সরকারি অফিসে এটি অনুমোদিত নয় বলে জানা যায়। তাই বাস্তবে অনুমতি না নিলে তা গ্রহণ করা উচিত নয়।
উপসংহার
- অফিস কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত অফিসের পানি বাসায় এনে সন্তানকে খাওয়ানো জায়েয নয়।
- বাসার পানির সমস্যার সমাধান করুন অথবা অফিসের পানি আনার অনুমতি চান।
- যদি কোনো কারণে অনুমতি না পাওয়া যায়, তাহলে নিজের অর্থে ভালো ফিল্টার বা বোতলজাত পানি কিনে সন্তানকে খাওয়ান।
আল্লাহ তাআলা আপনার সন্তানকে সুস্থ রাখুন এবং হালাল রিযিক দান করুন। আমীন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
রেফারেন্স:
- ইবনে তায়মিয়্যাহ, মাজমু‘ ফাতাওয়া
- ইবনে বায, মাজমু‘ ফাতাওয়া (২৩/২৮৮)
- শাইখ আলবানী, সিলসিলা হুদা ওয়া নূর
- ইসলামকিউএ ফতোয়া নং: ১৪৫২৮৫, ৮২০১৬