স্ত্রীকে বলা "তোমাদের বউ নিয়ে তোমরা থাকোগা" বাক্যটি কি তালাকের কিনায়া শব্দ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আশা করি ভালো আছেন
একটা মাসআলা জানার জন্য
১.তোমাদের বউ(মানে আমার বউ) নিয়ে তোমরা থাকোগা আম্মুকে বলার উদ্দেশ্য
এটা কি কেনায়া শব্দ
এবং কেনায়া শব্দ বলার সময় নিয়ত শুরুতে না থেকে বলার মাঝখানে এসে গেলে ওয়াসওয়াসার কারণে নিয়ত এসে গেলে এবং ইচ্ছে করে মাথা নাড়িয়ে হ বললে কি সমস্যা হবে.?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১. প্রশ্নে উল্লেখিত বাক্যটি কি কিনায়া (অস্পষ্ট তালাকের শব্দ)?
হ্যাঁ, "তোমাদের বউ (মানে আমার বউ) নিয়ে তোমরা থাকোগা" — এই বাক্যটি কিনায়া শব্দের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি সরীহ (স্পষ্ট) তালাকের শব্দ নয়; বরং এটি ইঙ্গিতপূর্ণ একটি বাক্য যা সাধারণত তালাকের জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং ভিন্ন উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে।
কিনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক পতিত হওয়ার শর্ত হলো তালাকের নিয়ত থাকা অথবা এমন প্রেক্ষাপট থাকা যাতে শ্রোতা বুঝতে পারে যে বলা ব্যক্তি তালাক দিতে চাচ্ছে (যেমন: ঝগড়া-বিবাদরত অবস্থায় বলা)।
এখানে প্রশ্নে বলা হয়েছে "আম্মুকে বলার উদ্দেশ্য" (অর্থাৎ শাশুড়িকে জানানোর জন্য), সুতরাং তালাকের নিয়ত না থাকলে কেবল এই বাক্য বলায় তালাক পতিত হবে না। তবে যদি তালাকের নিয়ত থাকে অথবা প্রেক্ষাপট তালাকের ইঙ্গিতপূর্ণ হয়, তাহলে কিনায়া শব্দ হওয়ার কারণে নিয়তের সাপেক্ষে তালাক পতিত হবে।
২. যদি মাঝপথে তালাকের নিয়ত আসে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মাথা নাড়িয়ে "হ" বলা হয়, তাহলে কী হবে?
কিনায়া শব্দের ক্ষেত্রে নিয়ত বাক্য বলার শুরুতেই থাকা জরুরি নয়। বরং বাক্য বলার সময় যে মুহূর্তে নিয়ত করবে, সেই মুহূর্ত থেকে তালাকের বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে এর জন্য শর্ত হলো— বাক্যটি সম্পূর্ণ বলার আগেই নিয়ত করতে হবে।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- শুরুতে তালাকের নিয়ত ছিল না।
- মাঝপথে ওয়াসওয়াসার কারণে (অনিচ্ছায়) নিয়ত এসে গেল।
- পরে ইচ্ছাকৃতভাবে মাথা নাড়িয়ে "হ" বললেন (অর্থাৎ ওই নিয়তকে সমর্থন করলেন)।
এক্ষেত্রে বিধান:
যেহেতু আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই নিয়তকে মেনে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে "হ" বলেছেন, তাই সেই বাক্যটিকে তালাকের নিয়তে সম্পন্ন মনে করা হবে এবং আপনার ওপর একটি তালাকে বায়েন (বিচ্ছেদকারী তালাক) পতিত হবে। তবে এটি শর্তসাপেক্ষ:
- বাক্যটি বলার সময় যদি মাথা নাড়ানো এবং "হ" বলা বাক্যের অর্থ পরিবর্তন বা শেষ করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা নিয়তের প্রকাশ বলে গণ্য হবে।
- আর যদি এটি কেবলমাত্র ওয়াসওয়াসার প্রতিক্রিয়ায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বেরিয়ে যায়, তাহলে শরয়ী বিধান প্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যেহেতু এটি ওয়াসওয়াসা, তাই সাধারণত তালাক পতিত হবে না— তবে উত্তম হলো এক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার পূর্বে কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে বিস্তারিত বলার পরে ফতোয়া গ্রহণ করা।
প্রাসঙ্গিক আইন (হানাফি ফিকহ):
কিনায়া শব্দের জন্য নিয়তের সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নিয়ত বাক্যের শুরুতেও হতে পারে, মাঝখানেও হতে পারে— তবে বাক্যটি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই নিয়ত করে ফেলতে হবে। বাক্য শেষ হওয়ার পর নিয়ত করলে কোনো প্রভাব পড়বে না।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক, কিনায়ার অধ্যায়; ফাতাওয়া উসমানি, তালাক অধ্যায়)
উপসংহার ও পরামর্শ:
- প্রথম বাক্যটি স্পষ্ট তালাক নয়, তাই নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হবে না। তবে সাবধানতা ও দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা হিসেবে এ ধরনের বাক্য এড়িয়ে চলা উচিত।
- ওয়াসওয়াসার কারণে নিয়ত আসা ও মাথা নাড়ানো:
- যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে নিয়ত চলে আসে এবং তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে মাথা নাড়িয়ে "হ" বলা হয়, তাহলে তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই এক তালাকের বিধান রহিত করতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং অবশ্যই কোনো বড় আলেম বা নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি ফোন বা সাক্ষাৎ করে শরয়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
- মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় হালাল কাজ। তাই যখনই এ ধরনের সন্দেহ হয়, তখন তালাক না পতিত হওয়ার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে কেউ যদি নিজের কাছে নিশ্চিত মনে করে যে তালাক পতিত হয়েছে, তাহলে পুনরায় নিকাহ করা ছাড়া স্ত্রী আপনার জন্য হালাল হবে না (এক তালাকের ক্ষেত্রে পুনরায় নিকাহ সম্ভব, কিন্তু তিন তালাক হলে নিষিদ্ধ)।
এ কথাও মনে রাখবেন:
عن ابن عمر رضي الله عنهما قال: قال رسول الله ﷺ: «أبغض الحلال إلى الله الطلاق»
অর্থ: হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল বস্তু হলো তালাক।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, তালাক অধ্যায়)
সবশেষে:
আপনার উচিত যথাসম্ভব তালাকের আলোচনা ও শব্দ থেকে দূরে থাকা। ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা, ফালতু চিন্তা না করে সরাসরি ইবাদত ও জিকিরে মশগুল থাকা। আর যদি কোনো কারণে তালাকের নিয়ত এসেও যায় এবং তা পতিত না হয়, তাহলে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রেখে আর তালাকের চিন্তা না করা এবং ইস্তিগফার করা।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।