মেয়েদের চোখের পর্দা
Halal and Haram · Hanafi
Question
আর মেয়েদের কন্ঠের পর্দা সম্পকেও বিস্তারিত জানাবেন অনুগ্রহ করে।
জাঝাকাল্লাহু খইরন।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি বাস্তব জীবনে চোখের হেফাজতের চেষ্টা করছেন, এটি খুবই প্রশংসনীয়। তবে অনলাইন মিডিয়ায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নন-মাহরাম পুরুষের ছবি বা ভিডিও দেখতে হলে যে দ্বিধা তৈরি হয়, তা বোধগম্য। আসুন বিষয়টি কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝে নেই।
১. মেয়েদের জন্য চোখের পর্দা: ছেলেদের মতোই কঠিন?
আপনি যে কথা শুনেছেন— "মেয়েদের চোখের পর্দা ছেলেদের মতো কঠিন নয়"— এটি ভুল। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন:
"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে... এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে..."
(সূরা নূর: ৩০-৩১)
এখানে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই দৃষ্টি নিচু করার নির্দেশ একইভাবে এসেছে। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) লেখেন:
"নারীদের জন্য অ-মাহরাম পুরুষের দিকে (কামনা ছাড়াও) তাকানো হারাম— এটি গ্রহণযোগ্য মত। কারণ তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
তবে কিছু হানাফি ফকীহ (যেমন ইমাম মুহাম্মাদ) বলেছেন: যদি কোনো কামনা না থাকে এবং ফিতনার ভয় না থাকে, তাহলে মেয়েদের জন্য অ-মাহরাম পুরুষের চেহারা দেখতে দোষ নেই (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৯)। কিন্তু অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম সতর্কতামূলকভাবে নিষেধ করেছেন, কারণ সাধারণত ফিতনা থেকে বাঁচা কঠিন।
সারকথা: ছেলেদের জন্যও দৃষ্টি নিচু করা ফরজ, মেয়েদের জন্যও ফরজ। তফাৎ শুধু কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা আছে, যেমন প্রয়োজনে কেনাবেচার সময় দেখা, তবে তা-ও শর্তসাপেক্ষ। সাধারণ অবস্থায় নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অ-মাহরামের দিকে তাকানো নিষিদ্ধ।
২. অনলাইন ও অফলাইন: শরীয়তের দৃষ্টিতে পার্থক্য
আপনি বলছেন, "বাস্তবে তো দেখছি না, অনলাইনে দেখায় কী দোষ? আমার খারাপ চিন্তাও আসে না।"
প্রিয় বোন, শরীয়তে নিষেধাজ্ঞা শুধু কামনা বা খারাপ চিন্তার উপর নির্ভর করে না। বরং দৃষ্টি নিজেই ফিতনার সূচনা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"চোখের যিনা হলো দেখা (অ-মাহরামের দিকে তাকানো)।"
(সহীহ বুখারী: ৬২৪৩)
এখানে অনলাইন বা অফলাইন— কোনো পার্থক্য নেই। ফেসবুকে কোনো নন-মাহরাম পুরুষের ছবি বা ভিডিও দেখা, ইউটিউবে অ-মাহরামের দিকে তাকানো— সবই চোখের যিনার অন্তর্ভুক্ত। আপনার মনে খারাপ চিন্তা না-ই আসতে পারে, কিন্তু এটি নিজের ইচ্ছাকৃতভাবে দেখার পাপ থেকে রেহাই দেয় না। হানাফি ফিকহের বড় আলেম মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেন:
"চলচ্চিত্র, টেলিভিশন বা ইন্টারনেটে অ-মাহরাম নারী বা পুরুষের ছবি দেখা— ইচ্ছাকৃত হলে হারাম; কারণ এটি দৃষ্টির অপব্যবহার।"
(জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৫৭)
অতএব, বাস্তব হোক বা অনলাইন, ইচ্ছাকৃতভাবে অ-মাহরামের দিকে তাকানো জায়েজ নয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
৩. মেয়েদের কণ্ঠের পর্দা (স্বরের পর্দা)
মেয়েদের কণ্ঠ ** পর্দার অংশ কিনা এই বিষয়টি মতবিরোধ পূর্ণ। ** অনেকেই বলেন কণ্ঠ নিজে সতর নয়। কিন্তু কথা বলার ঢং ও পদ্ধতি ফিতনার কারণ হতে পারে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অ-মাহরামের সাথে নরম ও আবছা কণ্ঠে কথা বলো না, যার ফলে যার অন্তরে রোগ আছে সে প্রলুব্ধ হয়। বরং স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।"
(সূরা আহযাব: ৩২)
হানাফি ফিকহে বিধান হলো:
- মেয়েদের জন্য অ-মাহরাম পুরুষের সাথে নরম, আকর্ষণীয় সুরে বা আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে কথা বলা হারাম।
- কিন্তু প্রয়োজনীয় কথা স্বাভাবিক টোনে বলা জায়েজ (যেমন কেনাবেচা, প্রশ্ন-জবাব ইত্যাদি)। তবে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বলাই উত্তম।
রদ্দুল মুহতার-এ এসেছে:
"নারীদের কণ্ঠের আওয়াজ নিজে সতর নয়, তবে যদি তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে তাহলে অ-মাহরামের সামনে তা বলা নিষিদ্ধ।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৭)
অনলাইনে ভিডিও বা অডিওতে নারীদের কণ্ঠ শোনার ক্ষেত্রেও একই বিধান: যদি কণ্ঠের কারণে পুরুষের মনে কামনা জাগতে পারে, তাহলে তা শোনাও হারাম। তবে কোনো ক্লাস বা প্রয়োজনে স্বাভাবিক কণ্ঠ শোনা জায়েজ, যতক্ষণ ফিতনা না হয়।
★তবে ফিতনার যামানা হওয়া অনেকেই বলেছেন যে মেয়েদের কন্ঠও সতরের অন্তর্ভুক্ত। তাই সতর্কতা মূলক এই মতটিই অবলম্বন করার পরামর্শ থাকবে।
আপনার জন্য কিছু পরামর্শ:
- সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং বন্ধ করুন। যে সব পেজ বা চ্যানেলে অনিবার্যভাবে নন-মাহরামের ছবি/ভিডিও দেখা যায়, সেগুলো আনফলো/সাবস্ক্রাইব বাতিল করুন।
- নিয়ত করুন: "আমি আল্লাহর হুকুম মানার জন্যই দৃষ্টি নিচু করছি।" তাহলে সওয়াবও হবে।
- অনিচ্ছাকৃত দেখলে সাথে সাথে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়ুন এবং দৃষ্টি সরিয়ে নিন।
- আপনার কণ্ঠের পর্দা: কোনো অ-মাহরাম পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলবেননা। প্রয়োজনে কথা বলতে হলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ পর্দার আড়ালে থেকে স্বাভাবিক, সংক্ষিপ্ত ও সিরিয়াস টোনে বলুন, যেকোনো ভাবে কন্ঠকে বিকৃত করার চেষ্টা করুন। হাসি-ঠাট্টা, আবেগ, নরম কণ্ঠ এড়িয়ে চলুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে চোখ ও কণ্ঠের হেফাজত করার তাওফিক দিন। আমিন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত গ্রন্থসমূহ:
- কুরআন (সূরা নূর: ৩০-৩১, সূরা আহযাব: ৩২)
- সহীহ বুখারী (৬২৪৩)
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬-৪০৭)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৯)
- জাওয়াহিরুল ফিকহ (২/৪৫৭)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
জাঝাকাল্লাহু খইরন।